সাথী প্রামানিক, পুরুলিয়া, ৫ জুন: পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডীর সিন্দরী গ্রামের দুখু মাঝি গাছ লাগিয়ে তার সময় মতো প্রতিপালন করে চোখ খুলে দিয়েছে বনদফতরের। কোনও ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়, অযোধ্যা পাহাড় সংলগ্ন এলাকায় যেন প্রাকৃতিক অক্সিজেন প্ল্যান্ট বসিয়ে চলেছেন। বনদফতর তাঁর এই কর্মকাণ্ডকে স্বীকৃতি জানিয়েছে।
পড়াশোনা করেননি কোনোদিন, সেই স্বাচ্ছল্য ছিলও না কখনো। দুখু মাঝি তখন কিশোর, প্রথম গাছ লাগিয়েছিলেন। কিশোর দুখুর অবাক চোখের সামনেই সেই গাছে পাতা গজায়, মাটির রসে পুষ্ট হয়ে পল্লবিত হয় ধীরে ধীরে। সেই থেকে অশ্বত্থের বটের মহুল পলাশের নেশা লাগা শুরু। দুখু বাবু তারপর গাছ লাগাতে শুরু করলেন ফাঁকা জায়গায়, মাঠে, হাটে, রাস্তায়…সর্বত্র। বট, আম, জাম, মহূল, অশ্বত্থের বীজ কুড়িয়ে ইঁট পাঁজায় বা গাছের কোটরে রাখেন। তারপর অযোধ্যার ঢাল বেয়ে একদিন তুমুল বর্ষা নামে, বীজ থেকে নরম অঙ্কুরিত চারা বের হয়, সেই চারা দুখু লাগিয়ে দেন বর্ষাসিক্ত উর্বর মাটিতে।

এবার বেড়া দেওয়ার পালা, প্রথমে লতা পাতা, ডাল দিয়ে বেড়া দিতেন। লোকজন সেইসব বেড়া ভেঙ্গে জ্বালানির কাজে লাগাতো। নির্বিরোধ, বিনয়ী মানুষটি কাউকেই কিছু বলেন না, বলেননি। উনি নতুন বুদ্ধি আঁটলেন, শ্মশানে সৎকারের পর পড়ে থাকা কাঠ, কাপড়, মশারি, খাটিয়া, দিয়ে বেড়া দিতে শুরু করলেন। এখন আর কেউই বেড়া ভাঙ্গে না। মৃতের কাপড়, খাট ছুঁতে নেই যে। বয়স ষাটের কোঠায়, একমাথা ধবল চুল …গাছ লাগানোর জায়গা পরিস্কার করছিলেন আপনমনে। সদাহাস্যময়। আজ পর্যন্ত কতগুলো গাছ লাগিয়েছেন? উত্তর দিলেন- হাজার দুয়েক তো হবেই। আরো লাগাবো।

আত্মপ্রচারের বাসনা নেই, নেই অভিযোগ, নেই কিছু পাওয়ারও বাসনা। বট, অশ্বত্থ বড় হয়ে প্রচুর ছায়া দেবে, কত কত পাখি বাসা বাঁধবে, এটা দেখতে ভীষণ ভালো লাগে ওনার। চোখের সামনে বীজ থেকে বৃক্ষে পরিণত হওয়া গাছটির গুঁড়িতে হাত বোলানো স্বপ্নালু চোখের অযোধ্যার এক প্রান্তিক গ্রামে কুঁড়েঘরে থাকা এই ষাট বছরের বৃদ্ধ জানেন না ডিফরেস্টেশন কী? কার্বনমনোক্সাইড কী, ওজোন স্তর কী?
সিন্দরী, বাঘমুন্ডী, বীরগ্রাম সহ সমস্ত এলাকায় ওনার হাতে লাগানো গাছ বড় হচ্ছে। যত্রতত্র দেখা যাচ্ছে চিতাকাঠ, মৃতের ধুতি, শাড়ি দিয়ে বেড়া দেওয়া বট, অশ্বত্থ , আম জাম। ওগুলো সবই ওনার লাগানো। বাঘমুন্ডী ফরেস্ট অফিস থেকে পুরস্কৃত করা হয়েছে তাঁকে। বড়ই আনন্দ পান সেটা জানিয়ে।

কেউ তাঁর গাছ ভেঙ্গে দিলে খুব দুঃখ পান। পরে আবার লাগান, সেইখানেই। দুখুকে সবাই চেনেন। সামনের গ্রামের প্রাথমিক শিক্ষক জানালেন, তাঁর স্কুলের বাইরে প্রচুর গাছ লাগিয়েছেন দুখু বাবু। আশেপাশের গ্রামের লোক বট, অশ্বত্থের চারা পেলেই খোঁজ দেন তাঁকে। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা যাই হোক না কেন, এই সরল হাসিমুখ মানুষটিকে প্রতিদিন দেখা যায় খাটো ধুতি পরে গ্রামের রাস্তায় তাঁর লাগানো গাছগুলোর পরিচর্যা করছেন। শ্মশান থেকে পিচরোডের ধারে, ফাঁকা মাঠ থেকে স্কুলের আঙিনায়, নদীর পাড় বা মন্দির প্রাঙ্গন কোথাও বাদ নেই। অসংখ্য গাছ লাগিয়েছেন তিনি। যেন প্রাকৃতিক অক্সিজেন প্ল্যান্ট।

