পার্থ খাঁড়া, আমাদের ভারত, পশ্চিম মেদিনীপুর, ৫ নভেম্বর: সাপের বিষ মানেই মৃত্যু নয়, জীবন রক্ষার নতুন দিশা। বায়োটেকনোলজি ও স্টার্টআপ উদ্যোগে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। সাপের বিষ বলতেই সাধারণ মানুষের মনে প্রথমেই ভেসে ওঠে ভয়, আতঙ্ক, বিষক্রিয়া এবং মৃত্যুর আশঙ্কা। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান সেই প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করছে। সাপের বিষের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে জীবনদায়ী ওষুধ আবিষ্কার, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান, বায়োটেকনোলজি এবং শিল্পোদ্যোগের এক নতুন সম্ভাবনার জগৎ। এই অভিনব বৈজ্ঞানিক ভাবনাকে সামনে রেখে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োডাইভার্সিটি অ্যান্ড জার্মপ্লাজম কনজারভেশন সেন্টার (Biodiversity and Germplasm Conservation Centre – BGCC) এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত হলো দ্বিতীয় ধারাবাহিক বিশেষ বক্তৃতা (Second Successive Special Lecture)। বক্তৃতার বিষয় ছিল “Snake Venom is ‘Life’, Not ‘Death’: A Startup Journey।

অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মনসা বায়োটেক- এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক শ্রী সৌরভ রায়। তিনি সাপের বিষের বৈজ্ঞানিক গঠন, তার মধ্যে উপস্থিত বিভিন্ন জৈব সক্রিয় উপাদান, চিকিৎসা বিজ্ঞানে সম্ভাব্য প্রয়োগ, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং কীভাবে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে বাস্তব স্টার্টআপ উদ্যোগে রূপান্তরিত করা যায়, সে বিষয়ে অত্যন্ত তথ্যসমৃদ্ধ, আকর্ষণীয় ও অনুপ্রেরণামূলক আলোচনা করেন।
অনুষ্ঠানের সূচনায় বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য উদ্বোধনী ভাষণ প্রদান করেন। তাঁর বক্তব্যে তিনি প্রকৃতির প্রতিটি জীব ও জৈব উপাদানের মধ্যে নিহিত অসীম বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। যে উপাদানকে আমরা সাধারণত বিপজ্জনক বলে মনে করি, গভীর বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে তার মধ্যেই মানবকল্যাণের নতুন পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। সাপের বিষ তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। আধুনিক গবেষণায় সাপের বিষের বিভিন্ন উপাদান ও তাদের কার্যকারিতা চিকিৎসা ও ওষুধ আবিষ্কারের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
উপাচার্য আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেবল গবেষণাপত্র প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। গবেষণার ফলাফলকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে হবে এবং তার মাধ্যমে সমাজের উপকার, কর্মসংস্থান ও নতুন শিল্পোদ্যোগের পথ তৈরি করতে হবে। বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গবেষণার পাশাপাশি উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা ও উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন। তিনি এ ধরনের জনপ্রিয়, সময়োপযোগী ও শিক্ষার্থীদের আগ্রহ সৃষ্টিকারী বক্তৃতা আরও বেশি করে আয়োজন করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁর মতে, এই ধরনের আলোচনা শিক্ষার্থীদের প্রচলিত পাঠ্যক্রমের বাইরে গিয়ে বিজ্ঞানকে নতুনভাবে চিনতে এবং গবেষণার বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে জানতে সাহায্য করবে।

অনুষ্ঠানে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োডাইভার্সিটি অ্যান্ড জার্মপ্লাজম কনজারভেশন সেন্টারের (BGCC) ডিরেক্টর অধ্যাপক অমল কুমার মণ্ডল উদ্বোধনী ভাষণ প্রদান করেন। তিনি জীববৈচিত্র্যের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, জৈবসম্পদের টেকসই ব্যবহার এবং আধুনিক বায়োটেকনোলজির সঙ্গে গবেষণার সংযোগ স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, জীববৈচিত্র্য কেবল সংরক্ষণের বিষয় নয়; যথাযথ বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে তা মানবকল্যাণ এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। বিজিসিসি-র উদ্যোগে এই ধরনের আন্তর্বিভাগীয় বিশেষ বক্তৃতা আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন জ্ঞানশাখার শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের একই মঞ্চে এনে নতুন বৈজ্ঞানিক ভাবনার আদান প্রদানের সুযোগ তৈরি করা।
এরপর প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. সাগর আচার্য প্রধান বক্তা শ্রী সৌরভ রায়ের পরিচিতি তুলে ধরেন এবং তাঁকে বক্তব্য রাখার জন্য আমন্ত্রণ জানান।
নিজের বক্তৃতায় শ্রী সৌরভ রায় সাপের বিষের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব অত্যন্ত সহজ, সাবলীল ও আকর্ষণীয়ভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, সাপের বিষ একটি জটিল জৈব রাসায়নিক মিশ্রণ, যার মধ্যে বিভিন্ন প্রোটিন, পেপটাইড, এনজাইম এবং অন্যান্য জৈব সক্রিয় অণু উপস্থিত থাকে। এই উপাদানগুলির বৈশিষ্ট্য ও কার্যপ্রণালী নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে ওষুধ আবিষ্কার, চিকিৎসা- সংক্রান্ত গবেষণা, ডায়াগনস্টিক প্রযুক্তি এবং বায়োমেডিক্যাল বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, সাপের বিষকে শুধুমাত্র প্রাণঘাতী বিষ হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব অনুধাবন করা সম্ভব নয়। বরং সঠিক গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং নিরাপদ বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই জৈব উপাদানের বিভিন্ন কার্যকরী দিক উন্মোচন করা সম্ভব। তাঁর বক্তব্যের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক ছিল গবেষণাগারের বৈজ্ঞানিক ধারণাকে কীভাবে বাস্তব শিল্পোদ্যোগ ও স্টার্টআপের মাধ্যমে সমাজের কাজে লাগানো যায়, সেই অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির উপস্থাপনা।

প্রায় ২০০ জন ছাত্র- ছাত্রী, গবেষক, অধ্যাপক, শিক্ষক- শিক্ষিকা এবং অন্যান্য আগ্রহী অংশগ্রহণকারীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি এক প্রাণবন্ত বৈজ্ঞানিক মিলনমেলায় পরিণত হয়। উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবন্ধু শ্রী বিদুর দাস (Computer Centre), বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, প্রকৃতিপ্রেমী ও স্কুল শিক্ষক শ্রী তন্ময় দোলই সুদূর হাওড়া থেকে শুধুমাত্র এই অভিনব বৈজ্ঞানিক বক্তৃতা শোনার উদ্দেশ্যে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটে আসেন। তারা দু’জনেই এই বিশ্ববিদ্যালয়য়ের প্রক্তনী এবং উদ্ভিদ ও বন বিদ্যা বিভাগের ছাত্র। তাদের এই আগ্রহ ও উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী এবং আধুনিক বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র- ছাত্রী বা গবেষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বৃহত্তর সমাজের প্রকৃতিপ্রেমী ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের কাছেও এই ধরনের আয়োজন সমানভাবে আকর্ষণীয়।
বিশেষ করে বক্তৃতার পর প্রশ্নোত্তর পর্বটি ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও ব্যতিক্রমী। শিক্ষার্থী ও গবেষকদের পক্ষ থেকে একের পর এক প্রশ্ন উঠে আসে। সাপের বিষের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ, বিষের বিভিন্ন উপাদানের কার্যকারিতা, গবেষণার সম্ভাবনা, চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রয়োগ, বায়োটেকনোলজি ভিত্তিক উদ্যোগ, স্টার্টআপ গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ— বিভিন্ন বিষয়ে অংশগ্রহণকারীরা তাঁদের কৌতূহল প্রকাশ করেন।
প্রধান বক্তা অত্যন্ত ধৈর্য, আন্তরিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেন। অনেক সময় প্রশ্নোত্তর পর্বটি মূল বক্তৃতার মতোই প্রাণবন্ত ও শিক্ষণীয় হয়ে ওঠে। উপস্থিত ছাত্র- ছাত্রীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং একের পর এক প্রশ্ন প্রমাণ করে যে, প্রচলিত পাঠ্যক্রমের বাইরের এই ধরনের বাস্তবভিত্তিক ও উদ্ভাবনী বিষয়গুলির প্রতি তাঁদের আগ্রহ কতটা গভীর। অনুষ্ঠান শেষে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ব্যাপক সন্তোষ ও উৎসাহ লক্ষ্য করা যায়। অনেকেই এ ধরনের আরও বেশি সংখ্যক বিশেষ বক্তৃতা এবং অভিজ্ঞ বিজ্ঞানী ও শিল্পোদ্যোগীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ আয়োজনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
এই বিশেষ বক্তৃতার মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা উঠে আসে—জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং তার বৈজ্ঞানিক ব্যবহার পরস্পরের পরিপূরক। প্রকৃতির জৈবসম্পদকে যথাযথভাবে জানা, গবেষণা করা এবং দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করার মধ্যেই ভবিষ্যতের বহু বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে গবেষণাভিত্তিক স্টার্টআপ, উদ্ভাবন এবং আত্মনির্ভরশীল উদ্যোগ গড়ে তোলার মানসিকতা সৃষ্টির ক্ষেত্রেও এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
অনুষ্ঠানের শেষে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. সাগর আচার্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তিনি মাননীয় উপাচার্য, প্রধান বক্তা শ্রী সৌরভ রায়, বায়োডাইভার্সিটি অ্যান্ড জার্মপ্লাজম কনজারভেশন সেন্টারের ডিরেক্টর অধ্যাপক অমল কুমার মণ্ডল এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিভিন্ন বিভাগের বিশিষ্ট শিক্ষক ও অধ্যাপকদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন উদ্ভিদবিদ্যা ও বনবিদ্যা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সুভাষ সাহা, ইলেকট্রনিক্স বিভাগের অধ্যাপক জয়ন্ত কুণ্ডু, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক সৌমেন মল্লিক, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সুব্রত দে, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক দেবযানী দাস, ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক প্রমোদ কুমার, হিন্দি বিভাগের অধ্যাপক এবং অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রমেশচন্দ্র দাস, অধ্যাপিকা বর্ণা চক্রবর্তী অধ্যাপিকা জীববিদ্যা বিভাগ, সহ উপস্থিত অন্যান্য শিক্ষক- শিক্ষিকা, গবেষক ও ছাত্র- ছাত্রীরা। বিশেষভাবে তিনি মনসা বায়োটেকের প্রতিষ্ঠাতা- পরিচালক শ্রী সৌরভ রায়কে এমন একটি অভিনব, তথ্যসমৃদ্ধ ও অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতা উপহার দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান।
বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দ্বিতীয় ধারাবাহিক বিশেষ বক্তৃতা নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য ও সফল আয়োজন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রায় ২০০ জনের উপস্থিতি, শিক্ষার্থীদের বিপুল উৎসাহ, বিভিন্ন বিভাগের অধ্যাপকদের অংশগ্রহণ, প্রাণবন্ত আলোচনা এবং অসংখ্য প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠানটি প্রমাণ করেছে যে, বিজ্ঞানকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপন করা গেলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা ও আগ্রহ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
সবশেষে বলা যায়, “Snake Venom is ‘Life’, Not ‘Death”— এই বক্তব্য শুধু একটি বক্তৃতার শিরোনাম নয়, এটি আধুনিক বিজ্ঞানের এক গভীর উপলব্ধি। ভয়কে জ্ঞানে, জ্ঞানকে উদ্ভাবনে এবং উদ্ভাবনকে মানবকল্যাণে রূপান্তরিত করার যে বার্তা তা এই বিশেষ বক্তৃতায় তুলে ধরেছে। তা বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র- ছাত্রী ও গবেষকদের কাছে নিঃসন্দেহে নতুন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

