ফুলে উঠছে অজয়-দামোদর, হু হু করে জল বাড়ায় সোনাইচন্ডীপুরে ফসলের ক্ষতি, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় তৎপর জেলা প্রশাসন

জয় লাহা, দুর্গাপুর, ৩১ জুলাই: বিহার, ঝাড়খন্ডে প্রবল বৃষ্টি। পাল্লা দিয়ে দফায় দফায় বৃষ্টিপাত পশ্চিম বাংলাজুড়ে। প্রবল বৃষ্টিপাতে ফুলে উঠতে শুরু করছে অজয় ও দামোদর নদ। হু হু করে বাড়ছে দুই নদের জলরাশি। আর তার জেরে দুই নদী তীরবর্তী এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দামোদর নদী তীরবর্তি সোনাইচন্ডীপুর গ্রামে প্রায় ১০০ বিঘা সবজির জমি জলের তলায়। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জোর তৎপরতা শুরু করল পশ্চিম বর্ধমান জেলা প্রশাসন। প্লাবিত এলাকার লোকজনদের ইতিমধ্যেই আশপাশের স্কুলে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। সতর্কতা জারি নদী তিরবর্তী এলাকায়।

প্রসঙ্গত, গত দু’দিন দফায় দফায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায়। একইসঙ্গে নিম্নচাপের দরুন এক প্রকার প্রবল বৃষ্টিপাত হয়েছে বিহার ও ঝাড়খন্ডে। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে একপ্রকার মেঘভাঙা বৃষ্টি হয়েছে এরাজ্যের বাঁকুড়া, দুই বর্ধমান সহ বেশ কিছু জেলায়। আর তাতেই বন্যা পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে। মাইথন পাঞ্চেত থেকে জল ছাড়ায় ফুলে উঠেছে অজয় ও দামোদর। হু হু করে জল বাড়তে শুরু করেছে দামোদরে। ফলে দামোদর তীরবর্তী এলাকা প্লাবিত হতে শুরু করেছে। জানাগেছে, শুক্রবার রাতে মাইথন ও পাঞ্চেত জলাধারের ওপর গড় ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। মাইথন নিম্ন তীরবর্তী অঞ্চলে সর্বোচ্চ ১৫০-২০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে। ফলে জল বাড়ছে মাইথন পাঞ্চেত জলাধারে। 
একরকমভাবে প্রবল বৃষ্টিপাতের জেরে জলরাশি বাড়ছে বিহারের তেনুঘাট জলাধারে। জানাগেছে, তেনুঘাট থেকে ১লক্ষ কিউসেক জল ছাড়া হয়েছে।

যদিও তেনুঘাট ডিভিসির আওতায় নয়। কিন্তু ওই জলাধারের জল পাঞ্চেতে ঢোকে। ডিভিসি সুত্রে জানা গেছে, পাঞ্চেত জলাধারে ২ লক্ষ কিউসেক রেটে জল ঢুকছে। ৪২৫ ফুট পর্যন্ত জলধারণ ক্ষমতা থাকলেও ৪৩৫ ফুট পর্যন্ত সর্ব্বোচ্চ জল রাখা যাবে পাঞ্চেতে। শনিবার বিকেল পর্যন্ত ৪২৬ ফুট জল হয়েছে। ৮৬ হাজার কিউসেক জল ছাড়া হয়েছে পাঞ্চেত থেকে। একই সঙ্গে মাইথন জলাধারে ৭৫ হাজার কিউসেক রেটে জল ঢুকছে। ৪৮৭ ফুট জল রয়েছে জলাধারে। ৪৯৫ ফুট পর্যন্ত জলধারণ করতে পারবে মাইথন জলাধার। এদিন ১৪ হাজার কিউসেক জল ছাড়া হয়েছে মাইথন থেকে। তারসঙ্গে পাল্লা দিয়ে ওই দুই জলাধারের নিম্নে বেশ কিছু বে-নিয়ন্ত্রিত নদী নালা রয়েছে। ওইসব নদীনালার জল দামোদরে মিশছে। সব মিলিয়ে দামোদর ফুলে উঠেছে।ইতিমধ্যে দামোদর উত্তর তীরবর্তি দুর্গাপুর লাগোয়া বাঁকুড়ার সোনাইচন্ডীপুর গ্রামে চাষে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দামোদর চরে প্রায় ১০০ বিঘার ওপর কৃষিজমি রয়েছে। সারা বছরই বিভিন্ন রকম ফসলের চাষ হয়। আলু, পেঁয়াজ, মটর, ফুলকপি, বাঁধাকপি ছাড়াও বেগুন পটল, ভুট্টা চাষ হয়। মাসখানেক আগে বাদাম নষ্ট হয়েছে দামোদরের জল ঢুকে। আবারও দামোদরের জল ঢুকে ওইসব এলাকার ফসল জলের তলায়। বেগুন, ভুট্টা, পটল সহ একাধিক সবজি জমি জলমগ্ন। 

স্থানীয় চাষি হরেন্দ্রনাথ তালুকদার ও দুলাল মহালি বলেন,” বাদাম চাষ করেছিলাম। জলে বাদাম নষ্ট হয়েছে। এখন ভুট্টা, পটল বেগুন লাগিয়েছিলাম। সেসব জলের তলায়। পটল ভুট্টা গাছ একেবারে নষ্ট হয়ে যাবে। চরম লোকসানের মুখে। এমনকি ঘরবাড়িতে জল ঢুকে গেছে। আতঙ্কে রয়েছি।”  

ডিভিসির (জল বিভাগ) চিফ ইঞ্জিনিয়ার সত্যব্রত ব্যানার্জি জানান,” বেশী বৃষ্টিপাতের দরুন জলরাশি বাড়ছে। মাইথন ও পাঞ্চেতে জলস্তর বাড়ছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১ লক্ষ কিউসেক পর্যন্ত জল ছাড়ার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু জলস্তর বাড়লে আরও জল ছাড়তে হতে পারে। সে বিষয় জানানো হয়েছে। গোটা পরিস্থিতির ওপর নজরদারি রাখা হয়েছে। প্রতিমুহূর্তে দুই জলাধারের সমস্ত তথ্য রাজ্য জল দফতর ও কেন্দ্রীয় জল কমিশনে পৌঁছে যাচ্ছে।”

অন্যদিকে ঝাড়খন্ডে বৃষ্টি তারওপর মাইথন ও পাঞ্চেত জলাধার থেকে জল ছাড়ার ফলে অজয় দামোদরে জল বাড়তে শুরু করেছে।  দামোদর নদের ওপর দুর্গাপুর ব্যারেজে জলস্তর বাড়তে শুরু করেছে। রাজ্য সেচ দফতর সুত্রে জানা গেছে, এদিন বিকাল পর্যন্ত দুর্গাপুর ব্যারেজ থেকে। ১লক্ষ ৩৪২৫ কিউসেক জল ছাড়া হয়েছে  একইসঙ্গে চলছে দামোদর নিম্নতীরবর্তি এলাকায় প্লাবন রুখতে নজরদারি। অন্যদিকে অজয় ও দামোদরে জল বৃদ্ধিতে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম তৎপরতা শুরু করল পশ্চিম বর্ধমান জেলা প্রশাসন। এদিন অজয় নদী তীরবর্তী বেশকিছু এলাকা পরিদর্শন করেন পুলিশ ও প্রশাসনিক আধিকারিকরা। দুর্গাপুরের অন্ডাল, কাঁকসা ও পান্ডবেশ্বরে বেশকিছু বাড়ি প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদিন কাঁকসার সিলামপুর, দুর্গাপুরের মহকুমাশাসক শেখর চৌধুরী সরজমিন পরিদর্শনে যান। স্কুলের চাবি আনতে দেরি হওয়ায় রীতিমতো পাঁচিল টপকে স্কুলে ঢোকেন তিনি। এবং স্কুলের গোটা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন। এবং সেখানের ২০-২৫ পরিবারকে স্থানীয় হাই স্কুলে থাকার বন্দোবস্ত করেন। তিনি জানান,” পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন তৈরী। নদী তীরবর্তি গ্রামে সতর্ক করা হয়েছে। চলছে নজরদারি। অন্ডালের শ্রীরামপুরে ২০টি পরিবারকে পার্শ্ববর্তী স্কুলে নিরাপদ জায়গায় থাকতে বলা হয়েছে। কাঁকসার সিলামপুরে ২০-৩০টি পরিবারকে নিরাপদ জায়গায় পার্শ্ববর্তী স্কুলে থাকতে বলা হয়েছে। ওইসব এলাকায় সিভিল ডিফেন্স মোতায়েন করা হয়েছে। পর্যাপ্ত ত্রাণের ব্যাবস্থা করা হয়েছে। নিয়মিত মনিটারিং চলছে।” 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *