আশিস মণ্ডল, বোলপুর, ৮ সেপ্টেম্বর: করোনার জন্য গত দু-বছর শান্তিনিকেতনে হয়নি বসন্তোৎসব। এবার সেই শান্তিনিকেতনই সাক্ষী হয়েছে অকাল বসন্তোৎসবের। আদালতের নির্দেশের পরই মিষ্টি হাতে উপাচার্যের বাংলো ‘পূর্বিতা’র সামনে আবির খেলায় মেতেছেন পড়ুয়ারা। রঙবেরঙের আবিরে একে অপরের মুখ রাঙিয়ে দিয়েছেন।কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ে থাকা পড়ুয়ারা কেউ উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েছেন। কারো আবার দু-চোখের কোন চিকচিক করে উঠেছে।
গত ১৩ দিন ধরে চলছে নাগাড়ে অবস্থান। গত ৪ দিন ধরে ছাত্রী-অধ্যাপকরা চালিয়ে যাচ্ছেন রিলে অনশন। হক আদায়ের দাবিতে অবিচল থাকা একদল পড়ুয়ার প্রাথমিক জয়ের পর এমন বহি:প্রকাশ স্বাভাবিক বলেই মত প্রকাশ করেছেন সকলে। বুধবার আন্দোলনরত পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের করা মামলার দ্বিতীয় দিনের শুনানীতে কলকাতা উচ্চ আদালতের বিচারক রাজাশেখর মান্থা পড়ুয়াদের বহিষ্কারের উপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দিয়েছেন এবং সেই সঙ্গে বহিষ্কৃত পড়ুয়াদের অবিলম্বে ক্লাসে ফেরানোর ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি উপাচার্যের উদ্দেশ্যে বিচারকের স্পষ্ট পর্যবেক্ষন, ‘উপাচার্য যদি নিজেকে আইনের ঊর্দ্ধে মনে করেন তাহলে তা ঠিক নয়।’

এদিন আদালতে পড়ুয়াদের হয়ে সওয়াল করেছিলেন আইনজীবি বিকাশ ভট্টাচার্য ও শামিম আহমেদ।আদালতের নির্দেশ ও সওয়াল জবাব প্রসঙ্গে আইনজীবী বিকাশ ভট্টাচার্য বলেছেন, “বিচারককে পরিস্কার বলেছি ছাত্রদের সাজা যদি উপাচার্য প্রত্যাহার না করেন তাহলে আন্দোলন থামানো যাবে না। এই সাজা যদি প্রত্যাহার করা হয় তবেই শান্তি ফেরাবার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। বিচারক এই বক্তব্য গ্রহন করেছেন। বিচারক এক্ষুনি পড়ুয়াদের ক্লাসে ফেরানোর ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত করেছেন।বিচারক উপাচার্যের উদ্দেশ্যে এও বলেছেন, উপাচার্য যদি মনে করেন তিনি আইনের ঊর্দ্ধে তাহলে এটা ঠিক না। এককথায়, বিচারক বলেছেন আন্দোলন প্রত্যাহার করা হোক, আদালত সব দেখবে। তাই যদি হয়, আদালত যদি সবটা দেখে তাহলে আমাদের আন্দোলন করার প্রয়োজন নেই।” এর আগে প্রথম দিনের শুনানীতে আদালত আন্দোলনরত পড়ুয়াদের অবস্থান মঞ্চ সরিয়ে নিতে বলেছিল কখনই আন্দোলনের উপর কোনও নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি। আর যে জন্য পড়ুয়াদের আন্দোলন এদিন সেই বহিষ্কারের উপরই স্থগিতাদেশ দিয়েছে আদালত। আগামী বুধবার ফের শুনানীর দিন ধার্য হয়েছে। আদালতের নির্দেশের বার্তা শান্তিনিকেতনের অবস্থান মঞ্চে পৌছতেই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন পড়ুয়ারা। তারা মিষ্টি হাতে পৌঁছান ‘পূ্র্বিতা’য়। উপাচার্যকে প্রতীকি মিষ্টি মুখ করাতে। স্বাভাবিকভাবেই উপাচার্যের দেখা মেলেনি। সেখানেই পড়ুয়ারা আবির খেলেন নিজেদের মধ্যে।

বহিষ্কৃত পড়ুয়া সোমনাথ সৌ ও রূপা চক্রবর্তী দুজনেই এদিন জানিয়েছেন, “এটা আমাদের প্রাথমিক জয়। নায্য দাবি নিয়েই আন্দোলনে নেমেছি। আমরা কোনওদিনই উপাচার্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে নামিনি। কিন্তু উপাচার্যই আমাদের পড়াশোনা থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চেয়েছেন। তাই উপাচার্যের অপসারনের দাবি থেকে আমরা সরছি না।” পড়ুয়াদের প্রতি বিশ্বভারতীর উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর এমন কঠোর পদক্ষেপ লঘু পাপে গুরু দন্ডের সামিল বলে উঠে এসেছে আদালতের পর্যবেক্ষনে। বহিষ্কারের উপর স্থগিতাদেশের পাশাপাশি সমস্ত রকম বিক্ষোভ অবস্থান প্রত্যাহার ও ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উপর জোর দিয়েছেন বিচারক। শুধু যে পড়ুয়াদের উপর আক্রমন নেমে এসেছ তা নয়, অধ্যাপক-কর্মীদের উপরও সাসপেশন সহ নানান শাস্তির খাঁড়া নামিয়ে এনেছেন উপাচার্য। তাই অধ্যাপক-কর্মীদেরও একটা অংশ প্রত্যক্ষভাবে সামিল হয়েছেন এই আন্দোলনে। অধ্যাপক সংগঠন ভিবিউফা’র সভাপতি তথা সাসপেন্ড থাকা অধ্যাপক সুদীপ্ত ভট্টাচার্য তাঁর প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, “আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পর এই মামলায় অধ্যাপকরাও কি করে অন্তর্ভূক্ত হতে পারে সে ব্যাপারে আলোচনা সাপেক্ষে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

উল্লেখ্য, গত ২৩ আগস্ট বিশ্বভারতীর পড়ুয়া তথা এসএফআই নেতা সোমনাথ সৌ, এসএফআই নেত্রী রূপা চক্রবর্তী ও অপর ছাত্রনেতা ফাল্গুনী পানকে তিন বছরের জন্য বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত লিখিতভাবে জানিয়েছিল বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ। গত ৯ জানুয়ারি ছাতিমতলায় এক অনুষ্ঠান চলাকালীন নির্দিষ্ট দাবিদাওয়া নিয়ে পড়ুয়াদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান বিক্ষোভকে ‘বিশ্বভারতীর সন্মানহানিকর’, ‘শৃঙ্খলাভঙ্গে’র পাশাপাশি অর্থনীতি বিভাগে ‘ভাঙ্গচুরে’র অভিযোগ এনে তিন পড়ুয়াকে গত ১৪ জানুয়ারি সাসপেন্ড করেছিল কর্তৃপক্ষ। দু দফায় তিন মাস করে সাসপেনশনের মেয়াদ বাড়ানোর অবশেষে তিন পড়ুয়াকে বহিষ্কারের চিঠি ধরায় কর্তৃপক্ষ। এরই প্রতিবাদে গত ২৭ আগস্ট থেকে লাগাতার অবস্থানে নেমেছেন পড়ুয়ারা।

