স্নেহাশীষ মুখার্জি, আমাদের ভারত, নদিয়া, ১ অক্টোবর: উপনির্বাচন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল গত বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনার দিন কয়েক পরেই। সাংসদ পদ বজায় রেখে শান্তিপুর বিধানসভার বিধায়ক পদ থেকে জগন্নাথ সরকার ইস্তফা দেওয়ার পর থেকেই অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল উপনির্বাচন। সাংগঠনিক দিক দিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন বিজেপির প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলি। তবে কবে উপনির্বাচনের দিন ঘোষণা হয়, সেই দিকেই তাকিয়ে ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলি। মঙ্গলবার উপনির্বাচনের দিন ঘোষণা হতেই শান্তিপুর বিধানসভা এলাকায় রাজনৈতিক দলগুলির তৎপরতা শুরু হয়েছে। তৃণমূল ও বিজেপির পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, নির্বাচনের জন্য তারা সবরকমভাবে প্রস্তুত।দেওয়াল দখলের পর শুক্রবার থেকে লেখন শুরু করেছে বিজেপি ও তৃণমূল। ইতিমধ্যেই শাসক দলের পাশাপাশি বিজেপিও সাংগঠনিক বৈঠকের প্রস্তুতি শুরু করেছে।
শান্তিপুর বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে লড়াই মূলত তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে। উপনির্বাচন দুই দলের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে তৃণমূলের কাছে শান্তিপুরের হারানো জমি ফিরে পাওয়ার লড়াই আর অন্যদিকে বিজেপির কাছে সেই আসনটি ধরে রাখার। তবে সব রাজনৈতিক দলই ভেবে রেখেছিলেন, পুজো মরশুম শুরু হওয়ার আগেই নির্বাচন কমিশন উপনর্বাচনের দিন ঘোষণা করবে। কিন্তু তা না করে কার্যত পুজো মরশুম চলাকালীনই আগামী ৩০ অক্টোবর নির্বাচনের দিন ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। যদিও গত বিধানসভা নির্বাচনে তিন প্রতিদ্বন্দী দলের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ মঙ্গলবার জানিয়ে দিয়েছেন, তারা সাংগঠনিকভাবে ইতিমধ্যেই নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত।
এদিন শান্তিপুর শহর তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি বৃন্দাবন প্রামানিক জানিয়েছেন, ‘নির্বাচনের জন্য আমরা একশ শতাংশ তৈরি রয়েছি। দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যাকেই শান্তিপুরের প্রার্থী করবেন, আমরা তার হয়েই লড়াই করে নিশ্চিত ভাবে জয়লাভ করব। শক্তিশালী সংগঠন নিয়ে আমরা তৈরি রয়েছি।উপনির্বাচনের দিন ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পরেই দলীয় স্তরে আমরা বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া শুরু করে দিয়েছি।’ তবু বিজেপির জেতা আসনে তারা জয়ের ব্যাপারে কতটা আশাবাদী, সে বিষয়ে বৃন্দাবন প্রামানিকের বক্তব্য, ‘জগন্নাথ সরকারকে মানুষ এখানে তাদের রায় দিয়ে জিতিয়েছিলেন। অথচ তিনি শান্তিপুরের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তাই মানুষ তার জবাব দিতে ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে রয়েছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভূমিপুত্র কাউকে প্রার্থী করুন বা বাইরের কাউকে, শান্তিপুরে এবার তৃণমূল কংগ্রেসের জয় নিশ্চিত।
‘যদিও এ বিষয়ে রানাঘাট লোকসভার বিজেপি সাংসদ তথা শান্তিপুরের প্রাক্তন বিধায়ক জগন্নাথ সরকারের বক্তব্য, ‘তৃণমূলের লোকজন যাই বলুন না কেন, এবারও আমরা এই আসনে নিশ্চিত জিতব। শান্তিপুরের মানুষ বিজেপির সঙ্গেই এখনও আছেন।’ সিপিএমের সঙ্গে জোট করে গত নির্বাচনে শান্তিপুরে প্রার্থী দিয়েছিল কংগ্রেস। তাই এবারের উপনির্বাচনে কংগ্রেসেরই প্রার্থী হবে ধরে নিয়ে তারাও আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন বলে দাবি করেছেন শান্তিপুর শহর কংগ্রেসের সভাপতি রাজু পাল। মঙ্গলবার তিনি জানিয়েছেন, ‘আমরা আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে আছি। উপনির্বাচনে শান্তিপুরে কংগ্রেস প্রার্থী দেবে, সে কথা প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী আগেই ঘোষণা করেছেন। আমরা যদিও ভূমিপুত্রকেই এখানে প্রার্থী হিসেবে চাইছি। তবে দল যাকেই প্রার্থী করবে, তাকেই মেনে নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করব আমরা।’ সিপিএমের সঙ্গে এবার তাদের জোট হবে কি না, সে বিষয়ে রাজু পাল বলেন,’অফিশিয়ালি জোট তো এখনও ভাঙেনি। আমরা কংগ্রেসীরা এখানে তৈরি আছি। বাকিটা সিপিএমের ব্যাপার।’ অবশ্য সিপিএমের কেউ এ বিষয়ে এখনই কিছু বলতে রাজি হননি। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জগন্নাথ সরকার পেয়েছিলেন ১ লক্ষ ৮ হাজার ৬৩৮ ভোট।তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী অজয় দে পেয়েছিলেন ৯২ হাজার ৭১৫ ভোট আর সংযুক্ত মোর্চার প্রার্থী ঋজু ঘোষাল পেয়েছিলেন ৯ হাজার ৭২৫ ভোট।ব্যবধান ছিল ১৫ হাজার ৯২৩ ভোট। বছর সাতেক আগে শেষবার উপনির্বাচন দেখেছিলেন শান্তিপুরের মানুষ। ২০১৩ সালের শেষদিকে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে কংগ্রেসে যোগ দিয়ে বিধায়ক পদে ইস্তফা দিয়েছিলেন শান্তিপুরের তৎকালীন বিধায়ক অজয় দে। ২০১৪ সালে উপনির্বাচন হয়। অজয় দে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হয়েছিলেন এবং তিনি ফের জেতেন। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে সেই অজয় দে’কেই হারিয়ে জয়ী হয়েছিলেন জগন্নাথ সরকার।
যদিও শান্তিপুর বিধানসভায় পরাজিত হলেও রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার গঠন করায় আগের হাওয়ার বদল ঘটেছে বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে। সেক্ষেত্রে বিজেপি শান্তিপুর আসনটি ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে মানুষের মনে।যদিও শান্তিপুরের পাঁচবারের বিধায়ক অজয় দের মৃত্যুর পর তৃণমূল কংগ্রেস কাকে প্রার্থী করে, সেই দিকে তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল। পাশাপাশি, বিজেপি ভূমিপুত্রকে প্রার্থী করবে না কি বাইরের কাউকে প্রার্থী করবে, সেটাও বড় প্রশ্ন। কারণ, এবারও লড়াইয়ের মূল প্রতিপক্ষ হতে চলেছে বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেস।

