অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, ১৯ জুন:
ভবিষ্যতে দেশে প্রচুর যোদ্ধা লাগতে পারে। অগ্নিপথ ছাড়া ভারতের মত অর্থকষ্টে থাকা দেশের কাছে বিকল্প আর কিছু নেই। কিন্তু ‘অগ্নিপথ’-এর নামে যে অশান্তি চলছে , তার নেপথ্যে অন্য কারণ রয়েছে। তাই এই বিষয়টা নিয়ে সতর্কভাবে এগনো দরকার। এই মন্তব্য করলেন প্রাক্তন সেনাকর্তা জেনারেল অরুণ রায়।
দেশভাগের আগে পূর্বপুরুষরা থাকতেন লাহোরে। অরুণবাবুও পুরোদস্তুর প্রবাসী বাঙালি। তাঁর কথায়, “প্রবাসী বলেই হয়ত সেনাবাহিনীতে আসতে পেরেছিলাম। বাহিনীতে বাঙালি ভীষণ কম। এখানে নিয়োগের একটা পদ্ধতিকে বলে ‘রিক্রুটেবল মেল পপুলেশন’। এটা বাঙালিরা সঠিকভাবে ব্যবহার করে না। অনেক কম কর্মপ্রার্থী অংশ নেয়। ওদের মধ্যে থেকেও অনেকে দৈহিক বা লিখিত পরীক্ষায় বাতিল হয়ে যায়। অনেক সময় দেখা গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের কোটা থেকে ৯০-৯৫ শতাংশ পদ শূণ্য থাকে। এই শূণ্যপদগুলো সারা দেশের অন্য রাজ্যগুলোকে বন্টন করা হয়। বাঙালিদের অবশ্যই আরও বেশী আসা দরকার সেনাবাহিনীতে। ‘অগ্নিপথ’ তার একটা সহায়ক মাধ্যম হতে পারে।

১৯৬৩-তে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন অরুণবাবু। এনডিএ এবং আইএমএ-তে চার বছর কঠোর প্রশিক্ষণের পর অফিসার হন। ’৬৭-এর ‘এলওসি অ্যাকশন’ ও ’৭১-এর যুদ্ধে লড়েছিলেন নিজে। ২০০৬-এ অবসর নেন বেঙ্গল রিজিয়নের জিওসি হিসাবে। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রাজনীতি থেকে শতহস্ত দূরে থাকা প্রাক্তন সেনাকর্তার বক্তব্য, “অগ্নিপথ ভাবনাটা ভালো। কিন্তু আরও সতর্কভাবে এগোনো দরকার ছিল। যে অশান্তি চলছে ‘অগ্নিপথ’-এর নামে, তার নেপথ্যে রয়েছে অন্য বিষয়। কী, সেটা আপনারা খোঁজ করে দেখুন।“ শনিবার এই প্রতিবেদকের কাছে এই মন্তব্য করলেন প্রাক্তন সেনাকর্তা জেনারেল অরুণ রায়।

কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “কম্ব্যাট আর্ম, কম্ব্যাট সাপোর্টার এবং লজিষ্টিক সার্ভিস—সেনাবাহিনীতে মূলত এই তিনটি ভাগ থাকে। পেছনের সারি থেকে ধাপে ধাপে অগ্নিপথ-এর ভাবনা রূপায়ণ করা উচিত ছিল। এতে দেখা যেত অগ্নিবীররা কতটা, কোথায় স্থায়ী কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। এই ভাবনাটা ঠিক, চার বছর প্রশিক্ষণের পর শিক্ষার্থীরা বাকি জীবনটা কী করবে? এ দিক থেকে আমার অভিজ্ঞতা কিন্তু যথেষ্ঠ আশাব্যঞ্জক নয়। সেরা ২৫ শতাংশ স্থায়ী হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাকিদের নিশ্চয়তা কোথায়? এদিক থেকে নিশ্চিত হওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ও রাজ্য—উভয় স্তরে আইন প্রণয়ন দরকার।
অরুণবাবুর কথায়, “অন্যথায় কী হতে পারে জানেন? দোজ হু আর নট অ্যাবসর্বড অ্যান্ড নট স্টেবিলাইজড দে ক্যান গো রোগ’। প্রশিক্ষিত ওই বাহিনী দেশের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠতে পারে। ‘দে ক্যান বি টার্নিং রোগ ’ ‘গান ফর হায়ার’। আমরা অভিজ্ঞতায় এর প্রমাণ পেয়েছি।“
‘অগ্নিপথ’-এর চার বছরে ‘রেজিমেন্টেশন’ ঠিকমত হওয়া সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন অরুণবাবু। দেশের প্রতি ভালবাসা ছাড়াও এক একটা শ্রেণির সঙ্গে মিশে যেতে হবে। রাজপুত রেজিমেন্টে থাকার সময় আমিও গ্রামের বাড়িতে গিয়ে থাকতাম। ওদের সমাজজীবনের আকঙখা অনুভব করার চেষ্টা করতাম। এতে পূর্ণ অত্মস্থ হতে সময় লাগে। ১৯৬২-র যুদ্ধে একটি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে একটি ছেলে নিজের গ্রামে পালিয়ে আসে। সেই গ্রামের মোড়লরা গাঁয়ের বদনাম এড়াতে ওকে ধরে ফের বাহিনীর কাছে দিয়ে আসেন। এই সামগ্রিক বোধটাই একটা বড় জিনিস। তবে অগ্নিপথ-এ এর কিছুটা তো শেখা যাবেই।“

ভবিষ্যতে প্রচুর যোদ্ধা লাগতে পারে। অগ্নিপথ ছাড়া ভারতের মত অর্থকষ্টে থাকা দেশের কাছে বিকল্প আর কী হতে পারে? অভিজ্ঞ সেনাকর্তার মতে, “এ ন্যাশন হ্যাজ টু মেনটেন মিলিটারি। ইফ দি পে অ্যান্ড পেনশন ইজ এক্সপেনসিভ, জাষ্ট ট্রাই ডিফিট। এটা ঠিক পুরোদস্তুর স্থায়ী বাহিনীর জন্য প্রচুর অর্থ দরকার। কিন্তু প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা ভেবেচিন্তে করতে হবে। ’৬২-র যুদ্ধে পরাজয়ে ভারতকে অভাবনীয় মাসুল দিতে হয়েছিল। তাই অনেক ভেবে এগোতে হবে। নিতে হবে সতর্ক পদক্ষেপ।“

