আমাদের ভারত, ১০ ডিসেম্বর: জেলবন্দি শেখ শাহজাহানের বিরুদ্ধে চলা মামলার অন্যতম সাক্ষী ছিলেন ভোলানাথ ঘোষ। বুধবার সকালে আদালতে সাক্ষ্য দিতে যাওয়ার পথে আচমকাই মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হলেন তিনি। দুর্ঘটনায় তার ছোট ছেলে ও গাড়ির ড্রাইভারের মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর আহত ভোলানাথ নিজে। এটি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো অন্তর্ঘাত, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিজেপি নেতা তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার।
শেখ শাহজাহানের বিরুদ্ধে সিবিআই ও ইডি যে মামলা করেছে সেই মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন ভোলানাথ ঘোষ। বুধবার সকালে আদালতে সাক্ষী দিতে যাচ্ছিলেন তিনি। সেই সময় নেজ্যাটের বয়ারমারি পেট্রোল পাম্পের সামনে একটি ট্রাকের সঙ্গে ভোলা ঘোষের গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। তিনবার তার গাড়িতে ধাক্কা মারে ট্রাকটি বলে অভিযোগ। দুর্ঘটনার পর রাস্তার পাশে নয়ানজলিতে পড়ে যায় গাড়িটি। দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া গাড়ি থেকে স্থানীয় মানুষ উদ্ধার করে ভোলা ঘোষ সহ তিন জনকে। গাড়ির সামনের অংশ কেটে বের করা হয় সবাইকে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। গুরুতর অবস্থায় তাদের সকলকে হাসপাতালে পাঠানো হলে চালক এবং ছেলেকে মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।
এই ঘটনাকে পরিকল্পিত এবং এর সঙ্গে রাজ্য পুলিশের জড়িত থাকার মতো সন্দেহ প্রকাশ করেছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার। এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের জন্য আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তিনি। সুকান্ত মজুমদার বলেন, “যে ঘটনা দেখতে পাচ্ছি, তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দৌলতে হিন্দি সিনেমাকেউ হার মানাবে। আমরা হিন্দি সিনেমাতে দেখতাম ভিলেন সাক্ষীদের গাড়ি চাপা দিয়ে মেরে দিত। আজ সেই ঘটনা বাংলার রাস্তাতেই চলে এলো। এর জন্য দায়ী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মূল সাক্ষী ভোলা ঘোষ এবং তার পরিবার যখন কোর্টে সাক্ষ্য দিতে যাচ্ছিলেন তখন যেভাবে তাদের গাড়ি ধাক্কা দিয়ে মারা হয়েছে। হালিম মোল্লা এবং নজরুল মোল্লা যে দু’জন ট্রাকে ছিল, যাদের নাম পুলিশ বলছে, তারা তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা শেখ শাহজাহানের খুব কাছের লোক।”
এরপরেই তিনি সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, “পুলিশের কাছে কোনো তথ্য ছিল না? পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ তাহলে করছে কী? নাকি পশ্চিমবঙ্গ পুলিশও এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আছে? তার তদন্ত হওয়া উচিত। আমরা কোর্টের কাছে আর্জি জানাবো, যাতে এই ঘটনায় সঠিক তদন্তের নির্দেশ দেয়। এতে পুলিশের কোনো ইনভলবমেন্ট কিংবা সরকারি দপ্তরের কোনো ইনভলবমেন্ট আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।”
এদিকে এই ঘটনায় গুরুতর আহত ভোলা ঘোষের বড় ছেলের অভিযোগ ভয়াবহ। তাঁর কথায়, “এটি দুর্ঘটনা হলে একবার ধাক্কা লাগে। কিন্তু এখানে লরি তিন তিনবার ধাক্কা মেরেছে। ইচ্ছে করে গাড়িটা পুকুরে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। বাবাকে মারতে চেয়েছিল। জেল থেকেই সব করাচ্ছে শাহজাহান।”
কাকতালীয়ভাবে যিনি প্রতিদিন গাড়ির সামনের আসনে বসতেন সেই ভোলা এদিন পিছনের আসনে বসেছিলেন। সামনে বসে ছিল তার ছেলে আর তাতেই সম্ভবত কপাল জোরে বেঁচে যান ভোলা। তা না হলে তারই মৃত্যু হতো। আর এর থেকেই পরিবারের তরফে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আরো জোরদার ভাবে করা হয়েছে।
শাহজাহানের এক সময়ের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী ছিলেন এই ভোলা, পরে তিনি তার অনৈতিক কাজকর্মের প্রতিবাদ করেন। অভিযোগ, এরফলে তার উপর আঘাত নেমে আসে। রাতের অন্ধকারে বাড়িতে হামলা, ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়। যার ফলে পরিবার নিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল ভোলা। শাহজাহান গ্রেপ্তার হওয়ার পর সে আবার এলাকায় ফিরে ছিল। এই মামলাতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। আদালতে সাক্ষ্য না দেওয়ার জন্য চাপ, ভয় দেখানো সব অভিযোগই আগে জানিয়েছে ভোলার পরিবার।
এই ঘটনাকে পরিকল্পিত বলে দাবি করেছেন বিজেপি নেত্রী রেখা পাত্র। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করে খুন করার চেষ্টা করা হয়েছে। অভিযুক্ত ট্রাক চালক শেখ শাহজাহানের ঘনিষ্ঠ বলেও দাবি করেছেন বিজেপি নেত্রী।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, ভোলা আদালতে মুখ খুললে চাপে পড়তে পারতেন শাহজাহান। সেই কারণেই হয়তো সামনে এলো এই রহস্যে মোড়া দুর্ঘটনা। ভোলার ছেলের কথায়, বাবাকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা ছিল। জেল থেকে বসে এসব করাচ্ছে শাহজাহান। ঘটনার ফলে নতুন করে উত্তাল হয়েছে সন্দেশখালি। এটা নেহাত পথ দুর্ঘটনা, নাকি কোনো বড় ছক তা নিয়েই রাজ্য রাজনীতি উত্তাল।

