ত্রিবেণীতে কুম্ভস্নান করলেন হাজার হাজার সাধু, পুণ্যার্থী, পুণ্যস্নান করলেন সুকান্ত মজুমদার

আমাদের ভারত, হুগলি, ১৩ ফেব্রুয়ারি: হুগলির ত্রিবেণীতে গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতীর সঙ্গমস্থলে আজ কুম্ভস্নান করলেন নাগা সন্ন্যাসী, মঠ মন্দিরের সাধুসন্ত সহ হাজার হাজার পুণ্যার্থী। এদিন কুম্ভস্নান করলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার। ত্রিবেণী ছাড়াও উল্টোদিকে কল্যাণীর মাঝের চরে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর ঘাটেও হাজার হাজার মানুষ এবং সাধুসন্ত গঙ্গায় কুম্ভস্নান করেন।

আজ সকালে কল্যাণীর গৌরাঙ্গ ঘাটে এবং পরে ত্রিবেণীতে কুম্ভস্নান করেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার এবং এবং সাধুসন্তদের কাছ আশির্বাদ প্রার্থনা করেন। সুকান্ত মজুমদার বলেন, আজ থেকে ৭০৪ বছর আগে বর্বরতার জন্য এই পুণ্যস্নান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেই সময় দেবকোটের মুসলিম শাসক এটাকে বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

সুকান্ত বলেন, এটা কোইন্সিডেন্ট বলা যেতে পারে যে সেই দেবকোট আমার বালুরঘাট লোকসভার মধ্যে পড়ে। গঙ্গারামপুর দেবকোট নামে পরিচিত। আজ আমি এসে নিজেকে ধন্য মনে করছি। নিজের পুণ্য অর্জনের সুযোগ হয়েছে এবং ৭০৪ বছর পর হাজার হাজার মানুষ আসছে। এটা প্রমাণ করছে যে বাংলায় হিন্দুত্বের পুনরুত্থান হচ্ছে। বাংলা আবার আগের জায়গায় ফিরে আসবে, সোনার বাংলায় পরিণত হবে। পাশাপাশি তিনি অভিযোগ করেন, স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব এটাকে বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল। প্রথমে পারমিশন দেয়নি। পরে এই প্রোগ্রামকে হাইজ্যাক করার চেষ্টা করেছিল। আসলে তৃণমূল নেতাদের হিন্দুধর্মের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই।

গঙ্গা, যমুনা এবং সরস্বতীর এই সঙ্গমস্থলকে মুক্ত বেণী বলে। প্রয়াগ হল যুক্তবেণী। সেই যুক্ত বেণী এইখানে এসে মুক্ত হয়েছে। যুগ যুগ ধরে এখানে কুম্ভস্নান হয়ে আসছে। মহাভারতের বনবাস পর্বেও এই ত্রিবেণীর উল্লেখ রয়েছে। বনবাসকালে পাণ্ডবরা মহর্ষি দ্বৈপায়নকে বিভিন্ন তীর্থস্থান এবং পুণ্যতীর্থ স্নানের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে ঋষি দ্বৈপায়ন এই ত্রিবেণীর কথাও বলেছিলেন।

ত্রিবেণীতে একসময় ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধুসন্তরা এখানে আসতেন। মকর সংক্রান্তিত উপলক্ষে গঙ্গাসাগরে পূণ্য স্নানের পর সাধু এবং পুণ্যার্থীরা প্রায় একমাস ধরে হেঁটে ত্রিবেণীতে আসতেন। তারপর মাঘী সংক্রান্তির দিন কুম্ভ স্নান সেরে তারা তাদের আশ্রমে ফিরে যেতেন।

কিন্তু ৭০৩ বছর আগে বহিরাগতদের আক্রমণের ফলে কুম্ভ স্নান বন্ধ হয়ে যায়। ত্রিবেণী কুম্ভ পরিচালনা সমিতির কোঅর্ডিনেটর বাবু গুহরায় জানান, বহিরাক্রমণের ফলে এখানকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হয়ে যায়। তারপর গত দু’বছর ধরে এই কুম্ভ স্নান শুরু হয়েছে। মূলত আমেরিকায় বসবাকারী কাঞ্চন ব্যানার্জির উদ্যোগে ২০২২ সাল থেকে এই কুম্ভস্নান শুরু হয়েছে।

কাঞ্চন ব্যানার্জি দীর্ঘ গবেষণার পর দেখান, এখানে কুম্ভস্নান হত এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণের ফলে ৭০৩ বছর আগে তা বন্ধ হয়ে যায়। তার উদ্যোগেই এই কুম্ভ স্নান প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০২২ এ তৈরি হয় ত্রিবেণী কুম্ভ চালনা সমিতি। তাদেরই পরিচালনায় গতবছর থেকে এই কুম্ভ স্নান হচ্ছে। কুম্ভ পরিচালনা সমিতির কোঅর্ডিনেটর বাবু গুহরায় জানান, কুম্ভস্নান উপলক্ষে বিভিন্ন শক্তিপীঠ থেকে জল এনে ত্রিবেণী সঙ্গমস্থলে (গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতীর সঙ্গমস্থলে) মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বীরভূমের ১৩ টি শক্তিপীঠ বাংলাদেশের ৯ টি শক্তিপীঠ এবং উত্তরবঙ্গের ৩টি শক্তিপীঠ থেকে জল আনা হয়েছিল এবার।

এবার অঘোরী সম্প্রদায়ের নাগা সন্ন্যাসীরাও এই কুম্ভ স্নানে এসেছেন। কুম্ভ স্নান উপলক্ষে গতকাল মহারুদ্রযজ্ঞ এবং গঙ্গা আরতি করা হয়। কম্ভ মানে মহাদেবকে বোঝায়। তাই আজ কুম্ভ স্নানের আগে মহাদেবের মূর্তি নিয়ে এলাকায় শোভাযাত্রা করা হয়। পরিক্রমা শেষে মহাদেব প্রথম কুম্ভস্নান করেন। এরপর নাগা সন্ন্যাসীরা স্নান করেন। এরপর একে একে বিভিন্ন মঠ মন্দিরের সাধুসন্ত এবং হাজার হাজার পুণ্যার্থী কুম্ভস্নান করেন। আজ কুম্ভ স্নানের মহাযোগ ছিল সকাল ১০.৩০টা থেকে বিকেল ৩.৩০টা পর্যন্ত। এই ত্রিবেণীর উল্টো দিকেই রয়েছে কল্যাণী। সেখানে মাঝের চরে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর ঘাটেও বহু নাগা সন্ন্যাসী এবং হাজার হাজার পুণ্যার্থী কুম্ভ স্নান সারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *