জে মাহাতো, আমাদের ভারত, পশ্চিম মেদিনীপুর, ১১ জুলাই: ফের পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরায় ডাইনি অপবাদ দিয়ে এক মহিলাকে মারধর করার অভিযোগ উঠেছে। গত ২ দিন ধরে সালিশি সভার নামে তীব্র অত্যাচার ভোগ করার পর কোনও রকমে পালিয়ে বেঁচেছেন আক্রান্ত ওই মহিলা। আতঙ্কের ছাপ তাঁর পরিবারের চোখে মুখে। ঘটনায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে ডেবরা থানায়। যদিও এখনও গ্রেপ্তার হয়নি কেউ। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নির্যাতিতা মহিলার নাম চাঁদমণি মুর্মু। বাড়ি ডেবরা থানারই লোয়াদা গ্রামপঞ্চায়েত এলাকার ভুঁইঞাবসান গ্রামে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চাঁদমণি এবং তাঁর স্বামী সনাতন পেশায় দিন মজুর। সামান্য খাস জমি রয়েছে ওই সন্তানহীন দম্পত্তির। আদিবাসী অধ্যুষিত ভুঁইঞাবসান গ্রামে শ’খানেক পরিবার রয়েছে। ওই এলাকায় কয়েক বছর আগে একটি গরু মারা যায়। তারপর থেকেই সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হয় এই দম্পতিকে। গত চারবছরে অসুখ বিসুখে মানুষের মৃত্যুর দায়ও চাপানো হচ্ছিল এই পরিবারটির ওপরেই।
নির্যাতিতার স্বামী সনাতন জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার থেকে হঠাৎই গ্রামের পরিবেশ থমথমে হয়ে যায়। কেউ আমাদের সঙ্গে কথা বলছিল না। তখনই খারাপ লক্ষণ পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল কিছু একটা হতে চলেছে আমাদের সাথে। গ্রামের কিছু মানুষ ঘোরা ফেরা করছিল বাড়ির আশেপাশে। বুঝতে পারি নজরদারিতে রয়েছি আমরা। ঠিক করেছিলাম সন্ধ্যে হলে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে পালাবো কিন্তু ততক্ষণে ওরা আমাদের বাড়ি ঘিরে ফেলেছিল। তারই মধ্যে স্বামী-স্ত্রী মিলে বাড়ির পেছন দিয়ে পালানোর চেষ্টা করি। কিন্তু পালাতে পারিনি।”
ওই দিন আমাদের ২জনকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে শুরু হয় রাতভর সালিশি। মোড়লরা জানায়, তারা তাদের ‘জানগুরু’ বা গুণিনের কাছে গিয়েছিল। জানগুরুই জানিয়েছে যে সনাতন ও চাঁদমণিই ডাইনি। নিদান দেওয়া হয় গ্রাম ছাড়তে হবে। কিন্তু মানতে চাননি ওই দম্পত্তি। এরপরই শুরু হয় মার। এরপর ভোর রাতে সবাই নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ার সুযোগ নিয়ে সালিশি সভা থেকে পালানোর চেষ্টা করেন ২ জন। উদ্দেশ্য ছিল আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার। এবার সনাতন পালাতে পারলেও ধরা পড়ে যান চাঁদমণি।
চাঁদমণি বলেন, ‘দ্বিতীয়বার মারধরের আগেই আমরা পালানোর চেষ্টা করি। ইচ্ছা ছিল বাপের বাড়ি যাব কিন্তু ওরা আমাকে ধাওয়া করে ধরে ফেলে। ফের আমাকে তুলে আনা হয় গ্রামে। শুরু হয় মারধর। সন্ধ্যে পর্যন্ত দফায় দফায় মারধর চলে। মারের সময় ওরা একটা কথাই বলছিল, আমাদের গ্রাম ছাড়তে হবে। না হলে মেরে পুঁতে দেবে আমাদের। বলছিল আমরাই নাকি গরু আর মানুষ গুলোকে খেয়ে ফেলছি।’
এদিকে গ্রামবাসীদের একাংশের কাছ থেকে ঘটনার কথা জানতে পারে গ্রামে থাকা সিভিক ভলান্টিয়ার। তাঁদের মাধ্যমেই খবর যায় ডেবরা থানায়। ছুটে যায় পুলিশ। উদ্ধার করা হয় চাঁদমণিকে। শনিবার সকালে ডেবরা হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর ডেবরা থানায় অভিযোগ দায়ের করেন চাঁদমণি।

