শাসক দলের গোষ্ঠী কোন্দল, নব জোয়ারে জনসমাগম না হওয়ার খেসারত! বুদবুদ থানার ওসি বদলি, জল্পনা রাজনৈতিক মহলে

আমাদের ভারত, দুর্গাপুর, ২২ মে: গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জেরবার শাসক দল। অধিবেশনের ভোটাভুটিতে ঠাঁই না পাওয়ায় অন্তর্দ্বন্দ্ব চরমে ওঠে। নব জোয়ার আসার আগেও সভাস্থলের বাইরে তুমুল বচসা হয়। যার জেরে ভোটাভুটি মুখো সেভাবে হয়নি। অধিবেশনস্থল কার্যত ফাঁকা পড়েছিল। আর ফাঁকা মাঠে মঞ্চেই ওঠেনি তৃণমূলের সর্ব ভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। নব জোয়ার জেলা থেকে বেরোতেই বদলির ডাক পেলেন বুদবুদ থানার ওসি। আর তাতেই শোরগোল পড়ছে পূর্ব বর্ধমানের রাজনৈতিক মহলে। নব জোয়ারে লোকজনের ভাটা পড়ে যাওয়ার খোসারত ওসিকে দিতে হল বলে কটাক্ষ করেছে বিজেপি। যদিও প্রশাসনিক বিষয় বলে সাফাই দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্ব।

প্রসঙ্গত, দরজায় কড়া নাড়ছে পঞ্চায়েত নির্বাচন। তার আগে রাজ্যে শিক্ষাক্ষেত্র সহ নানান দিকে আষ্টেপিষ্টে দুর্নীতিতে জড়িয়ে তৃণমূল। তার ওপর কয়লা, গরু পাচারে বিদ্ধ শাসক দলের একাধিক নেতা। আর ওই ইস্যুকে হাতিয়ার করেছে গেরুয়া শিবির। পাল্লা দিয়ে দুর্নীতিকে ইস্যু করে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বাম শিবির। তারওপর গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জেরবার। দলীয় কর্মসূচিতে তা বারংবার প্রকাশ্যে এসেছে। পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে সংগঠনকে মজবুত রাখতে আসরে নেমেছে তৃণমূল সাংসদ তথা তৃণমূলের সেকেন্ড ইন্ কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। গত প্রায় একমাস ধরে জেলায় জেলায় নব জোয়ার কর্মসূচি শুরু হয়েছে। বাতানুকুল বিশেষ গাড়িতে চলছে তাঁর জেলা সফর। জেলা সফরের মধ্যেই কোথাও জনসভা, কোথাও শোভাযাত্রা আবার কোথাও অধিবেশন করছেন। তার সঙ্গে এলাকায় নিশিযাপনও করছেন। আর এই কর্মসূচির মাধ্যমে আগামী পঞ্চায়েত নির্বাচনে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলছে। তার জন্য শিবির করে দলীয় প্রার্থী নির্বাচন চলছে। গত ১৫ মে বুদবুদের মানকরে ছিল নব জোয়ারের অধিবেশন। মানকর ফুটবল ময়দানে বিশেষ শিবিরে ছিল প্রার্থী নির্বাচনের ভোটাভুটি। ওইদিন গলসি-১ ও ২নং ব্লক, আউশগ্রাম ১ ও ২ নং ব্লক, মঙ্গলকোট, ভাতার ব্লকে ভোটাভুটি ছিল। ভোটাভুটির আগে চরম গোষ্ঠী কোন্দল প্রকাশ্যে চলে আসে তৃণমূলের। গলসি -১ নং ব্লকে তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসে। ওইদিন বিকেল নাগাদ দলের ভোটারদের রেজিষ্ট্রেশন শুরু হয়। ভোটাভুটির শুরুতেই অভিযোগ ওঠে, প্রার্থীপদে সব ব্লক সভাপতি অনুগামীদের নাম। ঠাঁই পায়নি অপর গোষ্ঠীর অনুগামীদের প্রার্থী। আর তাতেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে তৃণমূলের নীচুতলার কর্মীদের একাংশ। শুধু তাই নয়। সন্ধ্যা নাগাদ দুই গোষ্ঠীর মধ্যে তুমুল বচসা শুরু হয়। একটা সময় উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। মারপিট হওয়ার পর্যায়ে চলে আসে। 
সভাস্থলে অনেক কর্মীই ক্ষোভ উগরে জানান, “গত লোকসভা, বিধানসভার নিরিখে আমার সাংসদ দলকে বিপুল ভোটে লিড দিয়েছি। আমাদের ভেতরে ঢোকার কোনো গুরুত্ব পেলাম না। এর থেকে লজ্জার কিছু নেই।” আর ওই গোষ্ঠী কোন্দলে অধিবেশন মুখোই হয়নি বহু কর্মী। যার ফলে অধিবেশনস্থল ছিল কার্যত ফাঁকা। শিবিরে আসলেও, ফাঁকা মাঠে মঞ্চে ওঠেননি তৃণমূলের সর্ব ভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু তাই নয়, ওইদিন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় মঞ্চে না ওঠায়, আগত কর্মীরা কিছুটা হতাশ হয়ে পড়েন। অশোক ভট্টাচার্য গলসি-১ নং ব্লকের চাকতেঁতুল পঞ্চায়েতের প্রধান বলেন, “দলের যুবরাজ কর্মীদের কি বার্তা দেয় তা নিয়ে আশায় ছিলাম। ওনার বার্তা গ্রামে ফিরে দলীয় কর্মীদের শোনাবো। সেটা শোনার জন্য এসেছিলাম। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মঞ্চে উঠলেন না। কিছুটা হতাশ হলাম।”

যদিও, অভিষেক মঞ্চে না ওঠা প্রসঙ্গে তৃণমূলের সাফাই ছিল, “বৃষ্টিতে বহু কর্মী ভিজে গেছে। ভেজা জামা কাপড়ে ছিলেন। ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন কর্মীরা। তাই কর্মীদের কথা চিন্তাভাবনা করে আর মঞ্চে আসেননি।” এতো গেল অধিবেশনস্থল। পরদিন বুদবুদ বাজারে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে অভর্থ্যনা দিতে অলিখিত রোড’শো হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল দলের একাংশ। কিন্তু, অন্তর্দ্বন্দ্বে সেটাও বাতিল হয়ে যায়। যার জেরে অভিষেকের ফেরার পথ মানকর থেকে বুদবুদ বাজারের একাংশ কার্যত দলীয় কর্মী ও সমর্থকহীন ছিল। নব জোয়ারে জন জোয়ার হয়নি। প্রশ্ন ওঠে, গলসি-১ নং ব্লকের ৯টি অঞ্চল ও ১টি পঞ্চায়েত সমিতি তৃণমূলের দখলে। পাশে আউশগ্রাম-২ নং ব্লকও তৃণমূলের দখলে। তারপরও মাঠ না ভরায় জল্পনা ছড়িয়ে পড়ে রাজনৈতিক মহলে। যা নিয়ে কার্যত, দলের ব্লকস্তরের নেতৃত্বকে অস্বস্তিতে পড়তে হয়। জেলা থেকে নব জোয়ার যেতেই সপ্তাহখানেক পরই আচমকা বুদবুদ থানার ওসি মইনুল হককে বদলি করা হয়। রবিবার বুদবুদ থানার ওসি মইনুল হককে বদলি করা হয় রূপনারায়ণপুরে। সংস্কৃতি মনস্ক মইনুলবাবুকে সরাতেই এলাকায় গুঞ্জন শুরু হয়। একই সঙ্গে জল্পনা শুরু হয় রাজনৈতিক মহলে। 

বিজেপি বিধায়ক লক্ষ্মণ ঘড়ুই বলেন, “রাজ্যে পুলিশ তৃণমূলের দলদাস। থানার ওসিরাই এখন তৃণমূলের ব্লক সভাপতি। এটাতো স্বাভাবিক নব জোয়ারে গোষ্ঠীকোন্দল সামাল দিয়ে জনসমাগম করতে পারেনি। নব জোয়ারে লোকজনের ভাটা পড়ে যাওয়ার  খেসারত দিতে হল বুদবুদ থানার ওসিকে।” তিনি আরও বলেন,” প্রশাসন ও রাজনীতিকে এক করা উচিত নয়। পুলিশ ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া উচিত।”

যদিও তৃণমূলের গলসি-১ নং ব্লক সভাপতি জনার্দ্দন চট্টোপাধ্যায় বলেন,
“এটা প্রশাসনিক বিষয়।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *