(১১ই ডিসেম্বর, ১৯৩৯ — ১৩ই মে, ২০২১)।
ড. কল্যাণ চক্রবর্তী
আমাদের ভারত, ১৬ মে: ১৯৬৩ সাল। রামকৃষ্ণ মিশন বালকাশ্রম পরিচালিত ব্রহ্মানন্দ স্নাতকোত্তর বুনিয়াদি শিক্ষণ মহাবিদ্যালয়ের পঠনপাঠন সবেমাত্র শুরু হয়েছে (১৯৬১)। এখানে পিজিবিটি শিক্ষার্থীরূপে যোগ দিতে রহড়ায় এসেছেন পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনির খসলা ইন্দুমতী হাইস্কুল আপার প্রাইমারির ভাষা বিভাগের শিক্ষক শশাঙ্ক শেখর তেওয়ারি। খসলা কোএডুকেশন স্কুলের তিনি কেবল শিক্ষকই ছিলেন না, ছিলেন সেই স্কুলের হেডমাস্টারও। সেই স্কুল থেকেই ডেপুটেশনে পড়তে এলেন তিনি। গড়বেতা কলেজ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স ডিগ্রি নিয়ে খসলা স্কুলে যোগ দিয়েছেন (১৯৬১ সালে), তখন তাঁর বয়স সবে ২১ পেরিয়ে ২২৷
শশাঙ্কবাবু রহড়ায় এসে নার্সারি থেকে মহাবিদ্যালয় পর্যন্ত বিরাট এক ‘এডুকেশন কমপ্লেক্স’ দেখে বিস্মিত হয়ে গেলেন। জানলেন ১৯৪৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর ৩৭টি অনাথ বালক নিয়ে গড়ে ওঠা বালকাশ্রমই এই উনিশ বছরে বিরাট মহীরূহে পরিণত হয়েছে। বালকাশ্রমের প্রাণপুরুষ স্বামী পুণ্যানন্দজি মহারাজ; যাঁকে আশ্রমিক ও স্থানীয় অঞ্চলের অধিবাসীরা ‘স্বামীজি’ রূপে সশ্রদ্ধ সম্বোধন করেন। এক সৌম্যদর্শন সুপুরুষ, বলিষ্ঠ সুঠাম দীর্ঘকায় মানুষটি তাঁর সশ্রদ্ধ দৃষ্টি আকর্ষণ করলো।
তখন মিশনের হাইস্কুল (জানুয়ারি, ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত) হায়ার সেকেন্ডারী মাল্টিপারপাশ স্কুলে রূপান্তরিত হয়ে গেছে (১৯৫৭ সাল থেকে)। কলেজের ‘প্র্যাকটিস টিচিং’ ওই স্কুলেই চলে। সর্বভারতীয় স্তরে বহুল পরিচিত সেই স্কুল; ১৯৬৩ সালে এই স্কুলকে ভারত সরকার অন্যতম সেরা মডেল-বহুমুখী-বিদ্যালয়ের মর্যাদা দিয়েছে। সেই স্কুলেই নবম ‘ক’ শ্রেণিতে পাঠদানরত শশাঙ্কবাবু। কখন পিছনের দরজা দিয়ে এসে একদম লাস্ট বেঞ্চে বসে পড়েছেন স্বামীজি, তাঁর ক্লাস পর্যবেক্ষণ করছেন। ক্লাসের শেষে স্বামীজি তাঁকে ডেকে কার্যালয়ে দেখা করার নির্দেশ দিলেন। নির্দিষ্ট সময়ে হাজির হলে মিশন স্কুলে শিক্ষকতা করার ইচ্ছে আছে কিনা তিনি জানতে চাইলেন। শশাঙ্কবাবুর কয়েক প্রজন্ম শিক্ষক, বাবা দেবেন্দ্রনাথ তিওয়ারি শালবনির সংস্কৃত টোলের পণ্ডিত। তাই রামকৃষ্ণ মিশনের মতো একটি স্কুলে পড়ানোর সুযোগ আসছে বুঝতে পেরে তা পরম সৌভাগ্য মনে করে আন্তরিক সম্মতি জানালেন। তদুপরি মিশনে শিক্ষকতার সুবাদে স্বামীজির নিকট-সান্নিধ্যলাভের সুযোগ পাবেন, তাঁর অভিনব কর্মকুশলতা ও গুণাবলির সান্নিধ্য লাভ করবেন, ভাবা যায়!
শশাঙ্কবাবুর আর ফেরা হল না খসলা কোএডুকেশন স্কুলে। তিনি রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের অধীনে সিনিয়র বেসিক স্কুলে যোগদান করলেন বাংলার শিক্ষক হিসেবে ১৯৬৩ সালের শেষ ভাগে। এই স্কুল ১৯৭০ সালে নাম বদল করে হল জুনিয়র হাইস্কুল। সেই স্কুলেই থেকে গেলেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি প্রাইভেটে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেছিলেন, পিজিবিটি আগেই ছিল। পরে ইতিহাস বিষয়ে প্রাইভেটে এম.এ. পড়া শুরু করলেও সাংসারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক জীবনের ব্যস্ততায় তা আর শেষ করা হয়নি।
তিনি ছাত্রদের কেবল বাংলা নয়, সংস্কৃত, গণিত, জীবনবিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয় পড়াতেন, যা ছাত্রদের কাছে খুবই গ্রহণযোগ্য ছিল। এই বিষয়গুলি নিজে নিজে আয়ত্ত করতে তিনি রাতের পর রাত মশারি মধ্যে পড়াশোনা করতেন, আত্তীকরণ করে তবে তিনি ছাত্রদের মধ্যে ফিরয়ে দিতেন। অসাধারণ হস্তাক্ষর ছিল তাঁর, হাতের লেখার ক্লাস নিতেন, গ্রীষ্ম ও পুজোর অবকাশে ছাত্রদের এক খাতা হাতের লেখা দিতেন। এই স্কুলে থাকাকালীনই তিনি সাক্ষী থেকেছেন বর্তমান বিদ্যালয় গৃহটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের; এসেছিলেন মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ স্বামী বীরেশ্বরানন্দজী মহারাজ (২৩ শে মার্চ, ১৯৬৬)। স্বামীজির আদর্শ ‘জীবসেবাই ভগবৎসেবা’ — শশাঙ্ক বাবুর চিন্তাচেতনায় ভরপুর ছিল। আটের দশকের শেষে তিনি স্বামী ভূতেশানন্দজী মহারাজের কাছে মন্ত্রদীক্ষিত হয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন জীবনে চলার পথে শিক্ষা সবচাইতে বড় হাতিয়ার।

তিনি এমন একজন সমাজসেবী শিক্ষক ছিলেন, যিনি গেরুয়াধারী সন্ন্যাসী না হয়েও ছিলেন সন্ততুল্য। তখনকার দিনে সর্বমান্য শিক্ষকরা সিনেমা দেখতেও যেতেন না, পাছে তা ছাত্রদের অনুকরণীয় হয়! রহড়ায় তখন ‘শ্রীমা’ সিনেমা হল (পরে নাম পরিবর্তিত হয়ে ‘কমলা’, আরও পরে ‘বন্দনা’) এবং খড়দহে ‘প্রফুল্ল’ হল। শশাঙ্কবাবু একবার কথা প্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন, তিনি এক দুইবার কোনো দেব মাহাত্ম্যের সিনেমা ছাড়া দীর্ঘ রহড়া-জীবনে কখনও প্রেক্ষাগৃহমুখী হননি। তাঁর চরিত্র গঠনে মা রাধারাণী দেবীর বিশেষ প্রভাব ছিল।
১৯৬৪ সালে তিনি বিবাহ করেন বাঁকুড়া-দুর্গাপুর শাখার বেলিয়াতোড় থেকে জঙ্গলের পথে এক প্রকৃতি-সুন্দর গ্রামে; ‘পাঁচাল’ সেই গ্রামের নাম; সেখানকার সুশীলা, সঙ্গীতজ্ঞা তন্দ্রা দেবীকে। তন্দ্রা দেবী খড়গপুরে কর্মরত এক রেলকর্মীর সন্তান। বিবাহের পর সেই অজ পাড়াগাঁয় শশাঙ্কবাবুর উপস্থিতিতে যেন সাংস্কৃতিক জোয়ার নেমে এলো। স্কুলের ছুটির দিনগুলিতে পাঁচাল গ্রামে গিয়ে যাত্রাপালার আসর জমাতেন শশাঙ্কবাবু। শ্রীরামকৃষ্ণের অনুভব অনুযায়ী তিনি মনে করতেন, যাত্রাপালায় লোকশিক্ষা হয়। শ্বশুরালয়ে গাঁয়ের ছেলেমেয়েদের দিয়ে যাত্রাপালা করাতেন, নিজেও অভিনয় করতেন। আটের দশকের শুরুতে মিশনের স্কুলে আমার দেখা তাঁর সেরা পারফর্মেন্স ‘পলাশীর পরে’ নাটকে ‘রেজা খাঁ’-র ভূমিকায় অভিনয়৷ রহড়া মিশনে অনাথ ছাত্রদের ভরণপোষণে এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অঙ্গরূপে কত যে যাত্রাপালার আয়োজন করিয়েছিলেন, তার ইয়ত্তা নেই। নাটক ও যাত্রার টিকিট বিক্রি থেকেও একসময় আয় করতে হয়েছে মিশন কর্তৃপক্ষকে, সেই কর্মযজ্ঞে তিনি বালকাশ্রমকে সহযোগিতা করেছেন সবসময়। ছাত্রদেরও অভিনয়ের জগতে প্রবেশ করানোর কাজে স্বামী পুণ্যানন্দ মহারাজকে সর্বোতভাবে সহায়তা করেছেন, সঙ্গে পেয়েছিলেন বি.টি. কলেজের অসিতবাবুকে। যখন ছাত্রদের দিয়ে অভিনয় করাতেন, তার চিত্রনাট্যে টাইমিং এদিক-ওদিক হবার জো ছিল না — ‘ঝং’, ‘ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিক’ ইত্যাদি কথাগুলি লিখে রাখতেন পরিস্কার করে। বহুবার তিনি ছাত্রদের নিয়ে রেডিও প্রোগ্রাম করেছেন।
১৯৬৪ সালের জানুয়ারি মাসে সাম্প্রদায়িক অসন্তোষের কারণে,খড়দহ এলাকায় দাঙ্গা বেধে যাবার উপক্রম হল। সমস্যা সমাধানে স্বামী পুণ্যানন্দজী বলিষ্ঠ ভূমিকা নিলেন। স্বামীজির আহ্বানে সদ্য নির্মিত বিবেকানন্দ হলে দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ ‘শান্তিবৈঠক’-এ যোগ দিলেন। স্বামীজির যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য কার্যকর করা হল। সিপিআই-এর স্থানীয় নেতা তথা খড়দহের প্রাক্তন বিধায়ক গোপাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে পরিচালিত বিশাল শান্তিমিছিলে যোগ দিলেন তিনি। খড়দায় শান্তির পরিবেশ ফিরে এলো।
ছাত্র জীবনে গড়বেতা কলেজে পড়ার সময় তিনি কমিউনিস্ট ভাবধারায় পরিচালিত ছিলেন। যদিও রামকৃষ্ণ মিশনে শিক্ষক হিসাবে যোগদান করার পর তিনি কোনো রাজনৈতিক পরিচিতি দেখাননি। আটের দশকের শুরুতে রহড়া মিশনের সঙ্গে সিপিএম সমর্থিত কলেজ অধ্যাপক-শিক্ষাকর্মী-ছাত্রদের যে বিতর্ক শুরু হয়, তাতেও রাজনৈতিক দলকে সমর্থন দেননি। তিনি চাইতেন বিবেকানন্দ শতবার্ষিকী কলেজের কৌলিন্য বজায় থাকুক, আর পাঁচটা কলেজের বাইরে রাজনীতি মুক্ত এক শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে উঠুক ভি.সি. কলেজ। সমস্ত রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সঙ্গেই তিনি কথা বলতেন, তারাও আশীর্বাদ শুভেচ্ছা নিতে নিত্য আসতেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বহু রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী, সাংসদ ও বিধায়ক এসেছেন। তবে জীবনের শেষপর্বে এসে গত ২০২১ সালের নির্বাচনের পূর্বে শাসকদলের এক ভোটপ্রার্থী নেতা, তাঁর সঙ্গে তোলা ছবি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করায়, তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছিলেন, অসম্ভব মনোকষ্ট পেয়েছিলেন। তাঁর অরাজনৈতিক প্রকাশনায় কেউ রাজনীতির কালিমা লাগিয়ে দিক, এটা চাননি তিনি। কিন্তু শারীরিক সমস্যা, উপরন্তু কোভিডের বাড়বাড়ন্তের সময়ে তিনি তাঁর মনোভাব সাধারণ্যে পৌঁছে দেবার সময় পাননি।
প্রথম জীবনে শিক্ষক হিসাবে তিনি যথেষ্ট কঠোর ছিলেন, ছাত্ররাও ভয় পেতেন। নকশাল পিরিয়ডের সময় ক্লাস এইট থেকেই অনেকে রাজনীতির আঙিনায় পা মেলাতেন এবং স্কুলের নিয়মানুবর্তিতায় ব্যাঘাত ঘটানোর চেষ্টা করতেন। এইসমস্ত ছাত্রদের তিনি কড়া হাতে দমন করেছিলেন, অনেক সময় বেত্রাঘাতও করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি বরাবরই ছাত্র দরদী ছিলেন। বিশেষ করে অনাথাশ্রমের ছেলেদের জন্য খুবই উদারতা দেখাতেন। চাসনালা খনি দুর্ঘটনার পর মৃত সাঁওতাল ও অন্যান্য খনি শ্রমিকের ছেলেদের রামকৃষ্ণ মিশনে আনা হলে, তাদের যথেষ্ট স্নেহ করতেন, পড়াশোনায় বিশেষ নজর দিতেন। আটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে তিনি বালকাশ্রমে ছাত্রদের পড়ানোর জন্য দায়িত্ব নিলেন। আশ্রমিক ছাত্রদের রেজাল্ট ভালো হোক এই চেষ্টা শুরু করলেন রমানন্দজী মহারাজ। তাতে শামিল হলেন তিনি।

(ছবি: রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন জুনিয়র হাইস্কুলের নব ভবনের উদ্বোধন করতে এসেছিলেন মঠ ও মিশনের পরমপূজ্য প্রেসিডেন্ট মহারাজ স্বামী বীরেশ্বরানন্দজী। পাশে স্কুলের হেডমাস্টার শশাঙ্ক শেখর তেওয়ারি, সঙ্গে সুনীল মহারাজ।)
সেই সময় তাঁর ছোটো ছেলে সুদীপ্তকে আশ্রমে নিয়ে এসে তাদের সঙ্গেই পড়তে বসিয়ে দিতেন। তাঁর বড় ছেলে সুপ্রিয় আমার ক্লাসমেট। মননে এবং উদারতায় বাবার প্রভাব পড়েছে। ১৯৮৪ সালের প্রাক্তনী প্রয়াসে তিনি অন্যান্যদের সঙ্গে সমাজসেবার কিছু কাজ করেছেন। তাঁর পরিবারের তরফে যেটা শুনেছি, SST Sir (‘শশাঙ্ক শেখর তেওয়ারি স্যার’-কে এই নামেই ডাকা হত) বরাবরই ‘অনেকের সম্পত্তি’, তাঁকে পরিবার বেঁধে রাখতে পারেননি। মিশনের যাবতীয় অনুষ্ঠানে তিনি, এক্সিবিশনের আয়োজক তিনি, ফুটবল খেলার ধারাবিবরণীতেও তিনি, ছাত্রদের নিয়ে শিক্ষামূলক ভ্রমণের তিনি গাইড, শিক্ষা-প্রশাসনেও তিনি মিশনের পক্ষে এক শুভঙ্কর শক্তি। সর্বত্র মিশনের কাজে সহায়তা করে হয়ে উঠেছিলেন সর্ব সাধারণের সম্পত্তি।
শুধুই রামকৃষ্ণ মিশন নয়, রহড়া খড়দহের নানান সামাজিক সংগঠনে কাজের সুবাদে তিনি তাদের মধ্যমণি হয়ে উঠলেন। ছয়ের দশকের একদম শেষে স্বামী অভেদানন্দ চ্যারিটেবল ইউনিট গড়ে উঠলে তিনি তাতে যুক্ত হয়ে গেলেন। জন্মলগ্ন থেকেই রহড়া আন্তরিক ফ্রি কোচিং সেন্টারের তিনি অবৈতনিক শিক্ষক। প্রবীণ নাগরিকদের সংগঠন ‘সানসেট বার্ড’-এর তিনি ছিলেন উজ্জ্বল সদস্য। খড়দহ বইমেলায় তিনি প্রথম থেকেই যুক্ত ছিলেন। খড়দহ সংস্কৃতি অঙ্গনের নানান অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি সৌকর্য বৃদ্ধি করেছিল। এছাড়াও নানান সাংস্কৃতিক সংগঠন, পত্র-পত্রিকায় তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করে তুলেছিলেন। কত যে পত্রিকায় রকমারি লেখা লিখেছেন, কত যে ম্যাগাজিনে শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়েছেন, তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু সর্বত্র তিনি সমদর্শীভাব বজায় রেখে চলতেন। কখনও কারও মনে হয় নি, স্যারকে কেউ কিনে নিয়েছেন, স্যার কোন ব্যক্তি বিশেষ বা রাজনৈতিক দলের হাতের পুতুল।
সত্তরের দশকের শুরুতে নকশাল আন্দোলনে উত্তাল বাংলা। তিনি সমস্তিপুর প্যাসেঞ্জারে করে কিছু প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে শ্বশুরালয়ের উদ্দেশ্য দুর্গাপুর যাচ্ছেন। টিটাগড় স্টেশন থেকে উঠবেন। শীতের সকাল। মিশন কোয়ার্টার থেকে অন্ধকার থাকতে রওয়ানা দিয়েছেন। খড়দহ স্টেশনের কাছাকাছি আসতেই পাইপগান নিয়ে কয়েকজন পার্টিকর্মী যুবক তাঁকে ঘিরে ধরলেন। কিন্তু তারা অনতিবিলম্বে বুঝতে পারলেন, নিজেদের ভুল। “স্যার, আপনি? এত ভোরে?” “হ্যাঁ বাবা, টিটাগড় থেকে ট্রেনে উঠবো।” স্কুলের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যে ছাত্রদের তিনি বেত্রাঘাত করেছেন, তারাই পরম যত্নে স্যারকে টিটাগড়ে ট্রেনে তুলে দিয়ে এলেন। পরে শশাঙ্ক বাবু বলেছিলেন, সেই সময় ছাত্ররা শিক্ষকের বেত্রহস্তই কেবল দেখতেন না, দেখতেন তাদের ছাত্রদরদী মনটাও। আজ শিক্ষার আঙিনা অনেকটাই বদলে গেছে, শিক্ষা কেবল এক পণ্যে পরিণত হয়েছে। এই সময় বেতপেটানো মাস্টারমশাইরা হারিয়ে গেছেন, যারা ছাত্রদের মারার পর টিচার্সরুমে গিয়ে নিজেও কেঁদে উঠতেন।
মিষ্টি খেতে ভালোবাসতেন SST Sir, বেলিয়াতোড়ের বিখ্যাত ‘ম্যাচা সন্দেশ’ তাঁর প্রিয় ছিল। শুনেছি বেলডাঙ্গার ‘মনোহরা’ মিষ্টিও খুব পছন্দ করতেন। পশ্চিম সীমান্ত বঙ্গের গ্রামের ছবি তাঁর প্রিয় ছিল। শালপাতার ঠোঙায় সবাইকে নিয়ে মুড়ি-চপ খেতে ভালোবাসতেন। শেষের দিকে সুগারের জন্য তিনি মিষ্টি খেতে পারতেন না। কিন্তু নানান আয়োজনে মিষ্টান্ন পরিবেশনে কার্পণ্য ছিল না। বড় ছেলের ফ্যাক্টারিতে গিয়ে কর্মীদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করে কুশল সংবাদ নিতেন। তাঁর আচরণও অসম্ভব মিঠে, মিষ্টি তার শুভাশিষ, মনোজ্ঞ করে কথা বলার সৌন্দর্য ছিল তার। ধুতিপাঞ্জবি পরিহিত বাঙালি পোষাক, আর মুখ থেকে অনর্গল ঝরে পড়তো বিশুদ্ধ কথ্য বাংলা। ‘তেওয়ারি’ পদবীর জন্য তাকে কেউ কখনো ‘বহিরাগত’ বলেন নি। আর বলবেন কেন? বাংলার সংস্কৃতি তাঁর মনেপ্রাণে, হৃদয়ে। শুনেছি তাঁর জ্যেষ্ঠ্য ভ্রাতার সন্তানেরা ‘ত্রিবেদী’ পদবি আজও লেখেন। শিকড় সংস্কৃতির সন্ধানে কেউ এসে তাঁকে বল্লাল সেনের আমলে বঙ্গে আমন্ত্রিত উত্তরপ্রদেশীয় বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের উত্তরাধিকারী বললে অতটা খুশি হতেন না। খুশি হতেন বঙ্গভাষা ও সংস্কৃতির সুপ্রাচীন উত্তরাধিকারের ধারক ও বাহক হয়ে থাকতেই।
তাঁর গৃহের নাম ‘দিনান্তে’। “সমস্ত দিনের শেষে সন্ধ্যা নামে, ডানায় রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল”, গৃহস্থ-স্বামীও ক্লান্ত দেহে আপন ঘরে ফেরেন; তেমনই ফিরতেন তিনি রামকৃষ্ণ মিশনের কোয়ার্টারে, কিংবা ১৯৯২ সালে তৈরি হওয়া আপন বসতবাটিতে। দীর্ঘদিন তিনি মিশন-মন্দিরে কাছে পোস্ট অফিসের পিছনে দুই নম্বর কোয়ার্টারটিতে বসবাস করেছেন। তার আগে সেখানেই আর একটু পিছিয়ে বি.টি. কলেজ লাগোয়া ছোটো মাপের একটি কোয়ার্টারে থাকতেন। ১৯৯৭ সাল নাগাদ তিনি কর্মজীবন থেকে অবসর নেন এবং প্রিয়-পরিচিত রহড়াতেই থেকে যান। দীর্ঘ ষাট বছর তিনি রহড়ায় অবস্থান করে এখানকার সমাজ ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে ওঠেন। মৃত্যুর আগে কয়েক দিন তিনি সল্টলেকের কলম্বিয়া-এশিয়া হাসপাতালে কোভিডে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন। বছর চারেক আগেই তাঁর হার্টের সমস্যা দেখা গিয়েছিল। পরীক্ষা করে দেখা যায়, তাঁর কিডনিটিও বিকল হয়ে এসেছে। সে সময় অস্ত্রোপচার না করে মেডিসিনে রাখার কথা বলেছিলেন তাঁর প্রিয় ছাত্রবৃন্দ তথা বর্তমানের চিকিৎসকেরা। তিনি যেহেতু খড়দহের সাধারণ মানুষের সম্পদ ছিলেন, সময়ে-অসময়ে তারাই তাঁর ব্যাপারে যাবতীয় সিদ্ধান্ত নিতেন, এমনটাই জানা গেছে, তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে। হ্যাঁ, ‘দিনান্তে’ তিনি রামকৃষ্ণলোকের ঐশী আশ্রয়ে ফিরে গেলেন — মুখোমুখি বসিবার ঠাকুর-মা-স্বামীজীর ট্রিলজি।
……….
চিত্র ঋণ : সুদীপ্ত তেওয়ারি।

