ধর্ম ও বিজ্ঞান এবং শ্রীচৈতন্যদেব

ড. কল্যাণ চক্রবর্তী
আমাদের ভারত, ১ ফেব্রুয়ারি: জড়জগৎ, ভোগের জগৎ আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেধে রেখেছে, চৈতন্যের জগৎ ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। চৈতন্যবিজ্ঞানের মত মূল্যবান বিষয়ের স্বরূপসন্ধান পাচ্ছি না। এই যে অচৈতন্য অবস্থা, এই অচেনা ভারতবর্ষের সূচনা বৈদেশিক মুসলমান আগ্রাসনের সঙ্গে সঙ্গে। তা ভারতীয় সমাজের কোণে কোণে, প্রত্যন্ত অঞ্চলকে আবিষ্ট করে ফেললো। ভারতবর্ষ হয়ে উঠলো মৃতবৎ। তার প্রাণস্পন্দন নেই।

একজন রোগী যখন সংজ্ঞাহীন মৃতবৎ হয়ে পড়ে, কোমায় চলে যায়, মেডিকাল সায়েন্সে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে তার চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। একইভাবে আধ্যাত্মিক হাসপাতাল তৈরি করলেন শ্রীচৈতন্য। ভারতবাসীর মধ্যে সত্যিকারের চৈতন্য-বিকাশ ঘটালেন মহাপ্রভু। প্রায় পাঁচশো বছরের মত সময়ের অসুস্থতা নিরাময়ের চেষ্টা করলেন তিনি। ১৪৮৬ সালের ২৭ শে ফেব্রুয়ারি নবদ্বীপে আবির্ভূত হলেন সেই ডাক্তার; ১৫১০ সালের ১০ জানুয়ারি তাঁর ডাক্তারি পাশ করা হল; কাটোয়াতে কেশব ভারতীর কাছে সন্ন্যাস মন্ত্রে দীক্ষা নিলেন এ যুগের ব্রজেন্দ্র নন্দন, নাম হল ‘শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য ‘। অর্থাৎ তিনি দেশবাসীর চৈতন্য এনে দেবেন। এনে দিলেন তাঁর পরিব্রাজন পর্বে (১৫১০-১৫১৫) এবং নীলাচল পর্বে(১৫১৫-১৫৩৩); তাঁর শুভঙ্করী প্রভাব অব্যাহত রইলো।

প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের ব্যবধান; আজ থেকে ১৩২ বছর আগে চৈতন্য বিজ্ঞানের আসরে অবতীর্ণ হলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। ১৮৮৬ সালের ১ লা জানুয়ারি কাশীপুর উদ্যানবাটিতে তিনি কল্পতরু হলেন; বললেন, “চৈতন্য হোক”, জীবনের পরম-প্রাপ্তি ঘটুক। মনে পড়বে শাক্ত-সংগীত, “আমার চেতনা চৈতন্য করে দে মা চৈতন্যময়ী।” দৃশ্যজগৎ অতি বিচিত্র, বহুরূপী। ভারতীয় সাধকরা অব্যক্ত জগতের সীমাহীন রহস্যও দৃষ্টিগোচর করেছেন; বিভিন্নতার মধ্যে যে শাশ্বত সাম্য আছে তা বোধগম্য করেছেন। ১৯১৭, বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ভাষণ দিচ্ছেন, “ভারতীয় চিন্তাপ্রণালী একতার সন্ধানে ছুটিয়া জড়, উদ্ভিদ ও জীবের মধ্যে সেতু বাঁধিয়াছে।…বিধাতা যদি বিজ্ঞানের কোনো বিশেষ তীর্থ ভারতীয় সাধকের জন্য নির্দেশ করিয়া থাকেন, তবে এই চতুর্বেণী (পদার্থবিদ্যা উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণীবিদ্যা ও মনস্তত্ত্ববিদ্যা) সংগমেই সেই মহাতীর্থ।” বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে এক অখণ্ড চৈতন্যের পুনরাবিষ্কার করলেন জগদীশচন্দ্র। জগদীশচন্দ্র (১৮৯৪) বলছেন, “এ জগতে অসংখ্য ঘটনাবলীর মূলে তিনটি কারণ বিদ্যমান। প্রথম পদার্থ, দ্বিতীয় শক্তি, তৃতীয় ব্যোম অথবা আকাশ।” ভর-শক্তি-মহাশূণ্যতা। পৃথিবীর সবচাইতে জনপ্রিয় যে সমীকরণ — স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটির বিখ্যাত পেপারে আইনস্টাইন দেখালেন — E=mc2 ভর ও শক্তির সাম্যতা; ভর ও শক্তির নিত্যতা সূত্র; শক্তির পরিমাণ = বস্তুর ভর Xআলোর বেগের বর্গ। শক্তি এবং ভর সমতুল্য এবং পারস্পরিক পরিবর্তনযোগ্য। আপেক্ষিকতা বাদের জনক তিনি, আলবার্ট আইনস্টাইন।

হিন্দুশাস্ত্রে আমরা জেনেছি, আত্মা অবিনশ্বর, তার সৃষ্টি নেই, ধ্বংস নেই; তাকে তরবারিতে খণ্ডন করা যায় না, আগুন তাকে পোড়াতে পারে না, জল তাকে ভেজাতে পারে না, বাতাস তাকে শুষ্ক করতে পারে না। “নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ। ন চৈনং ক্লেদয়ন্ত্যাপো ন শোষয়তি মারুতঃ।” জীবাত্মা পরমাত্মারই অংশ। পরমাত্মার জীবাত্মায় রূপান্তর ঘটে। পরমাত্মা থেকে জীবাত্মা সৃষ্টি হয়, জীবাত্মা পুনরায় পরমাত্মায় বিলীন হয়। পরমাত্মা ও জীবাত্মার অনুপাত ধ্রুব বা Constant. এই পরমাত্মাকে যে যেভাবে খুশি মানতে পারেন; “যত মত তত পথ।”

স্বামীজির মত বলতে পারেন ‘বড় আমি’, রবীন্দ্রনাথের মত বলতে পারেন ‘পাকা আমি’, গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মমত অনুযায়ী তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। শুদ্ধ আস্বাদন ভগবানই অনন্ত শক্তির অতিপ্রকাশ। নির্বিশেষবাদীদের কাছে পরমব্রহ্ম। গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম অনুসারে পরমাত্মার প্রতীক শ্রীকৃষ্ণ এবং জীবাত্মার প্রতীক শ্রীরাধিকা। যত লীলা-কীর্তন গ্রন্থ আছে সেখানে রাধাপ্রেমকে বড় দেখানো হয়েছে, রাধার প্রেম বর্ণিত হয়েছে। কৃষ্ণের প্রেম কমই বর্ণিত হয়েছে। কৃষ্ণ হলেন প্রেম দেবার সত্ত্বা, দাতা; রাধা হলেন প্রেম নেবার সত্ত্বা, গ্রহীতা। আইনস্টাইনের সূত্রানুযায়ী E-কে যদি m-এর সমান হতে হয় তবে একটা c2 থাকতে হবে। এই c2-টিই হল ইমোশন — কোথাও ভগবৎ-প্রেম, কোথাও ভগবৎ-সেবা, কোথাও কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ ইত্যাদি। জীবাত্মা বা ভর (mass)-এর প্রতীক শ্রীরাধিকায় কৃষ্ণপ্রেমের মত ইমোশন যুক্ত হলেই তিনি পরমাত্মা বা শ্রীকৃষ্ণে মিলিত হতে পারেন, হয়ে উঠতে পারেন Energy, শ্রীকৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি।

ভগবান এ বিশ্বের নিয়ন্ত্রক, কোনো ইমোশন নেই। জগদীশচন্দ্র লিখছেন, “প্রকৃতিও কি ক্রূর নয়?. …যাঁহার ইচ্ছায় অনন্ত বারিধি বাত্যাতাড়নে ক্ষুব্ধ হয়, কেবল তাঁহার আজ্ঞাতেই জলধি শান্তিময়ী মূর্তি ধারণ করে।” যখন শ্রীচৈতন্যদেব প্রকট হলেন — অন্তরে রাধা, বহিরঙ্গে কৃষ্ণ; তিনিও ভর-শক্তিতত্ত্ব, জীবাত্মা-পরমাত্মার তত্ত্ব নিজের জীবনেই অনুশীলন করলেন — এ এক অনুপম চৈতন্য বিজ্ঞানের কথা। নিম্নবর্ণের হিন্দুরা যখন দলে দলে মুসলমান ধর্ম গ্রহণে তৎপর হয়েছে, তখন বর্ণহীন এক সমাজ তৈরির জন্য এক ধর্মীয়-সাম্যের বাণী বিতরণ করে, আচণ্ডালে হরিভক্তি প্রচার করে দক্ষ সমাজবিজ্ঞানী ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন।

বৃহদারণ্যক উপনিষদের মন্ত্র “ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে। পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে।।” সর্বপ্রকারে পূর্ণ পরব্রহ্ম। এই জগতও পরম পূর্ণ; কারণ সেই পূর্ণ পরব্রহ্ম থেকে তার উৎপত্তি। পূর্ণ থেকে যদি পূর্ণ আদায় হয়, তুলে নেওয়া হয়, তবে পূর্ণই অবশিষ্ট থাকবে। জীববিজ্ঞানে ‘মাইটোসিস’ কোষ বিভাজন বলে একটা কথা আছে। মাতৃকোষ বিভাজিত হয়ে হুবহু তারই মত অপত্য কোষের জন্ম হয়। তাই তাকে বলে সমীকরণিক বিভাজন; “যেমন মা তার তেমন ছা।” নিউক্লিয়াস ও ক্রোমোজোম উভয়েই একবার করে বিভক্ত হয়। ক্রোমোজোম সংখ্যা একই থাকে। এও একরকম ‘পূর্ণ’ নির্মিতির প্যানোরামা। এ যেন চৈতন্যের সাগরের মতই হিমসাগর আমের কলমের চারা তৈরি।

আমাদের তিন রকমের শরীর থাকে — ‘স্থূল শরীর’ এই মানব দেহ; ‘সূক্ষ্ম শরীর’ অর্থাৎ পরব্রহ্মর পূর্ণ সত্ত্বা এবং ‘কারণ-শরীর’ বা পৌনঃপুনিক কর্মফল। অনেকটা Cell Division -এর ক্রোমোজোম, সাইটোপ্লাজম এবং নিউক্লিয়াসের মতো। জীব বিজ্ঞানে আরও দুটি কথা পাচ্ছি — Totipotency এবং Dedifferentiation। জীববিজ্ঞানী Haberlandt ১৯০২ সালে Totipotency -র সংজ্ঞা দিলেন, The ability of a plant cell to develop into a complete plant. অর্থাৎ সমস্ত উদ্ভিদ কোষ থেকে সমগ্র উদ্ভিদটি পুনর্নির্মাণ করার ক্ষমতা রাখে। ‘পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে।’

বলবো Dedifferentiation-র কথা — reversion of specialized cells to a more generalized or primitive condition. পৃথক কর্মে ব্রতী হলেও কোষ তার প্রাথমিক বৈশিষ্ট্যময় হয়ে কোষবিভাজনে সক্রিয় হতে সমর্থ। তাই তো দস্যু রত্নাকর ‘রাম’ বলতে অসামর্থ্য হলে ত্রাতা সাধু তাঁকে ‘মরা’ মন্ত্র জপ করতে বললেন এবং তা আপন সূক্ষ্ম দেহীর সৌকর্যে রূপান্তরিত হল রামনামে। Dedifferentiated হলেন দস্যু রত্নাকর থেকে মহর্ষি বাল্মীকি। তাঁর রামায়ণ বহুধা প্রাণে ছড়িয়ে সচ্চিদানন্দকে প্রতিষ্ঠিত করলো। রামনামে প্লাবিত হল দেশ।

কলিযুগে নাম-মাহাত্ম্যই পরম বৈভবের। আজ যারা সনাতনী ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়ে ‘রাম’ নামের ভূত দেখছেন তারাও এই নাম সংকীর্তনের মাধুর্যে দুরাত্মা থেকে পুণ্যাত্মায় dedifferentiated হোক — এই প্রার্থনা জানাই। আমরা যেন বুঝতে সমর্থ হই, “সর্বভূতানি কৌন্তেয় প্রকৃতিং যান্তি মামিকং। কল্পক্ষয়ে পুনস্তানি কল্পাদৌ বিসৃজাম্যহম।।” গীতাতে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন, সমস্ত সৃষ্টি আমারই, ধ্বংসও আমাতে হবে। আমরা যেন বুঝতে সমর্থ হই তিনিই সব হয়েছেন, সৃষ্টি-প্রলয়ের এ এক অভূতপূর্ব দ্বন্দ্বসমাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *