“প্রীতিলতা একটা আন্দোলন”, চট্টগ্রামের অগ্নিঝড়া স্মৃতিচর্চায় পরিচালকের আকুতি

অশোক সেনগুপ্ত, আমাদের ভারত, ১৭ অক্টোবর: “রাজনৈতিক মতাদর্শকে ঊর্দ্ধে রেখে বীরকন্যা প্রীতিলতাকে ও তাঁর সংগ্রামের আলেখ্যকে সামনে নিয়ে আসতে হবে। এটা নিছক সিনেমা নয়, এটা একটা আন্দোলন।” সোমবার দক্ষিণ কলকাতায় বিপ্লবতীর্থ চট্টগ্রাম স্মৃতি পরিষদে এক অন্য রকম সমাবেশে এই মন্তব্য করেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ওপর সদ্যনির্মিত ছবির পরিচালক প্রদীপ ঘোষ।

‘বীরকন্যা প্রীতিলতা’ নামে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশে। ঘটনা ১৯৩২ সালের। তখন ভারতীয় মানচিত্রে আজকের বাংলাদেশও ছিলো। শাসন করছিলো বৃটিশরাজ। একটি মেয়ে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে নেমেছিলো সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে দেশকে মুক্ত করতে। বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনের গঠিত ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির সদস্য হয়েছিলো সেই প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। কলকাতার বেথুন কলেজে পড়তে এসেছিলে প্রীতিলতা। ভর্তি হয়েছিলো দর্শন শাস্ত্রে। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে প্রীতিলতা হামলা করেছিলেন চট্টগ্রামের ব্রিটিশ প্রমোদকেন্দ্র ইউরোপিয়ান ক্লাবে। যে ক্লাবে লেখা থাকতো কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ। প্রীতিলতা সশস্ত্র হামলা শেষে ফেরার পথে গুলিবিদ্ধ হন। ধরা পড়ার আগে সঙ্গে রাখা পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে মাত্র ২১ বছর বয়সে আত্মাহুতি দেন। তাঁর কীর্তির ওপর ছবি করেছেন প্রদীপ ঘোষ।

এর আগে বিভিন্ন ধরণের ছবি করেছেন তিনি। এর একটি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে। ছবি শুরুর পর থেকে কখনও অতিমারি, কখনও অর্থাভাব, কখনও বা অন্য কোনও সমস্যা কীভাবে তাঁকে তাড়িত করেছে, সমাবেশে তা ব্যখ্যা করেন প্রদীপ। তিনি বলেন, “শিশু প্রীতিলতাকে খুঁজে পেতে সমস্যা হয়নি। কিন্তু বাস্তবের খুব কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে প্রাপ্তবয়স্ক প্রীতিলতা খুঁজে পেতে বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে আমাকে।”

প্রদীপ বলেন, ‘বীরকন্যা প্রীতিলতা’ এমন একটা ফিকশন যেটাকে মানুষের মনে গেঁথে দিতে গেলে বাস্তবের চাদরে মুড়ে ফেলতে হবে। ছবিতে ৬ মিনিটের একটি দৃশ্যের জন্য ১৮ ঘন্টা শুটিং করতে হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সহযোগিতা পেয়েছি। অর্থাভাব কাটাতে পারলে আর মাসখানেকের মধ্যে ছবিটার কাজ শেষ হয়ে যাবে। পৌনে দুঘন্টার এই ছবির বিষয় শেষ হয়েছে ১৯৩০ সালে। কিন্তু ১৯৩২ থেকে ১৯৩৪— এই উত্তাল সময়কাল এবং সূর্য সেনের কীর্তিকে ধরে রাখতে গেলে আর একটা ছবি করতে হবে। যদি পরিস্থিতি সহায়ক হয়, সেটা অবশ্যই করব।”

বিপ্লবতীর্থ চট্টগ্রাম স্মৃতি পরিষদের সভানেত্রী লীলা পুরকায়স্থ বলেন, “ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা অনেক ক্ষেত্রেই উপযুক্ত স্বীকৃতি পান না। ওঁদের কথা আমরা যদি সম্মিলিতভাবে পরবর্তী প্রজন্মের মনে সংরক্ষণ করতে পারি, তবেই আমাদের স্বপ্ন সার্থক হবে। ‘বীরকন্যা প্রীতিলতা’-র সাফল্য দু’দেশের সমমনস্ক মানুষকে পরস্পরের আরও কাছে আনবে।”

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ (যুদ্ধ) ট্রাইব্যুনালের সভাপতি তথা বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান পরিষদের সাধারণ সম্পাদক, আইনজীবী রাণা দাশগুপ্ত বলেন, “প্রীতিলতা ছিলেন আমার বাবার পিসিমা। আমার বয়স ৭৩। আমার পর আর ওই বংশের প্রত্যক্ষ কেউ থাকবে না।” কয়েক দশক ধরে কীভাবে পূর্ব বাংলা, পরবর্তীকালে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আদর্শ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন, সংগ্রামীদের দখল হয়ে যেতে বসা ভূ-সম্পত্তি রক্ষার চেষ্টা করছেন, তার আনুপূর্বিক বর্ননা দেন রাণাবাবু।

৯ দশক আগে চট্টগ্রামের উথাল পাথাল করা একগুচ্ছ ঘটনার কুশীলবদের পাঁচ পুত্র, ২ জনের পরিবারের সদস্য, উদ্যোক্তা সংস্থার পরিচালনমন্ডলির সদস্যরা ছিলেন এদিনের সান্ধ্য সমাবেশে। প্রীতিলতার সঙ্গে চট্টগ্রামের সাত দামাল ছেলেকে অভিযানের জন্য বেছে দিয়েছিলেন মাষ্টারদা। অভিযান থেকে সাত জনই পালিয়ে যেতে পেরেছিলেন। যদিও পরবর্তীকালে ধরা পড়েন। তাঁদের একজন কালীকিঙ্কর দে। অপরজন সুশীল দে। দু’জনকেই বিভিন্ন জেলে কারাবাস করতে হয়। দুজনে প্রয়াত হন যথাক্রমে ১৯৮৯ এবং ২০০০ সালে।
দুজনের পুত্র যথাক্রমে কিশোর দে এবং কাজল দে থাকবেন এদিনের সমাবেশে।

মাষ্টারদার ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসাবে সক্রিয় ছিলেন ভোলানাথ দত্ত। তিন বার কারাবরণ করেন তিনি। এ রকমই আর এক দামাল বিপ্লবী ব্রজেন সেন। তিনি মাষ্টারদার সঙ্গেই গ্রেফতার হন। এঁদের দুজনের দুই পুত্র তপনবিকাশ দত্ত এবং বিপ্লব সেন ছিলেন সোমবারের সমাবেশে। ছিলেন সংস্থার যুগ্ম সম্পাদক অজয় সেন। উল্লেখ্য, অজয়বাবুর বাবা বিধুভূষণ সেন প্রত্যক্ষ অংশ নিয়েছিলেন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল, জালালবাদ পাহাড়ের যুদ্ধ প্রভৃতিতে। পরবর্তীকালে তাঁকেও বিভিন্ন জেলে কারাবাস করতে হয়।

প্রসঙ্গত, নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে সিনেমাটি মুক্তি পেতে পারে। ইতিমধ্যে সিনেমাটির টিজার প্রকাশ হয়েছে। পরিচালক প্রদীপ বলেন, ‘‘আত্মত্যাগের ৯০ বছর পর এই বীরকন্যাকে নিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য কোনো চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে বাংলাদেশে। বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশে।“ বাংলাদেশের খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের লেখা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জীবনীনির্ভর উপন্যাস ভালোবাসা প্রীতিলতা অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘বীরকন্যা প্রীতিলতা’।এতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা। বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাস চরিত্রে আছেন মনোজ প্রামাণিক। মাস্টারদা সূর্য সেন চরিত্রে কামরুজ্জামান তাপু। ২০১৯-২০-র বাংলাদেশ সরকারের অনুদানে চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা ও পরিচালনা করেছেন প্রদীপ ঘোষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *