আমাদের ভারত, আলিপুরদুয়ার, ২৮ সেপ্টেম্বর: এক সপ্তাহ আগেই গ্রামে ঢুকেছিল হাতি। তবে, মৌমাছির ভয়ে গ্রাম ত্যাগ করে হাতিটি। তথ্য বলছে, মৌমাছির কারণে গত একবছরে হাতির হামলায় গ্রামে একটি বাড়িও ভেঙ্গে গুড়িয়ে যায়নি। একজন মানুষেরও মৃত্যু হয়নি। রীতিমতো কামাল করেছে সেরেনা ইন্ডিকা, সেরানা মেলিফার প্রজাতির মৌমাছি।
শুধু হাতির হানা থেকে রক্ষা পাওয়াই নয়, মৌমাছির এই দুই প্রজাতির কল্যাণে এখন আলিপুরদুয়ার জেলার শামুকতলা থানার অন্তর্ভুক্ত নুরপুরে আর্থসামাজিক ভাবে সফল হবার পথে ৭৫ টি পরিবার। একদিকে হাতির হামলা থেকে যেমন প্রায় পুরোটাই নিশ্চিন্ত গ্রাম, তেমনি মধু চাষ করেও হচ্ছে অর্থ উপার্জন। পাশাপাশি হাতির হামলা না থাকায়, মৌমাছি প্রতিপালনের ফলে গ্রামে ধানের উৎপাদন ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বেড়েছে সরষের চাষ। লেবু, আম, লিচু চাষেও এগিয়ে এসেছে মানুষ। স্বাভাবিকভাবেই বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের লাগোয়া নুরপুরের নয়নের মণি হয়ে উঠেছে মৌমাছিরা।

আপাতত গ্রামের ৫ টি জায়গায় পাতা রয়েছে মৌমাছি পালনের বাক্স। জানা গেছে, গ্রামে কমপক্ষে ১০০ বিঘে জমিতে সর্ষের চাষ ইতিমধ্যেই মৌমাছিদের মধু সংগ্রহকে সুনিশ্চিত করেছে। আলিপুরদুয়ার জেলা প্রশাসন, উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজ্য কৃষি দপ্তরের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে কাজ এগোচ্ছে। সহযোগিতা করছে স্থানীয় সাঁওতালপুর নাগরিক অধিকার সুরক্ষা ওয়েকফেয়ার সোসাইটি। জানা গেছে, আগে রাত নামতেই হাতির হামলার ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতেন বাসিন্দারা। চোখের সামনে ফসলের ক্ষতি, বাড়ি-ঘর ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেবার পাশাপাশি মানুষের প্রাণ যেতে দেখেছেন গ্রামের মানুষ। চাষে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছিল কৃষক। সবকিছু উজার হতে দেখাই হয়ে উঠেছিল তাঁদের রেজনামচা। সাঁওতালপুর নাগরিক অধিকার সুরক্ষা ওয়েলফেয়ার সোসাইটির সম্পাদক সদানন্দ চক্রবর্তীর বলেন, “মৌমাছিদের কল্যাণে এক একটি বাক্স থেকে মাসে ২০ কিলো মধু সংগ্রহ করতে পারছেন বাসিন্দারা। এছাড়া ফল থেকে শুরু করে বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন অনেকটাই বেড়ে গেছে। কোভিড পরিস্থিতিতেও ঘুরে দাঁড়িয়েছে গ্রামটি।”
উত্তরবঙ্গের অতিরিক্ত মুখ্য বনপাল উজ্জ্বল ঘোষ জানিয়েছেন, “হাতিরা মৌমাছিদের কামড় ও গুঞ্জন এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে তা গবেষণায় প্রমাণিত। অন্যান্য বন্যপ্রাণিদেরও প্রবল বিরক্তির কারন মৌমাছির দল। গত এক বছরে যেহেতু হাতিরা ওই গ্রামের পথে আর আসছে না, তাতে মনে হচ্ছে টোটকা ভালই কাজ করেছে। তবে নিশ্চিন্ত হওয়ার জন্য আরও বছর খানেক পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।”

পুণ্ডিবাড়ি থেকে উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক শ্যামল কুমার সাহু জানিয়েছেন, “নুরপুরের প্রকল্পের কাজ আমরা ২০২০ সাল থেকে শুরু করেছি। আফ্রিকার বেশ কিছু দেশে এটা পরীক্ষিত সত্য।সেখানে গ্রামে মানুষ–হাতি সংঘর্ষ অনেকটাই কমেছে।সর্বভারতীয় স্তরে জৈব উপায়ে রোগপ্রতিরোধ করে চাষবাসের নির্দিষ্ট প্রকল্প চলছে। আদিবাসী উন্নয়ন দপ্তরের আর্থিক সহযোগিতায় নুরপুরে কাজ শুরু হয়। জৈব চাষে কৃষকদের সচেতন করার কাজ চলছে। সর্ষের চাষ ইতিমধ্যেই বৃদ্ধি পেয়েছে। মৌমাছি প্রতিপালন বৃদ্ধি করতে লেবু, আম, লিচু চারা বিলি করা হয়েছে। আদিবাসী কৃষকদের সার্বিক ভাবে আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন হবে বলে আশাবাদী আমরা।”

