খড়দহের গীতি-গৌরব, সঙ্গীত শিক্ষক শান্তিময় মুখোপাধ্যায় প্রয়াত

ড. কল্যাণ চক্রবর্তী
আমাদের ভারত, ২৬ নভেম্বর: শ্রী শান্তিময় মুখোপাধ্যায় (২১ শে মার্চ ১৯৪৭ — ২৫ শে নভেম্বর, ২০২২) খড়দার সুরনদীতে এক দীপ্তিসম্পন্ন নাম। বিগত শতকে খড়দার ইতিহাসে যে সঙ্গীত-শিল্পীরা স্থায়ী আসনে অধিষ্ঠান করে রয়েছেন, তাঁরা হলেন বিশিষ্ট নজরুল-গীতিকার সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায় (যিনি স্বামী পুণ্যানন্দজী মহারাজের আমন্ত্রণে সপরিবারে মিশন-আবাসনে বসবাস করেছেন এবং বালকাশ্রমে ছাত্রদের গান শিখিয়েছেন), প্রবাদপ্রতিম শিল্পী প্রসাদ মুখোপাধ্যায়। আর যে নামগুলি একই সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে, তাদেরই অন্যতম ছিলেন শ্রী শান্তিময় মুখোপাধ্যায়, পরিচিত মহলে ‘বাবলু দা’। তিনি শুক্রবার সকাল সাড়ে এগারোটায় সাগর দত্ত হাসপাতালে পরলোকগমন করেছেন। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে খড়দার গানের জগতে একটি যুগের অবসান ঘটল।কেবলমাত্র খড়দহ নয়, তিনি বাংলার সুরধুনীতেও এক পরিচিত মুখ। তাঁর অসংখ্য ছাত্র আজ বাংলার নানান জায়গায় সুরবে প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বৎসর।

নৈহাটি হরপ্রসাদ শাস্ত্রী গবেষণা কেন্দ্রে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র কলেজের অধ্যাপক ড. সত্যজিৎ চৌধুরী তখন এক গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করছিলেন। বিষয়: প্রথম বাংলা গানের সাঙ্গীতিক রূপ। তাতে যোগ্য সঙ্গত করেছিলেন শান্তিময় মুখোপাধ্যায়। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদের পাণ্ডুলিপি শাস্ত্রী মহোদয়ের প্রচেষ্টায় নেপাল থেকে ভারতবর্ষে আসে, আমরা জানি। এখন পদগুলির সাঙ্গীতিক রূপ কী হতে পারে এই নিয়ে সমরেশ বসু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ বিদগ্ধজনের উপস্থিতিতে গেয়ে শোনাতেন শান্তিময়বাবু। এভাবেই তিনি প্রবুদ্ধজনের সম্মান আদায় করে নিলেন। ৩৫ টি পদে সুর জুড়েছিলেন তিনি, কিন্তু অকস্মাৎ সত্যজিৎবাবুর প্রয়াণে সেই গবেষণা থেমে গেল। কিন্তু গানের বইপত্র, বিদ্বজ্জনের সঙ্গে অধ্যয়নের নেশা তাঁর কাটলো না। এশিয়াটিক সোসাইটি সহ কলকাতা ও শহরতলীর বহু সারস্বত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তৈরি হয়ে গেল সম্পর্ক। সুকুমার সেন, রাজশেখর বসু, দেবেশ রায় প্রমুখ ব্যক্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে মিশলেন তিনি।

চলচ্চিত্রকার গৌতম ঘোষ, সাহিত্যিক তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, চিকিৎসক আবিরলাল মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা জন্মালো। ১৯৮৪ সালে কলকাতা দূরদর্শনে এক আলোচনা সভায় চর্যাপদের সাঙ্গীতিক রূপ পরিবেশন করলে বিদ্বজ্জনেরা তাঁর সম্পর্কে আরও আগ্রহ দেখাতে শুরু করলেন। তার আগে আকাশবাণীতে ছোটোদের বহু অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

শান্তিময়বাবুকে বাল্যকালে এক কঠিন জীবন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে এগোতে হয়েছে। তিনি ছিলেন রহড়া মিশনে অনাথাশ্রমের ছাত্র। আশ্রম থেকে বেরিয়ে সংসারের জন্য রোজগার করবেন, নাকি গানের চর্চায় আরও গভীরভাবে মনোনিবেশ করবেন, তা নিয়ে ছিলেন দোলাচলে। শেষ পর্যন্ত গানের জন্য কিছুটা সময় বরাদ্দ রেখে চাকুরিতেই বহাল হলেন তিনি। রহড়া মিশনে সেভেনে পড়াকালীন সর্ব ভারতীয় ধ্রুপদ সঙ্গীতের প্রতিযোগিতায় বালক বিভাগে প্রথম স্থান লাভ করেছিলেন। বিচারক দবির খাঁনের (১৯০৫-১৯৭২) তাই পছন্দ হয়েছিল বালককে, তিনি নিজেই সঙ্গীত শেখাতে চাইলেন। সে সময় কাজি নজরুল ইসলামের ছাত্র এবং ঘনিষ্ঠ সঙ্গী তথা বিশিষ্ট শিল্পী সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায় রহড়া মিশনের কোয়ার্টারে থাকতেন। তিনি জিপিও তে কর্মরত ছিলেন। ছুটিরদিন ও অবসর সময়ে ছাত্রদের গান শেখাতেন। বাবলুদার সুযোগ হয়েছিলো তাঁর কাছেও গানের তালিম নেওয়ার। তাঁকে যত্ন করে গান শিখিয়েছেন খড়দার সুর-সম্রাট প্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও। তিনিই এবার কলকাতায় দবির খাঁন -এরও প্রিয় ছাত্র হয়ে উঠলেন।

শান্তিময়বাবু প্রায় চার হাজার ছাত্র-ছাত্রীকে সঙ্গীত শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর গানের স্কুলের নাম ‘কলা মন্দির’, এটি পঁয়ত্রিশ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে এসে সঙ্গীত পরিবেশন করে গেছেন প্রসিদ্ধ সঙ্গীত ব্যক্তিত্বেরা। তবে গত পনেরো বছর তিনি বাইরের সাইনবোর্ড তুলে দিয়ে কেবল অন্তরের কলা মন্দিরটিকে বহাল রেখেছিলেন।

মাত্র দেড় বছর বয়সে বাবা নৃপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়কে হারিয়ে ‘অনাথ’ হয়েছিলেন শান্তিময় বাবু; একমাত্র সন্তানকে নিয়ে মা অনুপমা দেবী চলে এলেন রহড়ায় বাপের বাড়ি। সেই থেকে স্নেহের সঙ্গে দাদু-দিদিমার কাছেই মানুষ হচ্ছিলেন। দাদু আশুতোষ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন রেলকর্মী, স্বামী পুণ্যানন্দজী মহারাজের বিশেষ ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি। রহড়া ডাকঘরের সূচনা এই আশুতোষবাবুর হাত ধরেই হয়েছিল। তখন ভবনাথ বিদ্যালয়ের একটি কোণে ছিল এই ডাকঘর। রিটায়ারমেন্টের পর ডাকঘরে পোস্টমাস্টারের দায়িত্ব পেয়েছিলেন আশুতোষ বাবু, সঙ্গী ছিলেন পিয়ন সুবোধ বাবু। শান্তিময়ের পিসেমশাই ছিলেন রবীন্দ্রোত্তর কবি করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭৭-১৯৫৫)।

শান্তিময়ের জন্ম খড়দার কুলীনপাড়ায় ১৯৪৭ সালের ২১ শে মার্চ। রহড়া বালকাশ্রমের নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন ১৯৫৪ সালে। এর আগে দাদু ডাকঘরে এলে, নাতিকেও সঙ্গে এনে দুপুরে মেয়েদের স্কুলে লাস্ট বেঞ্চে বসিয়ে দিয়ে আসতেন। এইভাবে দিদিদের সঙ্গে স্কুল করার অভিজ্ঞতা হল। আরও পরে পুণ্যানন্দজীর অনুমতিক্রমে ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস টেন পর্যন্ত বালকাশ্রমের অনাথ ছাত্রদের সঙ্গে প্রতিপালিত হলেন। ছোট্ট শান্তিময়ের মধুর কণ্ঠে ভক্তিগীতি, ভজন, ঠুংরি স্বামীজিকে মুগ্ধ করেছিল। তাই ভালো করে সঙ্গীত শিক্ষা দিলেন স্বামীজি। কিন্তু লেখাপড়া শেষ হল না। ক্লাস টেনে পড়তেই মামারা বললেন, চাকরি নিতে হবে, আর পড়াশোনা চালানো সম্ভব নয়, দাদু-দিদিমারাও তখন গত হয়েছেন। কী আর করা যাবে! দমদমের এক সহৃদয় ব্যক্তির সহয়তায় জেসপ কোম্পানিতে বালক অবস্থাতেই চাকরি পেলেন, বয়স তখন ১৬ অথবা ১৭; ১৮ বছর দেখিয়ে তবে চাকরি নিতে হল।

দেড় বছরের মাথায় জেসপ কোম্পানি বন্ধ হল। চাকরি নেই। তার বন্ধু থাকতেন মসলন্দপুরে, ইলেকট্রিক সাপ্লাই অফিসে চাকরি করতেন। বললেন, এসো আমরা দু’জনে প্রাইভেটে পড়াশোনা করে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিই। গেলেন তিনি সেখানে। পড়াশোনা হল; গ্রামের পরিবেশে মনের হারিয়ে যাওয়া হল; শান্তিময় পরীক্ষায় পাশ করে গেলেন, কিন্তু বন্ধু অকৃতকার্য হলেন। শান্তিময় তখন গানের টিউশনি শুরু করলেন। এই সময় শক্তি ঠাকুর (১৯৪৭-২০২০)-কে গান শিখিয়েছিলেন তিনি। এরপর আবার চাকরি নিতে হল অন্নপূর্ণা কটন মিলে। মিল কখনও খোলা থাকে, কখনও বন্ধ; অনিশ্চিত জীবন, জীবনে উঠতি-পড়তির দোলা, গানও চললো, এভাবেই চাকরিও চললো। আর চললো গানের টিউশনি করে সংসার প্রতিপালন। ধীরে ধীরে মনে হল, ভক্তিগীতি গাইতেই তাঁর বেশি ভালো লাগছে। ভালো লাগছে নজরুল গীতি, শ্যামাসঙ্গীত, রামকৃষ্ণ মঠ-মিশনের গান। কিছু ক্যাসেটও তৈরি হল তাঁর।

ছোটোবেলায় আশ্রমে থাকতে গানের ইতিহাস সম্পর্কে গভীর ধ্যান-ধারণা তৈরি হয় নি। গানের ব্যাপারে ইচ্ছে-অনিচ্ছে তেমন কিছু ছিল না। অনেকটা ‘এমনি এমনি হরলিক্স’ খাওয়ার মতোই গান গাওয়া দিয়ে শুরু। তবে মামা-বাড়িতে ন’মামা গাইতেন। তিনি শুনেছেন, তাঁর বাবাও নাকি গাইতে পারতেন। তাঁর স্ত্রী শ্রীমতী তপতী মুখোপাধ্যায় বিখ্যাত শিল্পী অন্নপূর্ণা দেবী (১৯২৭-২০১৮)-র কাছ থেকে কিছুটা সেতার শিখেছিলেন। তপতীর বাবাও একজন ভালো সেতারবাদক ছিলেন, তিনি বাহাদুর খানের কাছ থেকে সেতারের তালিম পেয়েছিলেন। শান্তিময়ের পুত্র শুভজিৎ অবশ্য পিতার কাছ থেকে কোনোদিনই সঙ্গীত শেখায় আগ্রহ দেখান নি; তিনি কম্পিউটার সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞ। বৌমা ICDS অঙ্গনওয়ারি কর্মী। তবে পৌত্র বাঁশিবাদক, ক্লাস এইটের ছাত্র। শান্তিময় বাবু বলেন, সঙ্গীতে কোনো জুলুম চলে না, স্বেচ্ছায় নাড়া না বাঁধলে সঙ্গীত শিক্ষা হবে, সাধ্য কী! দীর্ঘদেহী, সৌম্য-সুপুরুষ এই বৃদ্ধ সঙ্গীত শিল্পী এই সেদিনও খড়দা-রহড়ার মধ্যে একজন অনন্য স্টাইলের শিল্পী ছিলেন, তবে ফ্যাশান দুরস্ত ছিলেন না। নিজের স্টাইলে তিনি ছিলেন সুভাস, সুমন, সুমনোহর। খড়দার সঙ্গীত জগৎ তাঁর অভাব বোধ করবেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *