অশোক সেনগুপ্ত, আমাদের ভারত, ২০ আগস্ট:
“সৈয়দ মোহাম্মদ আইয়ুব চাকরি লইল কাবুলে। বাঙালি চাকরি করিতে যায় পশ্চিমে, জোর বর্মায়। কাবুলে যখন তাই চাকরি মিলিল, তখন দেশের পাঁচজন তাহার বুদ্ধি সম্বন্ধে নিজেদের সন্দেহ নানা বর্ণে-গন্ধে প্রকাশ করিলেন। আইয়ুব দমিল না। যে ব্যক্তির গৃহে পত্নী কিংবা মাতা নাই, তাহার পক্ষে গৃহই–বা কি, অরণ্যই–বা কি। চাকরি যদি করিতে হয় তো কাবুলেই–বা কি, কোয়াম্বাটোরেই–বা কি।“
‘সৈয়দ আইয়ুবের কাবুল যাত্রা’ গল্পটির শুরু এভাবেই। এককথায় অসাধারণ। টানটান ভাললাগার পরশে এগিয়ে গিয়েছে গল্পের গতি। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, “সৈয়দ মুজতবা আলীর এই লেখা বেরোয় সিলেটের কিছু তরুণ সাহিত্যানুরাগীর ‘উদ্যোগ কিশোর’ নামে হাতে লেখা এক ম্যাগাজিনে, ১৩৪৯ বঙ্গাব্দের (১৯৪২ সাল) গ্রীষ্ম সংখ্যায়। একসময় বিভিন্ন বাড়িতে হাতে লেখা ম্যাগাজিনের কদর ছিল, বিশেষ করে যেসব পরিবারে স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের আধিক্য ছিল। ম্যাগাজিনটি সম্পাদনা করেছিলেন আমার বাবা সৈয়দ আমীরুল ইসলাম এবং তাঁর সহযোগী ছিলেন আমার দুই মামা, মুজতবা আলীর দুই বোনের দুই ছেলে।“
কাবুল আজ তালিবানের কব্জায়। দেশ ছেড়ে পালানোর জন্য বিমানবন্দরে হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে। আটকে রয়েছেন অনেক ভারতীয় নাগরিকও। গোটা দেশের মতো বাংলার মানুষের নজর আজ কাবুলের দিকে। কাবুলের ওপর নানা সময়ে লেখালেখি হয়েছে। অবশ্যই, এদিক থেকে সৈয়দ মুজতবা আলীর নাম প্রায় সবার জানা। আর কাবুল শুনলেই বাঙালির মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাবুলিওয়ালার কথা।
কাবুলের সঙ্গে বাঙালির পরিচয় তো আজকের নয়। বাঙালির সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রে বারবার উঠে এসেছে কাবুল। ‘কাবুলিওয়ালা’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ছোটগল্প। এটি ১৮৯২ সালে প্রকাশিত হয়। গল্পে আফগানিস্তান থেকে আসা এক কাবুলিওয়ালার সাথে বাঙালি এক লেখকের ছোটো মেয়ে মিনির পরিচয় হয়। সে তাকে আফগানিস্তানে ফেলে আসা নিজের মেয়ের মত ভালোবাসে।
রবীন্দ্রনাথের লেখনিতে রহমত শেখের সঙ্গে ছোট্ট মিনির সম্পর্কের বাঁধন উঠে এসেছে ছবিতেও। তিন বার চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছে ‘কাবুলিওয়ালা’। প্রথমবার ১৯৫৭-এ। তপন সিংহ পরিচালিত ১৯৫৭ সালের এই ছবিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন ছবি বিশ্বাস, ঐন্দ্রিলা ঠাকুর, রাধামোহন ভট্টাচার্য। বিমল রায় পরিচালিত ১৯৬১ সালের হিন্দি চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন বলরাজ সাহানি, উষা কিরণ, সজ্জন, সোনু ও বেবি ফরিদা। কাজী হায়াৎ পরিচালিত ২০০৬ সালের বাংলাদেশী বাংলা ভাষার চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন মান্না, প্রার্থনা ফারদিন দিঘী, সুব্রত বড়ুয়া ও দোয়েল।

কাবুলের সঙ্গে বাংলার সংস্কৃতি যোগ কতটা গভীর ছিল বোঝা যায় কথা-সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলির স্মৃতি কথা থেকে। ১৯২৭’শে নন্দলাল বসু অঙ্কিত এবং কবিগুরু স্বাক্ষরিত ‘স্নাতক’ শংসাপত্র নিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন বিদেশে। বছর দুয়েক কাবুলে কাটিয়ে গেলেন জার্মানি। ১৯২৭ থেকে ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মুজতবা আলী কাবুলের শিক্ষা দপ্তরে অধ্যাপনা করেন। সেখানে তিনি ইংরেজি ও ফরাসি ভাষার শিক্ষক ছিলেন। তাঁর ‘দেশে বিদেশে’ বইতে ধরা পড়েছিল আফগানিস্তানের খুঁটিনাটি বিবরণ।
‘দেশে বিদেশে’ গ্রন্থে একটি পুরো আফগানিস্তান পাওয়া যায়। ২০১৫ সালে বইটি ইংরেজিতে ‘ইন এ ল্যান্ড ফার ফ্রম হোম’ শিরোনামে অনূদিত হয়। নাজেস আফরোজ অনূদিত এ বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন আফগান ইতিহাসের একনিষ্ঠ গবেষক ন্যান্সি হ্যাচ ডুপ্রি। সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত এই ভ্রমণ কাহিনি ১৯৪৮ সালের মার্চ মাস থেকে ধারাবাহিকভাবে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এটি সৈয়দ মুজতবা আলীর প্রকাশিত প্রথম বই। একটি ভ্রমণলিপি হওয়া সত্ত্বেও এটি আফগানিস্তানের লিখিত ইতিহাসের একটি অনবদ্য দলিল। আফগানিস্তানের কোনও সমাজতাত্ত্বিক বা ইতিহাসবেত্তা এমন আফগানিস্তানের খোঁজ পাবেন কি না সন্দেহ।
ভ্রমণলিপিটি শুরু হয় তাঁর কলকাতা থেকে পেশাওয়ার
হয়ে কাবুল যাওয়ার বর্ণনা দিয়ে। কাবুলে তিনি বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের সাথে পরিচিত হন এবং অত্যন্ত সূক্ষ্ম রসবোধের সাহায্যে তাদের সাথে কথোপোকথন ও দৈনন্দিন জীবনের কার্যকলাপ তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে আফগানিস্তানের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, শিক্ষা ও মোল্লাতন্ত্র-প্রকৃত ধর্মচর্চার প্রভেদ সম্পর্কে লেখক তাঁর অভিমত ব্যক্ত করেন। কাবুলে অবস্থানের শেষ পর্যায়ে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন শুরু হয় এবং বাচ্চায়ে সাকোর আক্রমণে বিপর্যস্ত কাবুল ত্যাগের করুণ কাহিনির মধ্য দিয়ে শেষ হয় এই আখ্যান।
সৈয়দ মুজতবা আলীর ফুটিয়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের মধ্যে আছে আবদুর রহমান- লেখকের ভৃত্য এবং অন্যতম প্রধান চরিত্র। পুরো কাহিনিজুড়ে হাস্যরসাত্মক ও বিচক্ষণতা মিশ্রিত ঘটনার জন্ম দিলেও শেষ পর্যায়ে লেখকের সাথে বিদায়ের মুহূর্তে মর্মান্তিক এবং করুণ পরিণতি হয়।
“বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাঙালির অনুসন্ধানী চেতনার উদাহরণ হয়ে আছেন রামনাথ বিশ্বাস ও বিমল মুখার্জি। বিমল ও রামনাথ দু’জনই গিয়েছিলেন ১৯৩০-এর দশকে। বিমল মুখার্জি যাত্রা শুরু করেছিলেন ১৯২৬ সালে এবং শেষ করেছিলেন ১৯৩৭-এ। রামনাথ তার তিনটি ওয়ার্ল্ড ট্যুর করেছিলেন ১৯৩১ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে। বিশ্বপর্যটক প্রথম বাঙালি হিসেবে বিখ্যাত হয়েছিলেন রামনাথ এবং সঠিকভাবেই তিনি প্রথম বাঙালি বিশ্বপর্যটক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। তাঁর সাইকেল ভ্রমণ বিদেশেও বিখ্যাত হয়েছিল।“
এই কথা জানিয়ে মৌসুমী বিশ্বাস দাশগুপ্ত লিখেছেন, “রামনাথের লেখায় ১৯৩০-এর দশকে আফগানিস্তানে রুশ প্রভাবের বিবরণ পাওয়া যায়। জানা যায়, সাধারণ আফগানদের ধারণা ছিল বাঙালিরা সাধারণত দুই প্রকারের মানুষ— এক. জাদুকর, যারা মন্ত্র ও জাদু জানে; আর দুই. হুলিয়া নিয়ে পালিয়ে বেড়ানো বিপ্লবী (বাহাদুর বাঙালি)। রামনাথ একটি অদ্ভুত তথ্য দিয়েছেন যে, মুসলিম পাঠানরা নিজেদের আসলে হিন্দু বলে বিবেচনা করত। আমেরিকার ডেট্রয়েটে এই পাঠান ও পাঞ্জাবি মুসলমানরা মিলে প্রতিষ্ঠা করে হিন্দু অ্যাসোসিয়েশন। অথচ অন্য ভারতীয়রা প্রতিষ্ঠা করেছিল ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন। তিনি একজন কাবুলিওয়ালার দেখা পেয়েছিলেন, যিনি কলকাতায় লক্ষ্মী নামে এক নারীকে হিন্দু রীতি অনুসারে বিয়ে করেছিলেন। যদিও সেই লক্ষ্মী এখন বোরকা পরে। রামনাথ তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে হিজাবের বিরুদ্ধে কথা বলেননি, যদিও বিমল তা বহুবার করেছেন। সে যা-ই হোক, অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, রামনাথ আফগানিস্তানের দুর্গম এলাকায়ও বাঙালিদের বাস করতে দেখেছেন। সেখানে এই বাঙালিরা কেউ ব্যবসা আবার কেউ চাকরি করত।
রামনাথ তাঁর লেখায় মানুষকে সবসময় জেনোফোবিয়া থেকে মুক্ত হতে শিক্ষা দিতে চেয়েছেন। আফগানিস্তান ও আফগান মানুষদের সম্পর্কে বাঙালিদের মধ্যে প্রচলিত অনেক নেতিবাচক গল্পকে তিনি বাতিল করেছেন। তার ভ্রমণবৃত্তান্ত আফগানদের নানা প্রশংসায় পূর্ণ। তিনি যখন আফগানদের সঙ্গে মিশেছেন, তখন নিজেকে বাঙালি হিন্দু বলেই পরিচয় দিতেন। তার কাছে এই দুই পরিচয় মধ্যে কোনও দ্বন্দ্ব নেই।
অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক একটি তথ্য পাওয়া যায় ১৯৩৩ সালে রামনাথের লেখা ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকে। তিনি লিখেছিলেন যে, খুব অল্প কয়েকজন ভারতীয়ই তখন পর্যন্ত আফগানিস্তান সফর করেছিলেন। তিনি সীমান্তের কর্মকর্তার কাছে জানতে পেরেছিলেন যে, তার আগে তিনজন পার্সি সাইকেলে চেপে ভারত থেকে আফগানিস্তানে প্রবেশ করেছিলেন। তারও আগে একজন বৈষ্ণব হাতে একতারা নিয়ে হরিনাম জপতে জপতে আফগানিস্তানে প্রবেশ করেছিলেন। শেষ ছয় বছরে রামনাথ ছিলেন আফগানিস্তানে প্রবেশকারী পঞ্চম ভারতীয় পর্যটক।“ (সূত্র—সিলেটটুডে২৪ ডটনিউজ, ’প্রথম বাঙালি ভূ-পর্যটক সিলেটের রামনাথ’, ২০১৭-১০-০৮)।
অপু ভৌমিক লিখেছেন, “রামনাথ বিশ্বাসের আফগানিস্তান ভ্রমণ বইটি পড়ে দেখার অনুরোধ করছি। ভারতের স্বাধীনতার আগে তিনি আফগানিস্তান ভ্রমণ করেছিলেন। তাঁর বইতে সেই সময়কার চালচিত্র বেশ ভালভাবে বর্নিত হয়েছে। সেইসময় অল্প কয়েকজন হিন্দু প্রতিবেশীর সম্মানার্থে কোরবানির সময় মুসলিমরা এলাকার বহুদূরে গিয়ে গরু কোরবানি করত। বাদশাহ আমানুল্লাহ সংস্কারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বৃটিশরা তাঁর বিরুদ্ধে ইসলাম অবমাননার অভিযোগ তুলে ধরে অসংখ্য লিফলেট ছড়িয়ে দিয়ে সেখানকার জনগণকে উত্তেজিত করে তোলে। পরিণতিতে তিনি আবার শরিয়া আইনে ফিরে যেতে বাধ্য হন এবং সর্বশেষে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। আফগানীরা উন্নত জাতি। ব্রিটিশ, রাশিয়া, পাকিস্তান, আমেরিকার অবিরাম হস্তক্ষেপ না হলে এতদিনে তারা অনেকদূর এগিয়ে যেত।“
এই আলোচনায় অবশ্যই আসে ‘কাবুলিওয়ালার বাঙালি বৌ’। লেখিকা সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৯৭ সালে তাঁর জীবনের নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে বইটি লেখেন। এটি একটি সংগ্রামমুখর একটা জীবনের গল্প। ১৯৮৮ সালের ২ জুলাই ২৭ বছর বয়সে বিশেষ বিবাহ আইনে (স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট) জানবাজ খান নামের এক ব্যবসায়ীকে বিয়ে করেন সুস্মিতা। পরিবারের অমতে জানবাজের সঙ্গে চলে যান আফগানিস্তানে। এটা নিয়ে একটা সিনেমা হয় ‘এসকেপ ফ্রম তালেবান’। ২০০৩ সালে নির্মিত এই ছবিতে অভিনয় করেন মনীষা কৈরালা।
আফগানিস্তান বা কাবুলের ওপর বাংলায় আরও কেউ কেউ নিশ্চয়ই লিখেছেন। সব মিলিয়ে কাবুল কিন্তু বাঙালি পাঠককূলের অনেকের কাছেই একটা বড় আকর্ষণ।


You are very articulate and explain your ideas and opinions clearly leaving no room foe miscommunication.