নেতা কীভাবে হবেন? স্বামীজির অনুভব ও বাণী শোনালেন ড. কল্যাণ চক্রবর্তী

(স্বঘোষিত, মনোনীত, নির্বাচিত এবং লুণ্ঠিত — অসংখ্য নেতার ভীড়ে আদর্শ নেতা, সত্য-সম্পর্কিত নেতা সনাক্তকরণ করা আজ এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। তেমনই কঠিন হল, নিজেকে নেতৃত্বদানের যোগ্য করে তোলা। স্বামীজির বাণী ও রচনা থেকে নেতা হবার মণিমাণিক্য খুঁজে বার করার চেষ্টা করেছেন ড. কল্যাণ চক্রবর্তী।)

১. সংগঠন কীভাবে গড়ে ওঠে, কার্যকর্তা নির্মাণ কীভাবে হয়, সে বিষয়ে ভারতীয় মজদুর সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা দত্তপন্থ ঠেংড়ীজীর অনুভব লিখেছিলাম ২০১৯-এ উনার জন্মশতবর্ষে। মনে হল, এবার তার উৎস মুখে যাই। ভারতবাসীর এক অন্যতম সেরা, চিরকালীন নেতার কথা শোনাই। অবশ্যই স্বামী বিবেকানন্দের কথা বলব। বলব ভারতবর্ষের শাশ্বত এক যুবনেতার কথা। তার প্রেক্ষিতেই এই নিবন্ধ।

২. ১৮৫৭ সালের মহা-আন্দোলন কেন সফলতা পেল না, তা বলতে গিয়ে স্বামীজি এক ইংরেজ বন্ধু জেনারেল স্ট্রং-এর উল্লেখ করেছেন যিনি সে সময় ভারতে ছিলেন। স্বামীজি বলছেন, “তিনি ‘গদরের’ গল্প করতেন। একদিন কথায় কথায় জিজ্ঞাসা করা গেল, সিপাহিদের এত তোপ বারুদ রসদ হাতে ছিল, আবার তারা সুশিক্ষিত ও বহুদর্শী, তবে এমন করে হেরে ম’লো কেন?” তিনি জবাব দিয়েছিলেন, “তাদের মধ্যে যারা নেতা হয়েছিল, সেগুলো অনেক পেছনে থেকে ‘মারো বাহাদুর – লড়ো বাহাদুর’ করে চেঁচাচ্ছিল; অফিসার এগিয়ে মৃত্যুমুখে না গেলে কী সিপাহি লড়ে?”

৩. স্বামীজি বলছেন, নিজেই নিজেকে নেতার আসনে বসাতে নেই। তাঁর পর্যবেক্ষণ, অনেকেরই ইচ্ছে যে তিনি নেতা হন। ভারতে সবাই নেতা হতে চায়, অথচ হুকুম তামিল করবার কেউ নেই। আসলে লিডার জন্মান, লিডারকে বানানো যায় না, এটি বুঝতে না পারাতেই যাবতীয় বিপত্তি! সত্যিকারের লিডারি করা সহজ কাজ নয়। তাকে দাসস্য দাস হতে হয়, তাকে হাজার লোকের মন জোগাতে হয়। ঈর্ষা, স্বার্থপরতা আদপে থাকবে না তার। তাকে নিঃস্বার্থ হতে হবে; যার যা প্রাপ্য তা দিতে হবে। অন্যের সামান্যতম অধিকারও পদদলিত করা চলবে না। নিখাদ ভালোবাসা আর সংযমের চরিত্র চাই। দশের হিতের জন্য নিঃশেষে ‘আমিত্ব’ বিসর্জন চাই। সবসময় আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হওয়া চাই।

৪. স্বামীজির উপলব্ধি ছিল, ভারতবর্ষে তিন জন লোকও পাঁচ মিনিট সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে কাজ করতে পারেন না। ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিমন্ডলে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রবণতা আছে, হিংসা না করার শিক্ষা নেই। এখানে ঈর্ষার অন্ত নেই। ইর্ষার জন্ম হয় কর্তৃত্বের ভাব দেখালে পরে। পদমর্যাদা যত বাড়ে, ঈর্ষাও তত বাড়তে থাকে। নেতারা সাধারণত চরিত্রবান হন না। নিজেকে নির্দোষ প্রতিপন্ন করতে নেতার সতত প্রচেষ্টা থাকে, ব্যর্থতার দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা থাকে। এসব ভালো নয়।

৫. স্বামীজির প্রথম পরামর্শ, “নেতা হতে যেয়ো না, সকলের সেবা কোরো। নেতৃত্বের এই পাশব-প্রবৃত্তি জীবনসমুদ্রে অনেক বড় বড় জাহাজ ডুবিয়েছে।” তিনি বলছেন, আদর্শ নেতারা আপন ব্যক্তিত্বের জন্যই সফল হতে পেরেছেন। বড় কাজ কেবল মহান ত্যাগ দিয়েই সম্পন্ন হয়। সবকিছুর ঊর্ধ্বে পক্ষপাতহীন হলে কর্মে সাফল্য আসে। নেতা যখন বলতে পারেন ‘বহুজনহিতায় বহুজনসুখায়’ তখনই সাফল্য লাভ হয়। নিখুঁত ও শুদ্ধচরিত্রের নেতা চাই। আপাতদৃষ্টিতে শিশুকে মনে হয় সকলের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু সে-ই তার শৈশব-সত্তা দিয়ে গোটা বাড়ি শাসন করে। শ্রেষ্ঠ নেতার চালিকাশক্তিও হবে শিশুর মতো; সরল, পবিত্র, বাল্যগাম্ভীর্য-ভাব মিশ্রিত, অথচ সকলের দ্বারা পরিচালিত। সকলের প্রভু তিনিই হতে পারেন, যিনি সকলের দাস। যার প্রেমে উচ্চ-নীচ নেই, কোনোরূপ অহংভাব নেই, সম্প্রদায়-বুদ্ধি নেই, তিনিই আদর্শ নেতা। নেতার সহায়ক সঙ্ঘশক্তি থাকতে হবে, যে সঙ্ঘশক্তি আজ্ঞানুবর্তিতার জন্ম দেয়। আদর্শ নেতা তিনিই, যিনি মহাশত্রুর প্রতিও সর্বদা হিতবচন প্রয়োগ করেন। নেতা দলে/ সংগঠনে সমালোচনার বদলে ইতিবাচক কথা বলবেন। তার কাজ হল, যা বলার আছে বলা এবং যা শেখানোর আছে শেখানো। ঐখানেই তার কর্তব্য শেষ। বিরুদ্ধ সমালোচনা সকল সর্বনাশের মূল। দয়া আর ভালোবাসায় সব হয়; লেকচার, বই, ফিলোসফিতে হয় না–একথা নেতাকে মনে রাখতে হবে।

৬. দল ভাঙে পরস্পরকে ক্রিটিসাইজ করার জন্য৷ দল ভাঙে একজনের কথা আর একজনকে বলার জন্য, পরনিন্দার জন্য। স্বামীজি বলছেন, দোষ দেখা সহজ, গুণ দেখাই মহাপুরুষের কাজ। তিনি দোষ দেখে কাউকে বিচার না করার কথা বলছেন। আড়ালে অন্যের নিন্দা না করার কথা বলেছেন। সকলকে ভালোবাসাই নেতৃত্বের বড় লক্ষণ। একমাত্র প্রেমই পারে কর্তব্যকে মধুর করে তুলতে। নেতার উচিত তার তত্ত্বাবধানে যারা রয়েছেন তাদের সাহসী, নীতিপরায়ণ ও সহানুভূতিসম্পন্ন করে তোলা। কাউকে কৃপার চোখে না দেখা, সকলকে সমান মনে করে চলা। প্রকৃত মানুষের মূল্য সমস্ত ধনসম্পদের চাইতেও বেশি। কোনো আদর্শ নেতার কর্মপন্থা তিনটি পর্যায়ে গিয়ে তবে গৃহীত হয় — প্রথমে বিদ্রুপ, তারপর বিরোধিতা এবং পরিশেষে গ্রহণ। কঠোর নীতিপরায়ণতার একটুকু এদিক-ওদিক হওয়া চলবে না। তাহলেই সর্বনাশ। (তথ্যসূত্রঃ How to be a Leader, Swami Goutamananda 2012, Ramakrishna Math, Maylapore, Chennai; আদর্শ নেতা কীভাবে হওয়া যায়, আদর্শ নেতার আবশ্যিক গুণাবলী সম্পর্কে পঞ্চাশটি অভিমত, স্বামী বিবেকানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, তৃতীয় পুনর্মুদ্রণ, ২০১৮)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *