স্বরূপ দত্ত, উত্তর দিনাজপুর, ১০ আগস্ট: ঘরকুনো বলে বাঙালীর অপবাদ থাকলেও এই বাঙালির পায়ের তলায় সর্ষেও আছে। পকেটের জোর না থাকলেও অচেনাকে চেনা আর অজানাকে জানার অদম্য ইচ্ছায় এই বাঙালিই তো পাড়ি দিয়েছে হাজার হাজার মাইল পথ। ছুটে চলার অন্তহীন ইচ্ছের কাছে যেখানে হার মানে আর্থিক অসঙ্গতি। দক্ষিন কলকাতার চেতলা এলাকার বাসিন্দা পরিমল কাঞ্জি। স্টোভ, গ্যাস ওভেন, প্রেশার কুকার সারাইয়ের ছোট্ট একটা দোকান রয়েছে তার। কাজের সূত্রে মাঝে মাঝেই নিজের আদ্যিকালের সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পড়তেন কাছে-দূরের কর্মস্থলে। বৃহত্তর জগতের হাতছানি যখন ক্রমশ বাউন্ডুলে মনটাকে আনচান করে তুলছে ঠিক তখনই ভারত ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন পঞ্চান্নটা বসন্ত পেরিয়ে আসা পরিমল কাঞ্জি। সঙ্গী বলতে নিজের আদ্যিকালের সাইকেল, কিছু জামাকাপড়, শুকনো খাবার আর বন্ধুর দেওয়া সামান্য হাতখরচার টাকা।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে কলকাতা থেকে যাত্রা শুরু করে ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, কেরল, কর্নাটক, গোয়া, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, রাজস্থান, পাঞ্জাব, জম্মু-কাশ্মীর, শ্রীনগর হয়ে পৌঁছান লাদাখে। ফিরতি পথে নেপাল হয়ে কলকাতা ফেরার পথে মঙ্গলবার তিনি আসেন রায়গঞ্জে।
এদিন শহরের বুকে তাকে সম্বর্ধনা জানান তার অনুরাগীরা৷ শঙ্কর ধর নামে এক পর্বতারোহী বলেন, “পরিমলবাবু বাংলার গর্ব৷ কী পরিমান ইচ্ছাশক্তি থাকলে সাইকেলে চেপে ভারত ভ্রমণের সাহস দেখানো যায় তা পরিমলবাবুর কাছ থেকেই শিখতে পেরেছি৷ তিনিই আমাদের অনুপ্রেরণা।

দীর্ঘ এই যাত্রা পথে পরিমল কাঞ্জি যেমন খুঁজে পেয়েছেন ভারতবর্ষের অন্তরাত্মাকে তেমনি নানা অভিজ্ঞতা পূর্ণ করেছেন। কোনো মানুষের ব্যবহারে কষ্ট পেয়েছেন আবার অনেকের ব্যবহার দাগ কেটে গিয়েছে হৃদয়ের গভীরে। পরিমল বাবুর কথায়, এসব নিয়েই তো জীবন। চলার পথে বহু মানুষের সহযোগিতা পেয়েছি। এবার কলকাতায় ফিরে সাময়িক বিরতি, তারপর আবার বেড়িয়ে পড়বো অন্যান্য জায়গাগুলির উদ্দেশ্যে।”

সমতল রাস্তায় দিনে একশো আশি কিলোমিটার আর পাহাড়ি অঞ্চলে ষাট কিলোমিটার সাইকেল চালিয়েও ক্লান্ত নন তিনি। বরং বদ্ধ ঘরের বাইরের জগতটাকে দেখার, জানার একটা পাগলামি ক্রমশ তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় এই মানুষটাকে। ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় অত্যন্ত জনপ্রিয় মুখ হয়ে উঠেছেন তিনি, অ্যাডভেঞ্চার প্রেমীরা তাকে কুর্ণিশ জানিয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। মধ্যবিত্ত মানুষ যখন দশটা -পাঁচটা অফিস, অসাধ্য সাধ পূরণের লক্ষ্যে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ছুটে চলেছে, তখন তার বিপরীত স্রোতে এক বাঙালী জীবনের আসল সত্য খুঁজে পেতে ছুটে চলেছেন ক্লান্তিহীন পথে। এর নামই হয়তো বেঁচে থাকা। আনন্দ সিনেমার সংলাপ টা মনে আছে, “জিন্দেগী লম্বি নেহি/ বড়ি হোনা চাহিয়ে”- পরিমল কাঞ্জির মতো মানুষরা হয়তো এই জীবন দর্শনেই বিশ্বাসী।

