কেন ‘নৈঃশব্দের অধিকার’ পাচ্ছি না, প্রশ্ন পরিবেশকর্মী বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায়ের

আমাদের ভারত, ১৯ অক্টোবর: দফায় দফায় অভিযোগ-আবেদনেও কেন আমরা ‘নৈঃশব্দের অধিকার’ পাচ্ছি না, সেই প্রশ্ন তুললেন পরিবেশ ও সমাজকর্মী তথা রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের প্রাক্তন আধিকারিক বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায়।

তাঁর বক্তব্য, “শব্দ ধীরে ধীরে মানুষের কাছে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে মানুষেরই জন্য। মাইক্রোফোনের অপব্যবহার মানুষকে “বাধ্যতামূলক শ্রোতা”-তে পরিণত করেছে। অবাঞ্ছিত শব্দ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে মানুষ সৃষ্টি করেছে ‘শব্দদানব’। এর অত্যাচারে ঘটছে নানা অবাঞ্ছিত ঘটনা।

শব্দদানবের হাত থেকে বাঁচার তাগিদেই মানুষই আবার সৃষ্টি করেছে নানাবিধ আইন। এর সুচারু প্রয়োগের পথ প্রশস্ত হয়েছে হাইকোর্টের বিচারপতি ভগবতীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক বিচারের বাণীর মধ্য দিয়ে। ১৯৯৬ -র এপ্রিলে তিনি এক ঐতিহাসিক তথা গুরুত্বপূর্ণ রায় দেন। একে কার্যকরী করা আজ অত্যন্ত জরুরি। সমাজের সকল স্তরের মানুষের দৃঢ় মানসিকতা আগামী দিনে এই রায়কে কার্যকরী করতে হবে।

শব্দদূষণের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ন্যায়ালয়ের একের পর এক রায় কেন্দ্রীয় সরকারকে বাধ্য করে বিষয়টি নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করতে এবং তার ফলস্বরূপ ২০০০ সালে প্রণয়ন করা হয় শব্দদূষণ সংক্রান্ত নতুন আইন। এই আইনের প্রধান উদ্দেশ্য :

১) উৎসবের আনন্দকে বজায় রাখতে নিয়ম মেনে সাউন্ড লিমিটার সহ মাইক্রোফোন ব্যবহার করতে হবে। ২) শব্দবর্জিত অঞ্চলে কোন প্রকার শব্দদূষণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আদালত ও হাসপাতালের চারদিকে ১০০ মিটার পর্যন্ত এলাকা শব্দবর্জিত অঞ্চল হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে । এই অঞ্চলে হর্ণ বাজানোও সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। ৩) নির্ধারিত সময়সীমা এবং প্রশাসনের অনুমতি ব্যতীত মাইক্রোফোন ব্যবহার করা যাবে না । রাত দশটার পর ও সকাল ছটার আগে মাইক্রোফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ। ৪) উচ্চ বিস্ফোরক শব্দ যুক্ত বাজি বা পটকার (চকলেট বোমা, দোদোমা, কালিপটকা প্রভৃতি) উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ। ৫) উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ডিজেল জেনেরেটর সেট পর্ষদের পূর্ব অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করতে হবে ও শব্দ নিয়ন্ত্রক বেষ্টনী ব্যবহার করা আবশ্যিক। ৬) যানবাহনে এয়ার হর্ণ ব্যবহার, বিক্রয় এবং মজুত আইনতঃ নিষিদ্ধ। ৭) পশ্চিমবঙ্গের বনাঞ্চলগুলিতে লাউডস্পিকার বা মাইক্রোফোন ব্যবহার করা যাবে না। ৮) সার্বিক শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সজাগ থাকা দরকার।

দুর্গাপূজার সাথে সাথেই আরম্ভ হয়ে যায় শারদীয়া উৎসব। উৎসবের রেশ থাকবে সরস্বতী পুজো পর্যন্ত। উচ্চস্বরে মাইক বাজবে, শব্দবাজি ব্যবহার হবে নিয়ম ভেঙে। তবু চেষ্টা করতেই হবে নৈঃশব্দের অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করতে। বহু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা শব্দদানবকে বোতল বন্দী করার জন্য নাগরিক আন্দোলন আরম্ভ করেছেন, প্রশাসনকে সক্রিয় হবার জন্য আবেদন করেছেন। শব্দদানব যদি বোতলবন্দী না হয়, তবে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে আরও অনেক শব্দশহীদের জন্য । পশ্চিমবঙ্গে ১৯৯৭ থেকে আজ পর্যন্ত ১৪ জন শব্দ শহীদ হয়েছেন, যদিও মাত্র একটি ক্ষেত্র ছাড়া আর কোন ক্ষেত্রেই দোষীরা কোনরকম শাস্তিও পাননি। দোষীদের দ্রুত শাস্তি ও শব্দশহীদদের ক্ষতিপুরণের জন্য হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা বিচারাধীন।“

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *