প্রসঙ্গ আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়! আমাদের জাতি বিদ্বেষ যেন প্রবাসী বাঙালীদের জন্য অভিশাপের কারণ না হয়ে ওঠে

রজত মুখার্জি
আমাদের ভারত, ২ জুন: সদ্য প্রাক্তন মুখ্য সচিব মাননীয় আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেন্দ্রীয় সরকারের সমন কে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে চাকরি থেকে অব্যহতি নেওয়ার ঘটনায় একদল বাঙালীর বিশ্ব জয়ের আনন্দে ধেই ধেই করে উদ্বাহু নৃত্য, বেশ কিছু রূঢ বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। উগ্র জাত্যাভিমানে নিমজ্জিত বাঙালি জাতিটা কোথাও যেন একটা সংকীর্ণ প্রাদেশিক জাতি হিসেবে উঠে আসছে, তার চিরাচরিত বিশ্বজনীনতা ছেড়ে। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। আমি শঙ্কিত, এই সঙ্কীর্ণ প্রাদেশিকতা আমাদের বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে না তো? ভারতবর্ষের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গরাজ্য হয়েও আমরা নিজের অজান্তেই পরিণত হয়ে যাচ্ছি না তো কোনও এক জনমানবহীন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা হিসেবে? এরকম হাজারো প্রশ্ন আজ উকি দিচ্ছে মানুষের মনে যার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা হল যে, আমাদের এই উগ্র জাত্যাভিমান, প্রাদেশিকতা কি সার্বিক ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নাকি ক্ষেত্র বিশেষে? নাকি সবটাই শাসক দলের রাজনৈতিক ফায়দা লোটার একটা কৌশল মাত্র!

আলাপনবাবু নিঃসন্দেহে বঙ্গবীর ব্রাহ্মণ পুঙ্গব, কিন্ত তাঁর পূর্ববর্তী মুখ্য সচিব রাজীব সিনহা বা নবনিযুক্ত মুখ্য সচিব হরিকৃষ্ণ দ্বিবেদীবাবু কি বাঙালী? এতই যখন বাঙালী অবাঙালির বিভাজন রেখা, সেক্ষেত্রে বাঙালিয়ানাকে প্রাধান্য দিয়ে কোনও বাঙালি মুখ তুলে আনা হল না কেন? আসলে ভোটব্যঙ্ক রাজনীতি পটিয়সী মুখ্যমন্ত্রীর মুখে বহিরাগত তত্ত্ব আওড়ালেও সঙ্কীর্ণ স্বার্থ চরিতার্থ করার অভীষ্টে ভোট কুশলী পিকে থেকে মুখ্য সচিব নিয়োগের ক্ষেত্রে অবাঙালীর শরণাপন্ন হতে বিন্দুমাত্র কুন্ঠিত বোধ করেন না। সবটাই তাঁর আই ওয়াশ মাত্র।

আলাপনবাবুকে কেন্দ্র থেকে সমন করা হলে আমরা কতিপয় অপরিণামদর্শী বাঙালি, “বাঙালি আক্রান্ত, বাঙালি শুধুমাত্র বাঙালী হওয়ার কারণেই অবিচারের শিকার,” ইত্যাদি সাম্প্রদায়িক ন্যারেটিভ তৈরি করে হাত পা ছড়িয়ে বিলাপ করতে বসি, ফেসবুক, ট্যুইটারে ঝড় তুলি। আগামী কাল যদি কোনও কারণে কেন্দ্র দ্বিবেদী সাহেবকে তলব করে বসে, তখনও কি আমরা “বাঙালী আক্রান্ত” বলে গেল গেল রব তুলব নাকি অন্য কোনও ন্যারেটিভ উঠে আসবে? ভুললে চলবে না, দর্শনের কেতাবে অতীব সুখপাঠ্য বিষয়বস্তু বাস্তবের রুক্ষ ভূমিতে বিষবৃক্ষেরই জন্ম দেয়, যার শাখা প্রশাখা হয় অনন্ত বিস্তৃত। অতএব সাধু সাবধান।

প্রসঙ্গত জেনে রাখা দরকার যে, IAS/ IPS রা কিন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে কর্মরত। তাছাড়া গত ৩১ মে সরকারী ভাবে তাঁর চাকরির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর অনুরোধে, কেন্দ্রীয় সরকার অনুমোদিত তিন মাসের প্রলম্বিত কালখন্ড তিনি সসম্মানে প্রত্যাখ্যান করেছেন যেটা সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয়। অতএব এখানে জয় পরাজয়ের কিছু নেই, আর থাকলেও তা নিতান্তই আলাপনবাবুর ব্যক্তিগত বিষয়।

দোর্দন্ডপ্রতাপ IPS দময়ন্তী সেন কি বাঙালী ছিলেন না, নাকি তাঁর বাঙালিয়ানায় কৌলিণ্যের অভাব ছিল! সেদিন কিন্ত আজকের এই রুদালী বাঙালিদের প্রতিবাদে মুখর হতে দেখা যায়নি, কারণ তাতে রাজনৈতিক অভীষ্ট চরিতার্থ হওয়ার মত তেমন কোনও সুযোগ ছিল না। কি তাই তো?

আলাপন বাবুর মত একজন শিরদাঁড়া সোজা আমলার মেয়াদ কালে ঘটে যাওয়া নির্বাচনগুলিতে তাঁর ভূমিকা ঠিক কতটা সদর্থক বা নিরপেক্ষ ছিল, এ প্রশ্নও আজ যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক।

যখন পরিবর্তনের সরকার এসেই কয়েক কোটি টাকা খরচ করে আমলাদের উৎসব পুরস্কার দিয়েছিল তখন আলাপনবাবু নীরব ছিলেন। এটা তাঁর কোনও ব্যক্তি বিশেষের প্রতি নিখাদ আনুগত্য কিনা আমার জানা নেই। তবে সে সময় একমাত্র প্রতিবাদ করেছিলেন তৎকালীন আইএএস নীহাররঞ্জন ব্যানার্জি। এই সরকারের আমলে সরকারের সাথে বনিবনা না হওয়ার কারণে দিল্লি বদলি হয়েছেন তৎকালীন মুখ্যসচিব সঞ্জয় মিত্র। আর যার কথা না বললে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, তিনি হলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ডাঃ শ্যামাপদ গড়াই। যিনি মুখ্যমন্ত্রীর চাটুকারিতা নয় বরং নিজের কর্তব্যনিষ্ঠা ও দায়বদ্ধতাকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। শিরদাঁড়া সোজা রেখেই মুখ্যমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করার পরিবর্তে রোগীর অপারেশন করাকেই সঠিক বলে মনে করেছিলেন। উন্নতশির এই ব্যক্তিত্ব মুখ্যমন্ত্রীকে তাঁর রাজধর্মও বুঝিয়ে দিতে কসুর করেননি, বেশি লোক নিয়ে হাসপাতালে আসার প্রতিবাদ করে। ফলস্বরূপ ডাঃ শ্যামাপদ গড়াইকে সাসপেন্ড করে রাজ্য সরকার।

সেদিন আপনাদের বিবেকগুলো কোথায় বন্ধক দিয়েছিলেন? কিসের বিনিময়ে বা কোন পারিতোষিকের প্রত্যাশায়?

আলাপনবাবুর শিরদাঁড়া কতটা সোজা বা বঙ্কিম তা আমার আলোচ্য বিষয়বস্তু নয়। অনেকে যেমন তাঁর চাপের মুখে নতি স্বীকার না করার মানসিকতাকে বাঙালীয়ানা দিয়ে হাইজ্যাক করতে তৎপর, পক্ষান্তরে আরেক শ্রেণির মানুষ একজন সর্বোচ্চ পর্যায়ের আমলার, কারো পা ধোওয়ার জলের গামলায় পরিণত হওয়ার এই জার্নিটাকে তীব্র কটাক্ষে বিঁধছেন। আমি এই দু পক্ষের কোনও পক্ষেই নেই, কারণ আদার ব্যাপারীর জাহাজের খোঁজখবর রাখার প্রয়োজন কি?

প্রসঙ্গে ফিরে আসি। উপসংহারে আমি আবারও একবার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে বাঙালি অবাঙালি বিভাজনের যে নোংরা খেলায় আমরা মেতে উঠেছি তাতে কিন্ত রীতিমত অশনি সঙ্কেত দেখা দিচ্ছে। এই অস্পৃশ্যতার মনোভাব অচিরেই আমাদের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হতে পারে। ভুলে গেলে চলবে না, শুধুমাত্র চল্লিশ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষ ছাড়াও আরও লক্ষ লক্ষ পশ্চিমবঙ্গবাসী হত্যে দিয়ে ভিন রাজ্যে পড়ে আছেন শুধুমাত্র জীবন ও জীবিকা রক্ষার তাগিদে। কারণ পশ্চিমবঙ্গ সরকার রোজগার দিতে ব্যর্থ। সর্বোপরি, আমরা নিজেরাই নিজেদের মানদন্ড ঠিক করেছি দু’টাকা কিলো চাল আর দৈনিক মজুরিতে একশো দিনের চাকরি সহ বিভিন্ন উপায়ে নিজেদের “শ্রী” বৃদ্ধিতে। যে রাজ্যে শিক্ষার চেয়ে ভিক্ষার দাম বেশি সেখানকার মানুষজন যে রুজিরুটির সন্ধানে গুজরাত, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, মুম্বই, ব্যাঙ্গালোরে পাড়ি দেবেন তা অতি সহজবোধ্য। অতএব নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থেই আমাদের সংযত হওয়া প্রয়োজন। আমাদের জাতি বিদ্বেষ যেন প্রবাসী বাঙালীদের জন্য অভিশাপের কারণ না হয়ে ওঠে। অতএব আলাপনবাবুর লড়াই তাঁর মর্যাদার লড়াইয়েই সীমাবদ্ধ থাক, বাঙালি অবাঙালি লড়াইয়ে পরিণত করা যুক্তিসঙ্গত নয়।
“নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধান, বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান।”(লেখকের নিজস্ব মতামত, এরজন্য আমাদের ভারত দায়ি নয়।)

1 thoughts on “প্রসঙ্গ আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়! আমাদের জাতি বিদ্বেষ যেন প্রবাসী বাঙালীদের জন্য অভিশাপের কারণ না হয়ে ওঠে

Leave a Reply to Suja Ansary Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *