কাঁকসায় ২০১৮ সালে খুন হওয়া সন্দীপের বাবা- মা’র আশীর্বাদ নিয়ে প্রচার শুরু দুর্গাপুর পুর্বের বিজেপি প্রার্থী দীপ্তাংশু চৌধুরীর

জয় লাহা, দুর্গাপুর, ২৬ মার্চ: কাঁকসায় শহিদ হওয়া দলীয় কর্মীর মা-বাবার আশীর্বাদ নিয়ে প্রচার শুরু করলেন দুর্গাপুর পুর্বের বিজেপি প্রার্থী কর্নেল দীপ্তাংশু চৌধুরী। আর প্রচারে নেমেই সংকল্প নিলেন বিজেপির দুর্গাপুর পুর্বের প্রার্থী দীপ্তাংশু। বললেন, “জন্মলগ্ন থেকে সংস্কার হয়নি দামোদরের পলি। কমছে জলধারন ক্ষমতা। তার ওপর বার বার ভেঙে পড়ছে লকগেট। জলসঙ্কটে নাকাল হয়ে ওঠে শহরবাসী। নির্বাচনে জিতে প্রথম কাজ হবে শিল্পাঞ্চলের জলসঙ্কট দুর করা।”

দুর্গাপুর পুর্ব আসনটি দুর্গাপুর পুরসভার কয়েকটি ওয়ার্ডের সঙ্গে কাঁকসার আমলাজোড়া, মলানদীঘি, গোপালপুর পঞ্চায়েত রয়েছে। শহরের পাশাপাশি কিছুটা কাঁকসার কৃষি ও জঙ্গলমহল রয়েছে। তাই শিল্প ও কৃষি দুই বিরাজমান। এবারে আসনটিতে  মূলত ত্রিমুখী লড়াই। গত বিধানসভা নির্বাচনে আসনটি সিপিএম-কংগ্রেস জোটের দখলে ছিল। দুর্গাপুর পুর্বে এবারে সংযুক্ত মোর্চার প্রার্থী আভাস রায়চৌধুরী এবং তৃণমূলের প্রার্থী প্রদীপ মজুমদার। তিনি রাজ্য সরকারের কৃষি উপদেষ্টা ছিলেন। আবার বিজেপির প্রার্থী হয়েছেন কর্নেল দীপ্তাংশু চৌধুরী।

তিনি আসানসোলের বাসিন্দা হলেও কলকাতায় পড়াশোনা। তারপর ইউপিএসসি পরীক্ষা দিয়ে সামরিক বাহিনীর অফিসার চাকরীতে যোগ। ২৪ বছর কর্মজীবনে ২০১৫ সালে কার্গিল যুদ্ধে সামিল হন। সেনাবাহিনীর চাকরী থেকে স্বেচ্ছাবসর নিয়ে বিজেপিতে যোগ। ২০১৬ সালে বিজেপির মাধ্যমে রাজনৈতিক হাতখড়ি। ওই বছরে আসানসোল দক্ষিনে বিজেপির প্রার্থী হন। ৫৩ হাজার ভোট পান। ১৯৯৭ সালে হরিদ্বার থেকে কলকাতা নৌকা বাইচ করে লিমকা রেকর্ড বুকে নাম তোলেন। এছাড়াও বাইচ প্রতিযোগিতায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে একাধিক

পুরস্কার জিতেছেন। পরবর্তীকালে দলবদলে তৃণমূলে যোগ দেন এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও দক্ষিণবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থার চেয়ারম্যান ছিলেন। দক্ষতার সঙ্গে এসবিএসটিসিকে ঢেলে সাজান। মাস দুয়েক আগে পুণরায় বিজেপিতে ফিরে আসেন। বিধানসভা নির্বাচনে দুর্গাপুর পুর্ব আসনে প্রার্থী করেছে বিজেপি। প্রার্থী ঘোষনা হতেই জনসম্পর্কে নেমে পড়েন। যদিও এসবিএসটিসির চেয়ারম্যান থাকাকালীন বিভিন্ন গোষ্ঠী ক্লাবের সঙ্গে জনসংযোগ তৈরী হয়েছিল। তখন থেকেই দুর্গাপুরে সেইলের ডিএসপি আবাসনে থাকতেন।

শুক্রবার কাঁকসার রূপগঞ্জ গ্রাম থেকে প্রচার শুরু করেন। প্রসঙ্গত, বছর দুয়েক আগে রূপগঞ্জের বাসিন্দা, স্থানীয় তৎকালীন বিজেপির বুথ সভাপতি সন্দীপ ঘোষ দুস্কৃতীদের গুলিতে খুন হয়। ঘটনায় মুল অভিযুক্ত এখনও অধরা। শুক্রবার নিহত সন্দীপের মা-বাবার কাছে যান দীপ্তাংশুবাবু। এবং তাদের আশীর্বাদ নিয়ে কার্যত প্রচার শুরু করেন।


ছবি: ২০১৮ সালে নিহত বিজেপি কর্মী সন্দীপ ঘোষের মা’ কে সান্ত্বনা দিচ্ছেন বিজেপি প্রার্থী দীপ্তাংশু চৌধুরী।
এদিন তিনি বলেন,” ক্ষমতায় আসালে সন্দীপ ঘোষের খুনিরা কঠোর শাস্তি পাবে। পাতালে থাকুক আর মর্তে থাকুক, কলার ধরে খুঁজে বের করা হবে।” তিনি আরও বলেন সারা রাজ্যে এরকম ১৩৯ জন বিজেপি কর্মী খুন হয়েছে। আর কোনও মায়ের কোল খালি হোক্ এটা চাই না। রাজ্যে দুর্নীতি মুক্ত সরকার দেব। শান্তি বজায় থাকবে।” এদিন 

প্রচারে নেমেই তিনি সংকল্প নিয়ে বলেন,” মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা থাকাকালীন দুর্গাপুর থেকে অনেক আবেদন গেছে শহরের জলসঙ্কট মোকাবিলায়। তখন কোন কারনে ওই কাজ করতে পারিনি। এবার ক্ষমতায় এসে শহরের জলকষ্ট দুর করব।” প্রসঙ্গত, দামোদর নদের তীরে দুর্গাপুর শিল্পশহর। পাঁচের দশকে দামোদরের ওপর ব্যারেজ তৈরী করা হয়। তারপর একের পর এক শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে। তারপর থেকে একের পর এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আধুনিকমানের হাসপাতাল গড়ে ওঠে। এক কথায় দক্ষিনবঙ্গের স্বপ্নের শহর দুর্গাপুর। কিন্তু গত কয়েকবছর ধরে জলকষ্টে নাজেহাল শিল্পশহর বাসী। গত দুবছরে পর পর দুবার দুর্গাপুর ব্যারেজের লকগেট বিপর্যয় হয়। আর তাতেই সীমাহিন জলকষ্ট অনেক শিক্ষা দেয় শহরবাসীকে। লকগেট মেরামতে সপ্তাহখানেকর বেশী জলকষ্ট ভোগেন শহরবাসী। একই সঙ্গে জলসঙ্কটে ডিভিসির মেজিয়া তাপবিদ্যুৎ সহ একাধিক কারখানা বিপাকে পড়ে। হাহাকার দেখা দেয় দুর্গাপুরে পানীয় জলের। সঙ্কট মোকাবিলায় রাজ্য সরকারের চরম ব্যার্থতার চিত্রটা ফুটে ওঠে। প্রশ্ন ওঠে সমাজের অগগ্রতির সঙ্গে ব্যারেজের আধুনিকিকরন। একই সঙ্গে শহরে বিকল্প পানীয় জলের ব্যাবস্থা এবং তার পরিকল্পনার।

দীপ্তাংশু বাবু বলেন, ” রাজ্য সরকারের সদিচ্ছা ও পরিকল্পনার ভুলে ব্যারেজে আধুনিকিকরন ও পলি সংস্কার হয়নি। প্রায় ২ হাজার একরফুট জলধারন ক্ষমতা কমেছে। বিগত ১০ বছর ক্ষমতায় থেকেও দুর্গাপুরে জলকষ্ট সমাধানে ব্যার্থ তৃণমূল। ব্যারেজে জলধারন ক্ষমতা কমে যাওয়ায় শিল্পশহরের পাশাপাশি দুই বর্ধমান, হুগলি, বাঁকুড়া জেলার চাষীরা সঙ্কটে। সেচ জল পাওয়া ক্রমশ অনিশ্চিয়তায় পড়তে থাকে। তাই জলধারন ক্ষমতা বাড়াতে পলিসংস্কার দরকার।” তিনি বলেন,” ক্ষমতায় আসলে ব্যারেজের পলি সংস্কার হবে। শহরে জলকষ্ট দুর করব।”

সংযুক্ত মোর্চার প্রার্থী আভাস রায় চৌধুরী বলেন, “১০ বছর আগেও শিল্পশহরের বুকে প্রান ছিল। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর নতুন শিল্প হয়নি। ২২ টা কারখানা বন্ধ হয়েছে। ৪৪-৪৫ হাজার শ্রমিক বেকার হয়েছে শিল্পাঞ্চলে। তৃণমূল আর বিজেপি কয়েনের এপিট আর ওপিট। তাই লড়াইটা দুদলের বিরুদ্ধে। নীতির লড়াই। আমরা ক্ষমতায় আসলে বন্ধ কারখানা খুলবে। বেকারদের কর্ম সংস্থান হবে। এটাই লক্ষ্য।”

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে বিজেপি দুর্গাপুর পুর্বে পেয়েছিল ২৩৩০২ ভোট, তৃণমূল পেয়েছিল ৭৫০৬৯ ভোট এবং সিপিএম -কংগ্রেস জোট পেয়েছিল ৮৪২০০ টি ভোট। আবার ২০১৯ লেকসভা নির্বাচনের ফলাফলের নিরিখে দুর্গাপুর পুর্ব বিধানসভায় সিপিএম পেয়েছিল ২৮২৯৭ ভোট, তৃণমূল পেয়েছিল ৬৩৮৬৪ ভোট, আবার বিজেপি পেয়েছিল ৯০৪৫৫ ভোট। লোকসভার ফলাফলের নিরিখে যথেষ্ট এগিয়ে থাকায় দুর্গাপুর পুর্ব আসনে জয়ের বিষয়ে এবারও যুযুধন বিজেপি।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *