পুরোনো কলকাতার প্রায় না জানা একটি গল্প, ভূ–ভারতে এর দ্বিতীয় নজির নেই

ছবি: গ্রামফোন।

তরুণ গোস্বামী
আমাদের ভারত, ৩ জুন:
পুরোনো কলকাতার ইতিহাস নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে খুব চর্চা হয়। কিছু কিছু কাহিনী অনবদ্য, যাঁরা লেখেন তাঁদের ভাষা প্রাঞ্জল– মনে হয় কলম দিয়ে ছবি এঁকেছেন। ভাবলাম পুরোনো কলকাতার প্রায় না জানা বা সামান্য জানা একটি গল্প বলি।

কলকাতাতে তো বটেই ভূ–ভারতে এর দ্বিতীয় নজির আছে বলে আমার জানা নেই। ভাবতে পারেন, টমাস আলভা এডিসন তাঁর তৈরি করা গ্রামফোন একজন বাঙালিকে উপহার দিয়েছিলেন? সেই গ্রামফোনটি এখনো চালু আছে, এই লেখকেরও ওই যন্ত্রটিতে রেকর্ড শোনার অভিজ্ঞাতা আছে। যাঁকে এই উপহারটি দেওয়া হয়ে ছিল, তিনি আর কেউ নন স্বামী অভেদানন্দজী, শ্রী রামকৃষ্ণের শিষ্য, স্বামীজীর গুরুভাই।

মহারাজ দুই দশকের বেশি আমেরিকাতে ছিলেন। ও দেশের প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় বক্তৃতা করেছেন আর তখনকার দিনের শ্রেষ্ঠ পন্ডিতরা ছিলেন মহারাজের ব্যক্তিগত বন্ধু, যেমন উইলিয়াম জেমস, নিকোলা টেসলা, এডিসন। জেমস ছিলেন সেযুগের শ্রেষ্ঠ মনোবিজ্ঞানী। ওঁর সংগে মহারাজ near death experience নিয়ে কাজ করেছিলেন। যদিও তখনকার পন্ডিতরা ওঁদের মতটি মানেননি, এখন যারা এই বিষয়ে গবেষণা করছেন তাঁরা মহারাজ এবং জেমসকেই গুরু, পথপ্রদর্শক মানেন। স্বামীজীর ভক্ত ছিলেন টেসলা। স্বামীজীর সাথে এক হোটেলে থাকতেন, যাতে কোনো বক্তৃতা মিস না করেন। টেসলার সাথে মহারাজের গভীর সখ্যতা ছিল। মহারাজ শ্রীরামকৃষ্ণের একমাত্র শিষ্য যাঁর কণ্ঠস্বর পাওয়া যায়।

ছবি:স্বামী অভেদানন্দ।
তখন সবে ফোনগ্রাফ আবিষ্কার হয়েছে, মহীশূরের রাজা তাঁর গুরু স্বামী বিবেকানন্দের কন্ঠস্বর রেকর্ড করেন। কালের নিয়মে তা হারিয়ে গেছে। স্বামীজী যখন দ্বিতীয়বার বিদেশে যান, ১৯০০ সালে মেরী হেলের শিকাগোর বাড়িতে দুদিন ধরে cylinder equipment এ তার কণ্ঠস্বর ধরে রাখা হয়। দুর্ভাগ্য আমাদের সেটিরও হদিশ পাওয়া যায় না। ১৯৩৬ সালে ঠাকুরের জন্ম শতবর্ষে স্বামী অভেদনন্দজীর বক্তৃতাটি পাওয়া যায়। মেগাফন রেকর্ড কোম্পানি থেকে তাঁর সংস্কৃত স্তোত্র প্রকাশিত হয়েছিল।

মহারাজ না থাকলে ফ্রাঙ্ক ডোরাক এর আঁকা ঠাকুরের ছবিটি আমরা পেতাম না। দ্বিতীয়ত দার্জিলিং এর শ্মশানে নিবেদিতাকে দাহ করা হয়েছিল। মহারাজ তখন আমেরিকাতে। ১৯২১ সালে ফিরে এসে অর্থাৎ নিবেদিতার মৃত্যুর দশবছর পরে জাতির পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ একটি ফলক বসানো হয় মহারাজের উদ্যোগে। সেই ফলোকটি এখনো আছে।

স্টার theater এর পিছনে মহারাজের প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠ। উৎসাহী মানুষজনকে ওখানের মহারাজরা গ্রামফোনটি বাজিয়ে শোনান। অভেদনন্দজীর পিতা রসিক লাল চন্দ্র ছিলেন স্বামীজীর পিতা বিশ্বনাথ দত্তর শিক্ষক। কালীপ্রসাদের বেদান্তের ওপর অগাধ জ্ঞান। স্বামীজী অভেদ বাদী বৈদন্তীকের নাম দিয়েছিলেন অভেদনন্দ। ওঁর মঠে প্রায়ই নটি বিনোদিনী আসতেন। পাশের পাড়া স্টার লেনে ছিল তাঁর বাড়ি। ঠাকুরের মূর্তির সামনে চুপ করে বসে থাকতেন, কখনো বা কাঁদতেন। মহারাজের সাথেও গিয়ে আলাপ করতেন দীর্ঘক্ষণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *