পার্থ খাঁড়া, আমাদের ভারত, পশ্চিম মেদিনীপুর,
৫ সেপ্টেম্বর: গবেষণাগারে তৈরি প্রযুক্তিকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে আরও এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জন করল আইআইটি খড়্গপুরের সাশ্রয়ী স্বাস্থ্য পরিষেবা সংক্রান্ত Common Research and Technology Development Hub (CRTDH)। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রকের Department of Scientific and Industrial Research (DSIR)-এর অধীনে ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্র তার প্রাথমিক অনুদান নির্ভর পর্যায় সফলভাবে সম্পূর্ণ করে এবার প্রবেশ করল টেকসই ও স্বনির্ভর পর্যায়ে।

শনিবার আইআইটি খড়্গপুরের বেন গুপ্ত অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই টেকসই পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন DSIR- এর সচিব এবং Council of Scientific and Industrial Research (CSIR)- এর মহানির্দেশক ড: (শ্রীমতী) এন. কালাইসেলভি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আইআইটি খড়্গপুরের ডিরেক্টর তথা CRTDH- এর প্রধান তদন্তকারী প্রফেসর সুমন চক্রবর্তী, DSIR- এর আধিকারিক, শিল্পোদ্যোগী, MSME ও স্টার্ট আপ প্রতিনিধিরা, গবেষক, চিকিৎসা প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যকর্মীরা।
★অনুদান-নির্ভরতা কাটিয়ে স্বনির্ভর মডেলে—
DSIR-এর CRTDH প্রকল্পের আওতায় ২০১৯ সালে যাত্রা শুরু করা এই কেন্দ্র এতদিন সাশ্রয়ী স্বাস্থ্য প্রযুক্তির গবেষণা, উন্নয়ন, পরীক্ষা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এবার সরকারি প্রাথমিক সহায়তার পর্যায় পেরিয়ে কেন্দ্রটি ব্যবহারকারীর ফি, শিল্প সংস্থার পৃষ্ঠপোষকতা এবং প্রযুক্তি রূপান্তরমূলক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পরিচালন ব্যয় মেটানোর স্বনির্ভর মডেলে প্রবেশ করেছে।
এই পরিবর্তনকে দেশের গবেষণা ও উদ্ভাবন পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে MSME, স্টার্ট
আপ, ব্যক্তিগত উদ্ভাবক এবং অন্যান্য প্রযুক্তি উন্নয়নকারীরা আগামী দিনেও অত্যাধুনিক পরিকাঠামো, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও গবেষণা সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
CRTDH- এর এই স্বনির্ভর মডেল শিল্প ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা আরও জোরদার করার পাশাপাশি গবেষণাগারে তৈরি প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণ এবং বাস্তব ক্ষেত্রে তার প্রয়োগের পথকে আরও প্রশস্ত করবে।

★২০টিরও বেশি প্রযুক্তি— হস্তান্তর
গত সাত বছরে CRTDH- এর অন্যতম বড় সাফল্য হল ২০টিরও বেশি প্রযুক্তি হস্তান্তরে সহায়তা করা। এর মধ্যে একাধিক প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়ে বাজারে এসেছে।
প্রায় ৫,০০০ বর্গফুট এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠা এই কেন্দ্রের লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তি তৈরি করা নয়, বরং সেই প্রযুক্তিকে বাস্তব স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থার উপযোগী করে তোলা। বিশেষত এমন প্রযুক্তি তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা উন্নত পরিকাঠামো ছাড়াই ব্যবহার করা যায় এবং গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকার ফ্রন্টলাইন স্বাস্থ্যকর্মীরাও সহজে পরিচালনা করতে পারেন।
এই প্রসঙ্গে CRTDH-এর প্রধান তদন্তকারী প্রফেসর সুমন চক্রবর্তী বলেন, বাস্তব স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা মোকাবিলায় ফ্রুগাল ইনোভেশন বা স্বল্পব্যয়ী উদ্ভাবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের জন্য তৈরি প্রযুক্তিকে হতে হবে একই সঙ্গে শক্তিশালী, নির্ভরযোগ্য, সহজে ব্যবহারযোগ্য এবং সাশ্রয়ী।
★গ্রামে পৌঁছে যাচ্ছে রোগ নির্ণয়ের প্রযুক্তি—
CRTDH-এর উদ্যোগের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হল গবেষণাগারে তৈরি প্রযুক্তিকে সরাসরি গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত করা। ক্লিনিক্যাল প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন বেসরকারি ও অ- সরকারি সংস্থার সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একাধিক গ্রামীণ স্বাস্থ্য ইউনিট গড়ে তোলা হয়েছে।
সুন্দরবন ও বীরভূম- সহ প্রত্যন্ত এলাকার ১৫ জন ফ্রন্টলাইন স্বাস্থ্যকর্মী অনুষ্ঠানে তাঁদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। CRTDH- এর স্কিলিং কর্মসূচির মাধ্যমে প্রশিক্ষিত ও সার্টিফায়েড এই স্বাস্থ্যকর্মীরা বর্তমানে গ্রামীণ এলাকায় সাশ্রয়ী রোগ নির্ণয় প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন।
Skill India-র উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই স্বাস্থ্যকর্মীরা National Health Mission- এর স্বাস্থ্য পরিষেবা কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করছেন। তাঁদের পরিচালিত স্বাস্থ্য ইউনিটগুলিতে সীমিত স্বাস্থ্য পরিকাঠামো রয়েছে এমন এলাকার মানুষের জন্য স্ক্রিনিং, রেফারাল এবং ফলো-আপ পরিষেবা দেওয়া হচ্ছে।
ফলে একদিকে যেমন প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে রোগ নির্ণয়ের সুযোগ পৌঁছে যাচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে গ্রামীণ যুবসমাজের জন্য তৈরি হচ্ছে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ।

★‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য—
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ড: (শ্রীমতী) এন. কালাইসেলভি দেশীয় চিকিৎসা প্রযুক্তির সক্ষমতা বৃদ্ধিতে DSIR এবং CRTDH নেটওয়ার্কের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, DSIR-এর সহায়তার সময়সীমা শেষ হওয়ার পরেও একটি CRTDH সফলভাবে কাজ চালিয়ে যেতে পারা এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য—অর্থাৎ শিল্প ও উদ্ভাবকদের স্বনির্ভর পদ্ধতিতে পরিষেবা দেওয়া বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
তিনি আরও বলেন, এই ধরনের পরিকাঠামোর ব্যাপক ব্যবহার দেশের নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াবে এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার লক্ষ্যকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে। একই সঙ্গে তা ভারতের ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’- এর লক্ষ্য পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
★‘MSME Voices’-এ উঠে এল গবেষণাগার থেকে বাজারের গল্প—
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘MSME Voices’ পর্ব। CRTDH- এর পরামর্শ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও পরিকাঠামো ব্যবহার করে বিভিন্ন শিল্পোদ্যোগী কীভাবে গবেষণাগারের প্রোটোটাইপকে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপ দিয়েছেন, সেই অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তাঁরা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি এবং আইআইটি খড়গপুরের ডিরেক্টর সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলিকে সম্মানিত করেন। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উদ্ভাবক এবং শিল্পক্ষেত্রের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতাই কীভাবে প্রযুক্তিকে বাজারমুখী করে তুলতে পারে।
★পরিকাঠামো পরিদর্শন, বৃক্ষরোপণ—
অনুষ্ঠান উপলক্ষে ড: (শ্রীমতী) এন. কালাইসেলভি আইআইটি খড়্গপুরের ডিরেক্টর এবং DSIR- এর আধিকারিকদের সঙ্গে CRTDH- এর ওয়েট ও ড্রাই ল্যাবরেটরি এবং THRIVE Centre পরিদর্শন করেন। তিনি আইআইটি খড়্গপুর ক্যাম্পাসে একটি চারাগাছও রোপণ করেন।
CRTDH- এর টেকসই পর্যায়ের সূচনার প্রতীক হিসেবে এই বৃক্ষরোপণকে তুলে ধরা হয়। উদ্ভাবন, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও সামাজিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে কেন্দ্রটির ধারাবাহিক বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি অবদানের অঙ্গীকারের প্রতীক হিসেবেও এই উদ্যোগকে দেখা হচ্ছে।
★DSIR আধিকারিকদের বিশেষ স্বীকৃতি—
CRTDH প্রকল্পের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য DSIR- এর CRTDH প্রকল্পের প্রধান Scientist ‘G’ ড: বিপিন শুক্লা-কে অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে স্বীকৃতি জানানো হয়। প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণকারী Scientist ‘F’ এবং Member Secretary–CRTDH, DSIR ড. রণজিৎ বাইরওয়া এবং Scientist ‘D’, DSIR ড: কৈলাস পেটকর-ও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
CRTDH- এর সঙ্গে DSIR দলের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার বিষয়টিও অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। পরে কেন্দ্রটির কার্যক্রম নিয়ে একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়।
★স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও আত্মনির্ভরতার ত্রিমুখী মডেল—
অনুষ্ঠানে আলোচনায় উঠে আসে, স্বল্পব্যয়ী প্রযুক্তি, স্থানীয় দক্ষতা উন্নয়ন এবং জনস্বাস্থ্য পরিষেবাকে একসূত্রে গাঁথা গেলে তার সুফল সমাজের একেবারে প্রান্তিক মানুষের কাছেও পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
CRTDH-এর এই উদ্যোগ একই সঙ্গে চিকিৎসা সরঞ্জামে আত্মনির্ভরতা, গ্রামীণ যুবসমাজের দক্ষতা ও কর্মসংস্থান এবং সবার জন্য সমান স্বাস্থ্য পরিষেবা, এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি সমন্বিত মডেল তৈরি করেছে।
অনুষ্ঠানের শেষে DSIR-এর আধিকারিকদের আইআইটি খড়্গপুরের ডিরেক্টরের পক্ষ থেকে সম্মানিত করা হয়। পুরো অনুষ্ঠানটির সমন্বয় করেন CRTDH, IIT Kharagpur-এর প্রজেক্ট ম্যানেজার শ্রী সোহম বন্দ্যোপাধ্যায়।
অনুষ্ঠানে প্রায় ২০০ জন অংশগ্রহণ করেন। তাঁদের মধ্যে DSIR- এর শীর্ষ আধিকারিক, চেম্বার অব কমার্স ও MSME সংগঠনের প্রতিনিধি, সরকারি MSME উন্নয়ন সংস্থার আধিকারিক, MSME, স্টার্ট-আপ ও উদ্ভাবক, ক্লিনিক্যাল অংশীদার, গ্রামীণ স্বাস্থ্যকর্মী এবং আইআইটি খড়গপুরের শিক্ষক, গবেষক ও ছাত্র- ছাত্রীরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে CRTDH-এ উদ্ভাবিত বিভিন্ন প্রযুক্তি এবং সহযোগী উদ্যোগের মাধ্যমে বাণিজ্যিকীকরণ করা পণ্য প্রদর্শন করা হয়। ফলে গবেষক, উদ্ভাবক, শিল্পোদ্যোগী এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সরাসরি মতবিনিময়েরও সুযোগ তৈরি হয়।
গবেষণাগার থেকে বাজার, আর বাজার থেকে গ্রামের মানুষের কাছে আইআইটি খড়্পুরের CRTDH- এর নতুন টেকসই পর্যায় সাশ্রয়ী স্বাস্থ্য প্রযুক্তিকে আরও বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন দিশা দেখাতে চলেছে।

