জয় লাহা, দুর্গাপুর, ৩০ সেপ্টম্বর: প্রবল বৃষ্টির জের। একটানা প্রবল বৃষ্টিপাতে ফুলে উঠেছে দামোদর নদ সহ শিল্পাঞ্চলের অন্যান্য নদী। হু হু করে বাড়ছে দামোদর নদের জলরাশি। জলস্রোতে ভাসল শিল্পাঞ্চল সহ দামোদর তীরবর্তী এলাকা। দুর্গাপুরের একাধিক ওয়ার্ড জলমগ্ন। কাঁকসার সিলামপুর মানাচর, বড়জোড়া মানাচর, সোনাইচন্ডীপুর গ্রাম জলমগ্ন। জলের তলায় একরের পর একর চাষ জমি। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জোর তৎপরতা শুরু করল পশ্চিম বর্ধমান জেলা প্রশাসন।
প্রসঙ্গত, গত দুদিন এক নাগাড়ে বৃষ্টি শুরু হয়েছে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায়। একইসঙ্গে নিম্নচাপের দরুন প্রবল বৃষ্টিপাত হয়েছে শিল্পাঞ্চল আসানসোল, দুর্গাপুর, অন্ডাল, পান্ডবেশ্বরে। বিহার ও ঝাড়খন্ডে। বুধবার রাত থেকে এক প্রকার মেঘভাঙা বৃষ্টি হয়েছে আসানসোল-দুর্গাপুরে। আর তাতেই বন্যা পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে।দুর্গাপুর- ফরিদপুর ব্লকের কালিনগরে মাটির বাড়ি ভেঙ্গে চাপা পড়ে গবাদি পশুর মৃত্যু, পাণ্ডবেশ্বর, অন্ডাল থানা এলাকার বিভিন্ন জায়গা জলমগ্ন। অন্ডাল রেল ব্রিজের নিচে সাবওয়ে জলমগ্ন হওয়ায় মানুষের যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়। বেশির ভাগ জায়গায় জল জমে থাকায় ক্ষোভ এলাকাবাসীদের। নিকাশি নালার ব্যাবস্থা ঠিক না থাকায় জলমগ্ন বলে এলাকাবাসীদের অভিযোগ। দুর্গাপুরের ৪, ৮, ১৩, ৩৪, ৪৩ নং ওয়ার্ড সহ একাধিক এলাকা জলমগ্ন। কাঁকসার সিলামপুর মানাচর, বড়জোড়া মানাচর, সোনাইচন্ডীপুর গ্রাম জলমগ্ন। জলের তলায় একরের পর একর চাষ জমি।

মাইথন ও পাঞ্চেত থেকে জল ছাড়ায় যেমন ফুলে উঠেছে অজয় ও দামোদর। তেমনই শিল্পাঞ্চলজুড়ে প্রবল বৃষ্টিপাতের দরুন, গাড়ুই, খুদিয়া, তামলা নালা সহ একাধিক ছোট নদী নালা ফুলে উঠেছে। তার জেরে হু হু করে জল বাড়তে শুরু করেছে দামোদরে। ফলে আসানসোল ও দুর্গাপুরের একাধিক জায়গা জলমগ্ন। দামোদর তীরবর্তী এলাকা প্লাবিত হতে শুরু করেছে। ডিভিসি সুত্রে জানা গেছে, বুধবার রাতে মাইথন ও পাঞ্চেত জলাধারের উপর ১০৭ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে। মাইথন নিম্ন তীরবর্তী আসানসোল-দুর্গাপুরে ২৫০-৪১২ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে।

ডিভিসি সুত্রে জানা গেছে, প্রবল বৃষ্টিপাতের দরুন জল বাড়ছে মাইথন ও পাঞ্চেত জলাধারে। মাইথন ও পাঞ্চেত জলাধারে ২ লক্ষ ৫০ হাজার কিউসেক রেটে জল ঢুকছে। পাঞ্চেত জলাধারে ৪২৫ ফুট পর্যন্ত জলধারণ ক্ষমতা থাকলেও ৪৩৫ ফুট পর্যন্ত সর্ব্বোচ্চ জল ধরে রাখা যায়। তবে এদিন ঘন্টায় ১ ফুট করে জলস্তর বাড়ছে পাঞ্চেতে। বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত ৪২০ ফুট জল হয়েছে। এদিন দুপুর পর্যন্ত ২৫ হাজার কিউসেক জল ছাড়া হয়েছে পাঞ্চেত থেকে। একই সঙ্গে মাইথন জলাধারে ৪৮৩ ফুট জল রয়েছে জলাধারে। ৪৯০ ফুট পর্যন্ত জলধারণ করতে পারবে মাইথন জলাধারে। এদিন ২৪ হাজার কিউসেক জল ছাড়া হয়েছে মাইথন থেকে।
তারসঙ্গে পাল্লা দিয়ে ওই দুই জলাধারের নিম্নে বেশ কিছু বেনিয়ন্ত্রিত নদী নালা রয়েছে। ওইসব নদীনালার জল দামোদরে মিশছে। সব মিলিয়ে দামোদর ফুলে উঠেছে। ইতিমধ্যে দামোদর উত্তর তীরবর্তি দুর্গাপুর লাগোয়া বাঁকুড়ার সোনাইচন্ডীপুর গ্রাম জলমগ্ন। প্রায় ৩৫ টি পরিবার পার্শ্ববর্তী নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। একইসঙ্গে চাষেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দামোদর চরে প্রায় ১০০ একরের ওপর কৃষিজমি রয়েছে জলমগ্ন। সারা বছরই ওইসব এলাকায় বিভিন্ন রকম ফসলের চাষ হয়। আলু, পেঁয়াজ, মটর, ফুলকপি, বাঁধাকপি ছাড়াও বেগুন পটল, ভুট্টা চাষ হয়। মাসখানেক আগে বাদাম নষ্ট হয়েছে দামোদরের জল ঢুকে। আবারও দামোদরে জল ঢুকে ওইসব এলাকার ফসল জলের তলায়। বেগুন, ভুট্টা, পটল সহ একাধিক সবজি জমি জলমগ্ন।

স্থানীয় চাষি হরেন্দ্রনাথ তালুকদার ও দুলাল মহালি বলেন, “বাদাম চাষ করেছিলাম। জলে বাদাম নষ্ট হয়েছে। এখন ফুলকপি, বাঁধা কপি, করলা, পটল, বেগুন লাগিয়েছিলাম। সেসব জলের তলায়। একেবারে নষ্ট হয়ে যাবে। চরম লোকসানের মুখে। এমনকি ঘরবাড়িতে জল ঢুকে গেছে। আতঙ্কে রয়েছি।”
ডিভিসির (জল বিভাগ) চিপ্ ইঞ্জিনিয়ার সত্যব্রত ব্যানার্জি জানান, “প্রবল বৃষ্টিপাতের দরুন জলরাশি বাড়ছে মাইথন ও পাঞ্চেতে। তেনুঘাট থেকে জল আরও বেশি ছাড়লে কিম্বা নতুন করে বৃষ্টিপাত হলে জলস্তর আরও বাড়বে। তখন জল ছাড়তে হতে পারে। সে বিষয় জানানো হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে। গোটা পরিস্থিতির ওপর নজরদারি রাখা হয়েছে।”
অন্যদিকে মাইথন ও পাঞ্চেত জলাধার থেকে জল ছাড়ার ফলে দামোদরে জল বাড়তে শুরু করেছে। দামোদর নদের ওপর দুর্গাপুর ব্যারেজে জলস্তর বাড়তে শুরু করেছে। রাজ্য সেচ দফতর সুত্রে জানা গেছে, এদিন দুপুর পর্যন্ত দুর্গাপুর ব্যারেজ থেকে রবিবার সকালে ১ লক্ষ ৯৭ হাজার কিউসেক জল ছাড়া হয়েছে। একইসঙ্গে দামোদর নিম্ন তীরবর্তি এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে। কাঁকসার সিলামপুর নদীপাড় ও লাগোয়া মানাচরে প্লাবিত হয়েছে। কসবা মানাচর এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম তৎপরতা শুরু করেছে পশ্চিম বর্ধমান জেলা প্রশাসন। যদিও বড়সড় দুর্ঘটনা এড়াতে প্লাবিত এলাকার গ্রামবাসীদের আগাম উদ্ধার করে পার্শ্ববর্তী স্কুলে রাখার ব্যাবস্থা করেছিল প্রশাসন। দুর্গাপুরের অন্ডাল, কাঁকসা বেশকিছু বাড়ি প্লাবিত হয়েছে।
দুর্গাপুরের মহকুমা শাসক শেখর চৌধুরী জানান, “কাঁকসার সিলামপুর ও তালপোড়া এলাকায় ৪৫ টি পরিবারকে উদ্ধার করে স্থানীয় স্কুলে রাখা হয়েছে। দুর্গাপুর পুরসভা এলাকায় ১৩ নং ওয়ার্ড ১৭০ জন দুর্গতকে উদ্ধার করে স্থানীয় স্কুলে রাখা হয়েছে। প্লাবিত এলাকায় বিপর্যয় মোকাবিলা টিম রয়েছে। পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হয়েছে।”
অন্যদিকে সেচ দফতর সুত্রে জানা গেছে, এদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত দুর্গাপুর ব্যারেজ থেকে ২ লক্ষ ৩১ হাজার ২৪৮ কিউসেক জল ছাড়া হয়েছে।

প্রবল বর্ষনে দুর্গাপুর দামোদর কলোনীতে রাস্তায় ধস নেমেছে। আতঙ্কে বাসিন্দারা।

