মদ কারখানার বর্জ্য জল মিশছে বুদবুদের সেচ ক্যানেলে, দুর্গন্ধে অতিষ্ট স্কুল পড়ুয়া থেকে বাসিন্দারা, ধান চাষের ক্ষতির আশঙ্কায় চাষিরা

জয় লাহা, দুর্গাপুর, ৩১ আগস্ট: ফের সেচ ক্যানেলে মিশছে নোংরা দূষিত জল। দুর্গন্ধে অতিষ্ট মানুষ।
পানাগড় শিল্পতালুকের মদ কারখানার দূষিত জলের প্রভাব এবার বুদবুদ, শুকডাল, তিলডাঙা, ভড়সিন সহ একাধিক গ্রামের চাষাবাদে। আর তাতেই ধান চাষ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় চাষিরা। প্রশাসনের নিরবতায় ক্ষোভে ফুঁসছে এলাকাবাসী।

উল্লেখ্য, পানাগড় শিল্পতালুকে রয়েছে বেসরকারি মদ তৈরীর কারখানা। বছর ছয়েক ধরে ওই কারখানায় উৎপাদন শুরু হয়েছে। উৎপাদন শুরু হতেই মাত্রারিক্ত দুষণে জেরবার আশপাশের কোটা, চন্ডীপুর, নতুনগ্রাম, মাড়ো সহ ১০ টির বেশি গ্রামের বাসিন্দারা। এবার ওই কারখানার নোংরা জলের পচা দুর্গন্ধে অতিষ্ট বুদবুদ এলাকার বাসিন্দারা। কারখানার বর্জ্য জল মিশছে পার্শ্ববর্তী খড়ি নদী ও এমসি-৩ সেচ ক্যানেল সহ বিভিন্ন শাখা ক্যানেলে। বুদবুদের এমসি-থ্রি-সি ক্যানেলে চলে যাচ্ছে এই দূষিত জল।

গত কয়েকদিন ধরে খারিপ চাষের জন্য জল ছাড়া হয়েছে দুর্গাপুর ব্যারেজে। ওই সেচের জলে মিশছে মদ কারখানার বর্জ্য জল। আর গত দুদিন ধরে বুদবুদ, শুকডাল, তিলডাঙা, ভীড়সিন সহ  একাধিক মৌজার চাষ জমিতে পড়ছে ওই জল। একইভাবে তা মিশছে পুকুরে।

বুদবুদে ওই ক্যানেলের পাশে সুকান্ত নগর, রবিতীর্থ পল্লী, উদয়ন পল্লী, আজাদ পল্লী সহ প্রায় হাজার খানেক পরিবারের বসবাস। তার ওপর রয়েছে তিনটি প্রাইমারি ও তিনটি হাইস্কুল। ক্যানেলের দুর্গন্ধ জলে অতিষ্ঠ বাসিন্দারা সহ স্কুল পড়ুয়ারা। চাষজমিতে ওই নোংরা জল পড়ে জমির উর্বরতা নষ্ট করছে। দু- বছর আগে গ্রামবাসীদের ক্ষোভের মুখে দূষিত জল ছাড়া বন্ধ হয়েছিল। বছর ঘুরতেই আবারও কারখানার বর্জ্য নোংরা জল ছাড়া শুরু হয়েছে। তাও আবার সেচ ক্যানেলে। চলতি বছর জলসঙ্কটের মধ্যে কোনো ভাবে ধান চাষ করেছে চাষিরা। তার ওপর দূষিত জলে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় চাষ জমি। 

গলসি-১ নং ব্লক কৃষি দফতর সুত্রে জানা গেছে, চলতি খারিফ মরশুমে প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষ হয়েছে। দূষিত জলে মূলত বুদবুদ, মানকর, মাড়ো, ভিড়সীন, তিলডাঙা মৌজার প্রায় হাজার হেক্টর চাষজমির ধানে প্রভাব পড়বে বলে অশঙ্কা করছে চাষিরা।

আতঙ্কিত চাষিরা জানান, “ধানে কয়েকদিন পর থোড় আসবে। এই সময় যেভাবে দূষিত জল মিশছে, তাতে খরচ করে ধান চাষ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ এই দূষিত জল ছাড়া বন্ধ করুক। না হলে চাষের লোকসান হবে।”

বুদবুদ চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি রতন সাহা জানান, “সেচ ক্যানেলের জলের দুর্গন্ধে বাসিন্দাদের পাশাপাশি স্কুল পড়ুয়াদের সমস্যা বেশী হচ্ছে। ক্যানেলের পাশে রাস্তা দিয়ে পড়ুয়াদের যাতায়াত করতে হয়।”

সম্প্রতি মদ কারখানার দূষনের বিরুদ্ধে গ্রিন ট্রাইবুনালে মামলা দায়ের হয়। তাতে শুনানির পর তদন্তের জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। মামলাকারী সুব্রত মল্লিক জানান, “মদ কারখানার দূষনে বিপন্ন আশপাশের গ্রামবাসীদের জীবন জীবীকা। বর্জ্য জলে চাষাবাদ নষ্ট হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে সেচ ক্যানেল নদী, পুকুর জলাশয়। ইতিমধ্যে মাড়ো গ্রামের বেশ কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ওই কারখানার দূষন নিয়ন্ত্রনে গাফিলাতি রয়েছে। তাই গ্রামবাসীদের সুবিচার দিতে মামলা দায়ের করা হয়েছে।”

বুদবুদ কৃষি বিজ্ঞানকেন্দ্রের বিজ্ঞানী ডঃ সুব্রত সরকার জানান, “ওই ধরনের দুর্গন্ধ টানা দীর্ঘদিন থাকলে মানব শরীরে ক্ষতিকর। এবং দূষিত নোংরা জল পরিবেশের ক্ষতিকর। পরীক্ষা করে দেখতে হবে সেচ ক্যানেলের ওই জলে কি ধরণের দূষিত যৌগ কি পরিমানে রয়েছে।” প্রশ্ন, মদ কারখানার বর্জ্য দূষিত জল সেচ ক্যানেলে কেন ফেলা হচ্ছে? এরকম একটি দূষন সৃষ্টিকারী সংস্থাকে কৃষিপ্রধান এলাকায় কারখানার তৈরীর ছাড়পত্র কিভাবে দেওয়া হল? কেনই বা দূষন দফতর নজরদারি করছে না?

যদিও এবিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ ও দুর্গাপুর দূষণ পর্ষদ কোনো মন্তব্য করতে চায়নি।

গলসি-১ নং ব্লক কৃষি আধিকারিক অরিন্দম দানা জানান, “বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে।”

গলসি-১ পঞ্চায়েত সমিতির সহ সভাপতি অনুপ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “গ্রামবাসীদের লিখিত কোনো অভিযোগ পাইনি। তবুও বিষয়টি খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।” 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *