ঝাঁঝ বাড়ছে শান্ত সুকান্তর গলায়, দাবাং মূর্তি নিলেও যুক্তি ও পরিমাপ করা ভাষায় আক্রমণ শানিয়ে এগোচ্ছেন বঙ্গ বিজেপি সভাপতি

শ্রীরূপা চক্রবর্তী
আমাদের ভারত, ২৮ এপ্রিল:
দেখতে-শুনতে, কথায় বার্তায় নিপাট ভদ্রলোক। সবে সবে চল্লিশ পেরোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপকের কাঁধে বঙ্গ বিজেপির দায়িত্ব। এই দায়িত্ব যখন পেয়েছিলেন, তিনি ছিলেন শান্ত। গলায় তেমন কড়া ঝাঁঝ শোনা যায়নি। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে ততোই দাবাং হয়ে উঠছেন সুকান্ত মজুমদার। কথার ঝাঁজ যে বাড়ছে বোটানির প্রফেসরের, তার একাধিক উদাহরণ পাওয়া যাচ্ছে সম্প্রতি বিভিন্ন ইস্যুতে। পুরুলিয়ায় দলীয় সমাবেশে বিজেপি রাজ্য সভাপতি সম্প্রতি বলেছেন, “তৃণমূলের পাশে পুলিশ না থাকলে ১৫ মিনিটে ওদের ঘরে ঢুকিয়ে দেবো।”

সুকান্তের গলায় এই হুংকার কি শুনতে চাইছে বাঙালি? তাহলে কি তিনি ক্রমেই দাবাং নেতা হয়ে উঠছেন? প্রথম দিকে শান্ত মার্জিত কিন্তু স্পষ্ট বক্তা নেতার ইমেজ ছিল সুকান্তর। কিন্তু সম্প্রতি একাধিক ইস্যুতে শাসক দলের প্রতি সুকান্তের আক্রমণের মাত্রা বাড়তে দেখা গেছে। যেভাবে দিলীপ ঘোষকেও তাঁর মন্তব্যের পাল্টা জবাব দিয়েছেন, তাতে অভিজ্ঞ অথচ কড়া রাজনীতিকের ছাপ ধরা পড়েছে। বিজেপির অন্দরেও বলতে শোনা যাচ্ছে তাহলে কি সুকান্তের গলায় রাজনীতির তাপ অনেকটাই বেড়ে গেল?

অনেকে বলছেন সুকান্ত মজুমদার এবার দিলীপ ঘোষকে অনুসরণ করতে শুরু করেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মত এক্ষেত্রে ভিন্ন। তারা বলেছেন সুকান্তের কথায় ঝাঁঝ বাড়লেও তিনি কখনোই দিলীপ ঘোষকে অনুসরণ করেননি‌। কারণ তিনি পুরুলিয়ায় গিয়ে বলেছেন, পুলিশ না থাকলে তৃণমূলকে ঘরে ঢুকিয়ে দেবো। মেরে ধরে ঘরে ঢোকাবো, এমনটা তিনি বলেননি। তিনি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার কথা বলেছেন। যা কিনা পরিণত রাজনীতিবিদরাই বলে থাকেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে তাঁর এই ইমেজ অবশ্য নতুন কিছু নয়। সভাপতি হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর এই লড়াকু ইমেজ দেখা গিয়েছিল। ভোটের পর দক্ষিণ ২৪ পরগনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন এক বিজেপি নেতা। পরে তিনি মারা যান। পুলিশের সঙ্গে লুকোচুরি খেলে তাঁর দেহ নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির কাছে। পরে সেখানে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি।

সুকান্ত মজুমদার একজন অধ্যাপক। গবেষণা শেষ করে ডক্টরেট সুকান্ত মজুমদার গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতে করতেই লোকসভা নির্বাচনের প্রার্থী। আর প্রথমবারেই নির্বাচিত হয়ে যান সাংসদ হিসেবে। ছোটবেলা থেকেই আরএসএস-এর সঙ্গে যুক্ত হলেও রাজনীতিক হিসেবে তেমন পরিচিতি ছিল না। কিন্তু ২০১৯ এ নির্বাচিত হবার কয়েক মাস পরেই তাঁর কার্যকলাপ নজর কাড়ে আরএসএস ও বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের। ফলে ২০২০ থেকেই তাকে বড় দায়িত্বে আনার চিন্তা ভাবনা শুরু হয়ে যায়। সেই কারণেই বিধানসভার ব্রিগেড মঞ্চে তাকে সভা পরিচালনা করতে দেখা গিয়েছিল‌। নির্বাচনের সময় থেকেই তাঁকে জেলায় জেলায় ঘুরতে দেখা গিয়েছিল।

কিন্তু সুকান্তকে যে সময় দায়িত্বে আনা হয় সেই সময়ে দলের মনোবল একেবারে তলানিতে। একুশের নির্বাচনের ধরাশায়ী হয়েছে দল। জেলায় জেলায় চলছে রাজনৈতিক সংঘাত। এই রকম কঠিন পরিস্থিতিতে বালুরঘাটের সাংসদকে বঙ্গ বিজেপির দায়িত্বে আনা হয়। কিন্তু তিনি যে অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ প্রথম থেকেই তা তার কার্যকলাপে ফুটে উঠছে।

তাই মনোবল ভেঙে পড়া দলকে টেনে তুলতে ঠিক যেটা দরকার সেই লড়াই শুরু করেছেন সুকান্ত মজুমদার। প্রথম থেকেই তাকে তার অভিজ্ঞতা কম বলে দলের বিভিন্ন নেতা থেকে কর্মীরা সরব হয়েছেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে বলা কোনও কথাই নীরবে হজম করেননি সুকান্ত মজুমদার। পরিপাটি ভাষায়, তথ্য ও যুক্তি দিয়ে স্পষ্ট জবাব দিয়ে বুঝিয়েছেন তিনি যোগ্য। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, বঙ্গ বিজেপিতে প্রথম থেকেই কেউ অভিজ্ঞ ছিলেন না। সময়ের সাথে সবাই অভিজ্ঞ হয়েছেন।

তাই নিপাট সাদামাটা শান্ত সুকান্তর গলায় রাজনীতির ঝাঁজ দেখে অনেকেই বলতে বাধ্য হচ্ছেন এই সুকান্ত আগের সুকান্ত নয়। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই দলীয় কোন্দল এবং দলীয় নেতৃত্বের একাংশের নানা বাধাকে অতিক্রম করতে হচ্ছে সুকান্তকে। প্রথম দিকে অনেকটা শান্ত গলায় কথা বললেও এখন সপাটে জবাব দেন বঙ্গ বিজেপি সভাপতি। নেতা হোক বা কর্মী সকলকেই মনে করিয়ে দেন দলের শৃঙ্খলা কথা।

আবার রাজ্যের শাসকদলের বিরুদ্ধেও জোরদার লড়াই করেছেন সুকান্ত। পুলিশের জলকামানের সামনে বসে পড়ে জোর গলায় বলেছেন, পুলিশ ভয় পাচ্ছে আমাদের। বাম কংগ্রেসের মিছিলকে থামানো হয় না কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপিকে ভয় পান তাই তাদের মিছিলকে থামানো হয়। স্কুলের শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির একাধিক তথ্য ফাঁসের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। এরপর পুরুলিয়ায় পুলিশকে নিয়ে ওই মন্তব্য।

এটা যে তাঁর নিছক হুঙ্কার তা অবশ্য মনে করছে না রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। কারণ, গত পুরনির্বাচনে বালুরঘাটে তাঁর দাবাং ইমেজ দেখা গিয়েছিল। বুথের সামনে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের জড়ো হওয়া নিয়ে পুলিশ কর্তাদের সঙ্গে তাঁকে বচসায় জড়িয়ে পড়তে দেখা গিয়েছিল। শুধু তাই নয়, তাঁর নিরাপত্তা রক্ষীদের পিছনে ফেলে বুথের সামনে জড়ো হওয়া তৃণমূল নেতাকর্মীদের তিনি তাড়া করেছিলেন।

তাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি তিনি দিলীপ ঘোষকে মোটেই অনুসরণ করছেন না, বরং সুকান্ত মজুমদার ধীরে ধীরে সময়ের সঙ্গে তাঁর আক্রমণের ঝাঁঝ বাড়াচ্ছেন। তাঁর বক্তব্য ঝাঁঝালো হয়েছে কিন্তু শালীনতার মাত্রা ছাড়ায়নি। জনসভা থেকে দলের কর্মীদের কিভাবে চাঙ্গা করতে হয় সেটাই করছেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *