নন্দীগ্রামে দলনেত্রী মমতার প্রচারে জোর তৎপরতা তৃণমূলের

জে মাহাতো, আমাদের ভারত, নন্দীগ্রাম, ৬ মার্চ: এবারের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্য রাজনীতির সবচেয়ে চর্চিত কেন্দ্র নন্দীগ্রাম। সেখানে হাইভোল্টেজ তৃণমূল প্রার্থী দলনেত্রী মমতা ব্যানার্জি স্বয়ং এবং তার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বিজেপির হয়ে মাঠে নামছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরই একসময়ের বিশ্বস্ত সৈনিক শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রামে হেভিওয়েট ভোট যুদ্ধের প্রস্তুতি ইতিমধ্যে শুরু করে দিয়েছে তৃণমূল।
নন্দীগ্রামজুড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হয়ে চলছে জমজমাট ভোট প্রচার। দেওয়ালে দেওয়ালে ‘আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জোড়া ফুল চিহ্নে ভোট দিন’ লেখায় ছয়লাপ। পতাকা, ফেস্টুনে মুড়ে ফেলা হয়েছে গোটা নন্দীগ্রাম। গতবার তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুভেন্দু অধিকারীকে নন্দীগ্রাম থেকে প্রার্থী করেছিলেন। নন্দীগ্রাম থেকে নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন শুভেন্দু। কিন্তু সেসব এখন অতীত, মমতার একদা বিশ্বস্ত সৈনিক শুভেন্দু অধিকারী এখন রাজ্যে তৃণমূলকে পরাজিত করার মূল কান্ডারি হিসেবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তাই এবার আর কাউকে দায়িত্ব না দিয়ে নেত্রী নিজেই নন্দীগ্রাম থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

প্রথম দফাতেই (১লা এপ্রিল) নন্দীগ্রামে ভোট গ্রহণ করা হবে। নন্দীগ্রামের প্রেস্টিজ ফাইটে তাই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থনে ভোট প্রচার চালাচ্ছেন তৃণমূল নেতা কর্মীরা। পুরো বিধানসভা এলাকাজুড়ে ঘাসফুল চিহ্ন এঁকে দলনেত্রীকে জয়যুক্ত করার আর্জি। ইতিমধ্যে দলের শীর্ষ নেতৃত্বরা বেশ কয়েকবার নন্দীগ্রামে এসে স্থানীয় নেতৃত্বদের সঙ্গে বৈঠক করে গিয়েছেন। দফায় দফায় এসেছেন দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সি। দলনেত্রীকে জেতাতে প্রচারের কৌশল বেঁধে দিয়ে গেছেন তিনি। রাজ্য নেতৃত্বের নির্দেশমতো কর্মী সমর্থকরা ময়দানে নেমে পড়েছেন। নন্দীগ্রামে তৃণমূল নেত্রীকে শুভেন্দু অধিকারীর পঞ্চাশ হাজার ভোটে হারানোর সদর্প ঘোষণার পর পূর্ব মেদিনীপুর জেলা তৃণমূল নেতৃত্বের পাশাপাশি রাজ্য নেতৃত্ব যেভাবে নন্দীগ্রাম থেকে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জেতানোর জন্য কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন তেমনি গোটা রাজ্যবাসী এখন তাকিয়ে নন্দীগ্রামের দিকে। সব মিলিয়ে নন্দীগ্রামের লড়াই তৃণমূলের কাছে প্রেস্টিজ ফাইট হয়ে ওঠায় শনিবার নন্দীগ্রামে এসে মমতার নামে পুজো দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী দোলা সেন। পাশাপাশি নন্দীগ্রাম ব্লকে তিনটি কর্মীসভা করেছেন। সব মিলিয়ে মনোবল বাড়াতে যেমন তৎপর রাজ্য নেতৃত্বরা তেমনি প্রচারে জোর দিয়েছেন স্থানীয় নেতা কর্মীরা। নিজেদের জেলায় মমতা প্রার্থী হওয়ায় খুশি নন্দীগ্রাম তথা জেলাবাসী।

ইতিমধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ দেওয়াল লিখনের কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে। প্রায় প্রত্যেক দিন মিটিং মিছিল চলছে।  মুখ্যমন্ত্রীর জন্য নন্দীগ্রাম-২ ব্লকের রেয়াপাড়াতে ৪ কক্ষের একটি বাড়ি অফিস হিসেবে ভাড়া নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ৭ কক্ষের একটি বাড়ি নন্দীগ্রাম-১ ব্লকের বটতলাতে ভাড়া নেওয়ার কথা চলছে। বিজেপির প্রার্থী ঘোষণার আগে অনেকটাই নিজেদের মাঠ তৈরি করে ফেলতে চাইছে তৃণমূল। জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের কো- অর্ডিনেটর শেখ সুফিয়ান বলেন, “নন্দীগ্রামে আমরা নিজেদের পুরোপুরি গুছিয়ে রেখেছিলাম। তাই ভোটের জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুত হতে সময় লাগেনি। আগে থেকে প্রার্থীর নাম ঘোষণা হয়ে যাওয়ায় দেওয়াল লিখনের কাজ প্রায় শেষের পথে। ভোট প্রচারের জন্য ঠাসা কর্মসূচি রয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার করা হবে। কর্মিসভাও শুরু হয়েছে। নন্দীগ্রামে প্রচারে কোনও খামতি রাখা হবে না। শুধু জয় নয় এবার আমাদের টার্গেট ব্যাপক ব্যবধানও। প্রসঙ্গত, নন্দীগ্রামকে লাকি জায়গা বলে উল্লেখ করেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন তিনি নন্দীগ্রাম থেকে লড়তে চান। নন্দীগ্রাম থেকেই লড়তে প্রস্তুত মমতা ব্যানার্জি। সেই জায়গা থেকে শুভেন্দু অধিকারী সাম্প্রতিক সভাতেও সাফ জানিয়েছেন, নন্দীগ্রামে তারা মমতাকে ৫০ হাজার ভোটে হারাবেন। এমন এক হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে নন্দীগ্রামে দিদির সম্ভাব্য যুদ্ধের কন্ট্রোল রুম তৈরি করতে ব্যস্ত তৃণমূল নেতৃত্ব।

সূত্রের খবর, নন্দীগ্রাম-১ ব্লকের বটতলায় ৭ কক্ষের একটি বাড়ি দেখা হয়েছে। প্রাক্তন সেনা কর্মীর এই বাড়ি তৃণমূল সম্ভবত ভাড়া নিচ্ছে। তবে স্থানীয় এক ইংরেজি শিক্ষকের ছিমছাম সবুজ ঢাকা বাড়িতে সম্ভবত থাকতে চলেছেন মমতা। এছাড়াও ৪ কক্ষের একটি বাড়ি নন্দীগ্রাম-২ ব্লকের রেয়াপাড়াতে ভাড়া নেওয়া হয়েছে। কলকাতা থেকে আসা নেতাদের জন্য নন্দীগ্রামে একাধিক বাড়ি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলেও জানা গিয়েছে।

জানা গিয়েছে, নন্দীগ্রামে মুখ্যমন্ত্রীর জন্য যে বাড়ি ভাড়া নেওয়া হয়েছে, তা ইতিমধ্যেই পর্যবেক্ষণ করে গিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিত্বরা। জানা গিয়েছে, মমতার জন্য যে বাড়ি দেখা হয়েছে, সেটিতে এক শিক্ষক, তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলে থাকেন। বেসরকারি সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, বাড়ির আশপাশে ফুল, ফলের বাগান যেমন রয়েছে, তেমনই বাড়ির পিছনে রয়েছে ধানের ক্ষেত। সূত্রে খবর, ১১ মার্চ হলদিয়া মহকুমা শাসকের দপ্তরে মনোনয়ন পত্র জমা দেবেন মমতা ব্যানার্জি। তার জন্য ১০ মার্চ নন্দীগ্রাম চলে আসবেন তিনি। ওই দিন নন্দীগ্রামের একাধিক মন্দিরে পুজো দেবেন তিনি। মনোনয়ন দিতে যাওয়ার পথে পুজো দেবেন রেয়াপাড়া শিব মন্দিরে। তারপরই ঝাঁপিয়ে পড়বেন প্রচারে। তৃণমূল সূত্রে খবর, ১০ মার্চ নেত্রীর সঙ্গেই নন্দীগ্রাম চলে আসবেন সাংসদ দোলা সেন ও মন্ত্রী পূর্ণেন্দু বসু। মমতা ব্যানার্জিকে নিয়ে দলীয় প্রস্তুতি তুঙ্গে, নেতৃত্বের প্রার্থীপদ প্রকাশের পর থেকে কার্যত উৎসবের পরিবেশ শুরু হয়েছে নন্দীগ্রামজুড়ে। তৃণমূল নেতা-কর্মীরা নব উদ্যমে লেগে পড়েছেন প্রচারে। বিজেপির প্রার্থী হিসেবে নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারী কিংবা অন্য কে দাঁড়াবেন তা ভাবছেন না তৃণমূল কর্মীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *