অশোক সেনগুপ্ত, আমাদের ভারত, ১৪ ডিসেম্বর: সীমান্ত এলাকায় পাচারের বিষয়টি বিভিন্ন মহলে দুশ্চিন্তা তৈরি করেছে। সম্প্রতি এ রকমই একটি বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি রাজাশেখর মান্থা। সব শোনার পর তিনি নির্দেশ দেন, অবিলম্বে এই বিষয়ে কেন্দ্রকে হস্তক্ষেপ করতে হবে। তারা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা এক সপ্তাহের মধ্যে জানাতে হবে আদালতকে। একই সঙ্গে ওই কিশোরীকে এ দেশে ফেরত পাঠাতে এবং পরিচর্যার জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসের কাছেও অনুরোধ জানিয়েছে
হাইকোর্ট।
কী হয়েছিল বিষয়টি? প্রথমে প্রেম, তারপর পাচার। নদিয়ার এক কিশোরীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে তাকে পাচারের অভিযোগ ওঠে বাংলাদেশের এক যুবকের বিরুদ্ধে। তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, অভিযুক্ত ওই যুবক বেআইনি ভাবে ভারতে এসে নদিয়া জেলার একটি কারখানায় কাজ করতেন। সেখান থেকেই নারীপাচারের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি।
পুলিশ আদালতে জানায়, নদিয়ার কোতোয়ালির একটি কারখানায় বাংলাদেশের কয়েক জন যুবক কাজ করতেন। তাঁদের মধ্যে মিলন হোসেন নামে ২৪ বছরের এক যুবকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয় ওই এলাকারই ১৫ বছরের এক কিশোরীর। মেয়েটি স্কুলে পড়ে। মা পরিচারিকার কাজ করেন। মায়ের অজান্তেই বাংলাদেশের ওই যুবকের সঙ্গে গোপন ভাবে চলত ওই কিশোরীর প্রেম-পর্ব। গত ২৩ জুন হঠাৎ ওই কিশোরী নিখোঁজ হয়ে যায়। খুঁজে না পেয়ে কোতোয়ালি থানায় এফআইআর দায়ের করে তার পরিবার। এর পরেই তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, মিলনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল মেয়েটির। সেই সূত্রেই মিলনের এক বন্ধুকে তারা গ্রেফতার করে। তার পরেই উঠে আসে একের পর এক চমকপ্রদ ঘটনা। ওই বন্ধু মারফৎ পুলিশ জানতে পারে, কিশোরীকে বাংলাদেশে পাচার করা হয়েছে।
প্রায়শই ঘটছে এ রকম ঘটনা। মাঝে মাঝে প্রচারমাধ্যমে আসছে তার কিছু নমুনা। হিন্দু জাগরণ মঞ্চের প্রাক্তন প্রান্ত সম্পর্ক প্রমুখ ডঃ রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রতিবেদককে জানান, “মুসলিম ধর্মের অনুশাসন অনুযায়ী কোনও মুসলিমের সাথে অমুসলিমের বিবাহ নিষিদ্ধ এবং কোনও ইসলামের অবিশ্বাসী ব্যক্তিকে ইসলামের পথে নিয়ে আসা অত্যন্ত পবিত্র কাজ। মুখ্যত এই দুটি বিষয়ের উপর ভিত্তি করেই “লাভ জিহাদ “এর পরিকল্পনা রচিত হয়েছে। যে কোনও ভাবে অমুসলিম মেয়েদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে ধর্মান্তরকরণ করানো এবং নিকাহ্ করাকেই আমরা লাভ জিহাদ বলি। উত্তর প্রদেশে এই প্রবণতা আটকাতে আইন প্রণয়নের প্রথম মাসেই ঊনপঞ্চাশ জন মুসলিম যুবককে আটক করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও বারো থেকে পনেরো হাজার হিন্দু মেয়ে প্রতি বছর এই ফাঁদে ইসলাম কবুল করছে। কেরালায় আর্চ বিশপ খ্রিস্টান মেয়েদের বাঁচাতে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আইন প্রণয়নের আবেদন করেছেন। শ্রীলঙ্কা ও মায়ানমারের বৌদ্ধ ধর্মগুরুরা অনেক আগেই এই বিষয়ে সোচ্চার হয়েছেন। আপাতদৃষ্টিতে যাকে বিক্ষিপ্ত ঘটনা বলে মনে হয়, কাছ থেকে দেখলে সেগুলোর পিছনেই একটি বড়সড় ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই প্রবণতা রোধ করতে হলে তিনটি বিষয়ে নজর দিতে হবে। শুধু মাত্র এফিডেভিট করে সহজেই ধর্ম পরিবর্তন করার পদ্ধতি বাতিল করা, মেয়েদের বিয়ের বয়স নূন্যতম একুশ করা এবং ‘পকসো’ আইনের উর্ধতম বয়সসীমা দুই বছর বৃদ্ধি করা— এই তিনটি মহৌষধ অত্যন্ত উপযোগী।“
কলকাতা হাইকোর্টের বরিষ্ঠ অ্যাডভোকেট সুস্মিতা সাহা দত্ত জানান, বিগত আড়াই দশকেরও বেশি কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী অথবা নানা জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে আইনের পরামর্শ দিই। একটি বিশেষ বিষয় নজরে এসেছে যা অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে মনে হচ্ছে। কয়েক বছর ধরে একটি আমার কাছে বেশ কিছু বিশেষ বিষয়ের মামলা এসেছে যার আইনগত ভিত্তি না থাকলেও সামাজিক ভিত্তি অত্যন্ত সংবেদনশীল। নদীয়া, হুগলি, দুই চব্বিশ পরগনা জেলা থেকে হিন্দু বাবা-মায়েরা আসছেন মেয়ে নিখোঁজের অভিযোগ দায়ের করতে।
একান্ত আলাপচারিতায় জানা যাচ্ছে যে, তাদের মেয়েরা আঠারো বছর বয়স পার হওয়া মাত্রই ধর্ম পরিবর্তন করে মুসলিম সম্প্রদায়ের ছেলেদের বিবাহ করছে। পুলিশ যথারীতি অপহরণের অভিযোগ নিয়ে মেয়েদের উদ্ধার করে নিম্ন আদালতে গোপন জবানবন্দি করাচ্ছে এবং মেয়েরা স্ব- ইচ্ছায় পুনরায় তাদের প্রেমিকের ঘরে চলে যাচ্ছে। আইনের চোখে বা সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার ঠদায়ে এর বেশি কিছু করা নিম্ন আদালতের বা পুলিশের হাতে নেই। সামান্য কিছুটা হলেও মহামান্য হাইকোর্টের আছে।ফলে মামলা হয়। সামান্য দুই একটি বিশেষ ক্ষেত্রে মেয়ে তার বাবা মায়ের কাছে ফিরেও আসে।
এমনই একটি সুন্দরী ও ইংরেজি অনার্সের ছাত্রীকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম যে “তুমি কি জেনেশুনে বা ইসলাম ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে স্বধর্ম ত্যাগ করেছিলে?” সে আমাকে জবাব দিতে গিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে বলে, অমুক অমুক মুসলিম নায়কদের সবাই একাধিক হিন্দু মেয়েকে বিবাহ করেছে। তারা যদি না বোঝে তবে আমি কিভাবে বুঝবো? অর্থাৎ সমস্যাটির শিকড় কিন্তু অনেক গভীরে যা শুধু মাত্র একটি আইন প্রণয়ন করে বন্ধ করা অসম্ভব।“
তেহট্ট আদালতের আইনজীবী অর্পিতা বিশ্বাস জানান, “বছর দুই ধরে হিন্দু মেয়েদের যারা প্রায় সকলেই সদ্য ইস্কুলের গন্ডি পেরিয়েছে বা কলেজে পড়ছে, তারা গোপনে আমাদের কাছে এসে এফিডেভিট করে ধর্ম পরিবর্তন করছে। স্বাধীন ভারতে যে কোনও সাবালিকা ধর্ম পরিবর্তন করতেই পারেন। কিন্তু প্রবণতা যথেষ্টই একমুখী। কয়েকজন ভালো কাজের বা আর্থিক সহায়তা লাভের আশায় হিন্দু থেকে খ্রিস্টান হচ্ছেন। কিন্তু অধিকাংশই হিন্দু মেয়ে শুধুমাত্র ভালোবাসার টানে (ইসলাম ধর্মের প্রতি নয় ,বরং মুসলিম ছেলেটির প্রতি) না বুঝেই ইসলাম ধর্ম নিচ্ছে। জোর দিয়ে বলা চলে, এতে একটি সামাজিক সংকট তৈরি করতে বাধ্য হবে।“
কেবল পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে নয়, নারী পাচারকারীরা সক্রিয় গোটা সীমান্ত এলাকায়। কিছুকাল আগে উত্তর পূর্বাঞ্চলের ১৪ জন যুবতীকে নারীপাচারকারী এক চক্র সৌদি আরবে বিক্রি করার চাঞ্চল্যকর সংবাদ সামনে আসে। এই দুষ্কার্যে জড়িত রুমানা বেগমকে ত্রিপুরা থেকে লখনউ যাবার পথে উত্তর প্রদেশ পুলিশ গ্রেফতার করে। বিক্রির লক্ষ্যে এক যুবতীকে নিয়ে যাচ্ছিল রুমানা। জেরায় রুমানা স্বীকার করে, নারী সে উত্তর পূর্ব এবং দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে মেয়ে পাচার করে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে। উল্লেখ্য, সৌদি আরবে বিক্রি করা ১৪ জন যুবতীর মধ্যে সাত জনই ছিল ত্রিপুরার। আর বাকি সাত জন উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্যের। মধ্য প্রাচ্যে ২০,০০০ টাকা মাইনের চাকরি দেওয়ার লোভ দেখিয়ে উদ্ধার করা যুবতীকে রুমানা ত্রিপুরা থেকে নিয়ে যাচ্ছিল। যুবতীদের এভাবেই ঠকিয়ে সৌদি আরবে নিয়ে গিয়ে তাদের পাসপোর্ট, ভিসা কেড়ে শারীরিক ও মানসিক ভাবে প্রচণ্ড নির্যাতন চালিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয় বলে পুলিশ সূত্রে খবর পাওয়া যায়।

