‘ভাষা কেড়ে নেওয়া চিন্তাশীলতা কেড়ে নেওয়ার সামিল’

আমাদের ভারত, কলকাতা, ২২ ফেব্রুয়ারি: অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে? মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসের আলোচনায় এই প্রশ্ন রাখলেন সাহিত্যের অধ্যাপক অমিত দে। তাঁর মন্তব্য, “ভয় করে। আমরা নিজের ভাষার প্রতি ভীষণ অমনোযোগী। উচ্চারণেও যত্ন নেই।“ তিনি বলেন, ভাষা সচেতন করে মানুষকে। ভাষা কেড়ে নেওয়া চিন্তাশীলতা কেড়ে নেওয়ার সামিল।

মানভূমের ভাষা আন্দোলন ও ১৯৬১-র ১৯ মে শিলচরের ১১ ভাষা শহিদদের স্মরণের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়া শ্রীরামপুর কল্যাণ সমিতির আলোচনাসভায় তিনি তাঁর বক্তব্য শুরু করেন। বলেন, ইএম বাইপাস দিয়ে যেতে গিয়ে কিছুকাল আগে রাস্তার পাশে উপর্যুপরি এমন দুটো হোর্ডিং দেখি, যার ভাষা আমাকে বিস্মিত করেছিল। “বাংলা ভাষার খাসতালুকে বসে এরকম দুঃসাহস! ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে ভাষার জোর কতটা হতে পারে।“

অধ্যাপক দে-র কথায়, ভাষার নির্দিষ্ট ছাঁদ বলে কিছু হতে পারে না। কেবল রাজ্য ভেদে নয়, একই রাজ্যের জেলা ভেদেও বদলে যায় উচ্চারণ। এ প্রসঙ্গে দক্ষিণ ২৪ পরগণা, মুর্শিদাবাদের বিশেষ বাচনভঙ্গীর উল্লেখ করেন তিনি। এক প্রজন্মেও বদলে যায় মাতৃভাষার অনেক শব্দের উচ্চারণ বা ব্যবহার।

সাংবাদিক অশোক সেনগুপ্ত * পশ্চিমী দেশগুলোয় মাতৃভাষার প্রভাব, * জাতীয় শিক্ষানীতিতে মাতৃভাষা, * বাংলার অর্থনৈতিক দুর্বলতাতেই কি গুরুত্ব হারালো বাংলা ভাষা, * বাংলা ভাষা কি শেষের সেদিন গুনছে, * বাংলা ভাষায় আমরা-ওরা, * বাংলা ভাষার মানোন্নয়নে সংবাদমাধ্যমের ব্যর্থতা— প্রভৃতি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেন। বর্তমান বাংলার অবস্থার পরিচয় দিতে পড়ে শোনান ছড়াকার ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের বিখ্যাত কবিতার প্রথম পংক্তি।

আলোচনায় অশোকবাবু বলেন, “আমরা নিজেরাও কি বাংলা ভাষাকে প্রসারিত এবং শক্তিশালী করার ব্যাপারে আদৌ আগ্রহী? সাধারণ মানুষের মুখের এবং লেখার ভাষায় ভীষণভাবে অন্য ভাষার মিশ্রণ। এমনকি বাংলা বিভিন্ন পোর্টালেও অনেক পরিচিত শব্দের বদলে ব্যবহৃত হচ্ছে ইংরেজি শব্দ। সাক্ষাৎকার, চিকিৎসক প্রভৃতি অজস্র শব্দ হারিয়ে যাচ্ছে। পরিবর্তে ইন্টারভিউ, ডাক্তার বলতে, লিখতেই আমরা বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করি। এই মাত্রাতিরিক্ত অব্যবহারে কি ধীরে ধীরে অনেক শব্দ আমরা হারিয়ে ফেলব না?

অধ্যাপক দে বলেন, অনেক আর্বি-ফার্সি-ইংরেজি শব্দ বাংলা শব্দভাণ্ডারে মিশে গিয়েছে। এগুলো ব্যবহারে ততটা গেল গেল রব না তুললেও হয়। তবে, যেসব আর্বি শব্দ আমরা গ্রহণ করিনি সেগুলো না বলাই বাঞ্ছনীয়। অপ্রয়োজনে বিদেশী ভাষা ব্যবহার নয়। কথায় কথায় সংযোগকারী শব্দ হিসাবে ‘বাট’-এর মত ইংরেজি কথা কেন? পড়ুয়াদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম মেডিসিনাল প্লান্টের বাংলা। ক্লাশের মাত্র একজন বলতে পেরেছিল।

অনুষ্ঠানের সঞ্চালিকা রূপা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, যথেষ্ঠ সচেতনতার অভাবে বহু ভাষা আমরা হারিয়ে ফেলেছি। অধ্যাপক দে বলেন, “কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, মাতৃভাষা হারিয়ে গেলে কী আসে যায়? অনেক পরিবারের সদস্য তো নিজেদের মধ্যে ইংরেজিতে কথা বলেন। তাঁদের কি খুব অসুবিধে হচ্ছে? কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, ভাষার মধ্যে শতাব্দীব্যাপী জ্ঞান, বোধ, সামাজিক ইতিহাস লুকিয়ে থাকে। রূপকথা কি আমাদের জীবনের অংশ নয়? নিজস্ব ঐতিহ্য নয়? এলাটিন বেলাটিন শৈল কিসের খবর আইল……..!!” চোখের সামনে ভেসে ওঠে না এক্কা দোক্কা খেলা, সোনালী দিন গুলোর কথা?”

অশোকবাবু বলেন, ভারতের মত বহু ভাষাভাষির দেশ গোটা বিশ্বে সম্ভবত নেই। সাংবাদিকতার সুবাদে দীর্ঘকাল জার্মানিতে কাটিয়ে আসা অশোকবাবু চিন এবং ইওরোপের নানা দেশের ভাষাবৈচিত্র্যের সঙ্গে ভারতের ভাষাবৈচিত্র্যের তুলনা করেন। অধ্যাপক দে-ও জানান, একমাত্র রাশিয়াতেই বহু ভাষার অস্তিত্ব ছিল। কেবল উত্তরপূূর্ব ভারতেই ৮০০-র ওপর বিভিন্ন রকম ভাষা, উপভাষা রয়েছে।

বাংলা ভাষার অর্থনৈতিক গুরুত্ব না বাড়লে এই ভাষায় নবীন প্রজন্মকে আকর্ষিত করা যাবে না বলে অশোকবাবু এবং অধ্যাপক দে দুজনেই একমত হন। অশোকবাবু এ ব্যাপারে প্রাক্তন উপাচার্য ডঃ অচিন্ত্য বিশ্বাস, আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় (আইএএস) প্রমুখের উক্তি-সহ ভাষার প্রয়োগে রাজভাষার গুরুত্বের কথা বলেন। অতীতে বিভিন্ন সময়ে কীভাবে সংস্কৃত, ফার্সির গুরুত্ব বদলে গিয়েছে, সেই নজীরও টানেন অশোকবাবু। অধ্যাপক দে স্পষ্টতই বলেন, “আমরা যদি দেখি বাংলা ভাষা আমাদের খাওয়াবে, পড়াবে তবেই এই ভাষার প্রতি আকর্ষণ তৈরি হবে। বাঁচাটা তো আগে! খালি পেটে কি ভাষাপ্রীতি জাগবে?

তাহলে ভাষা বাঁচানোর পথটা কোথায়? অশোকবাবুর অনুযোগ, “বছরের এই একটা দিনে যত শোক উথলে ওঠে। সামাজিক মাধ্যমের দেওয়াল সকাল থেকেই ভরে উঠেছে যাবতীয় মন্তব্য, পরামর্শে। অথচ, সারা বছর আমরা প্রায় কেউই আন্তরিকভাবে বাংলা ভাষার যত্ন করি না। সম্মিলিত, সামগ্রিক, আন্তরিক সদিচ্ছা না থাকলে ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখা শক্ত।“ অধ্যাপক দে বলেন, আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব আছে মাতৃভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার। পারিপার্শ্বিকের প্রতি বেঁচে থাকার সামান্যতম দায়িত্ব পালন করতে গেলে আমাকে আমার ভাষা বাঁচাতে হবে। আসুন না, বছরের অন্তত একটা দিন আমরা সব কথা বাংলায় ভাবি, বাংলায় বলি! রূপা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “কতটা বলবেন, কী বলবেন, আপনারাই সেটা বিচার করবেন।“

বাংলা ভাষার বিভিন্ন আন্দোলনে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের স্মৃতির প্রতি এদিনের আলোচনার শুরুতে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক অশোক কর্মকার। এদিন অনুষ্ঠানে স্বরচিত দুটি কবিতাপাঠ করেন কবি কালীদাস আচার্য। কবিতাপাঠ করেন সমাবেশে নবীনতম বিহান ভট্টাচার্য, প্রবীন বিশ্বনাথ সাহা, ত্রিদিব পাইক। ত্রিদিববাবু শোনান কবি অচিন্ত্য সেনগুপ্তর ‘ছন্নছাড়া’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *