অনেক প্রশ্ন তুলে দিল এবারের পদ্ম-পুরস্কার

অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, কলকাতা, ২৭ জানুয়ারি: এক লপ্তে পশ্চিমবঙ্গে তিন জনের পদ্ম-পুরস্কার গ্রহণে অস্বীকৃতি। অনেক প্রশ্ন তুলে দিল এই ঘটনা। আমজনতার একটা বড় অংশ ক্ষুব্ধ, অপমানিত কেন্দ্রের স্বীকৃতি দেওয়ার নামে এই আচরণে। মতামত জানতে যোগাযোগ করেছিলাম কয়েকজন বিশিষ্টর সঙ্গে। 

বিকাশ ভট্টাচার্য
— সাংসদ, সর্বভারতীয় সভাপতি- অল ইন্ডিয়া লইয়ার্স ইউনিয়ন। 

বুদ্ধদা এই পুরস্কার না নিয়ে ঠিক করেছেন। নেওয়া উচিতও ছিল না। দুটি কারণ। প্রথমত, যে সরকার মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করে, মানুষের মধ্যে ধর্মীয় বিভাজন তৈরি করে, তাদের স্বীকৃতি না নেওয়াই ভাল। দ্বিতীয়ত, কল্যাণ সিংকে দেওয়া হয়েছে ‘পদ্মবিভুষণ’। যাঁর বিরুদ্ধে বাবরি মসজিদ ভাঙার মূল অভিযোগ ছিল। আর বুদ্ধদাকে ‘পদ্মভুষণ’?

সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এবং অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ও পদ্মশ্রী না নিয়ে ঠিক করেছেন। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে পদ্মশ্রী? এটা তো ভাবাই যায়না। পুরস্কারদাতাদের এত দুঃসাহ বা ঔদ্ধত্য হয় কী করে? আসলে দিল্লিতে বাঙালির এই ভাবমূর্তি তৈরির জন্য দায়ী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শেষ মুহূর্তে হিন্দিতে ফোন করে জিজ্ঞাসা করবে, আপনি পুরস্কার নেবেন কিনা? কোনও আগাম পরিকল্পনা নেই। পদ্ম-পুরস্কারকে একটা হাস্যকর জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। 
***

“পশ্চিমবঙ্গের কারও কিছু যাবে-আসবে না”

তথাগত রায়
— প্রাক্তন রাজ্যপাল

প্রথমত আমি মনে করি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে এই পুরস্কার দেওয়ার কোনও যুক্তি নেই। উনি ১২ বছর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী থাকলেও কোনও উল্লেখযোগ্য কাজ করতে পারেননি। শিল্প আনার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত তা সামলাতে পারেননি। ওঁর দলের লোকেরা তাপসী মালিককে খুন করে। নন্দীগ্রামে নিরস্ত্র লোকের ওপর পুলিশ দলের হুকুমে গুলি চালায়। এ রকম একজন নেতা পুরস্কার নেবেন না, তাতে কার রাতের ঘুম নষ্ট হচ্ছে?

সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এবং অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের পুরস্কার নেওয়ায় অস্বীকৃতি সম্পর্কে আমার মত, দ্বিতীয় জনের নাম ক’জন শুনেছেন জানি না। তিনিও পদ্মশ্রী নিতে চান না? সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় নিশ্চয়ই গুনী শিল্পী। কিন্তু তিনিও একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন। ওনার এবং যাঁরা গেল গেল রব তোলার চেষ্টা করছেন, তাঁদের মনে রাখতে হবে ওনার কীর্তি একটা রাজ্যে সীমাবদ্ধ। উনি লতা মঙ্গেশকরের মত বিভিন্ন ভাষায়, অগণিত নানা ধরণের গান করার নজীর তৈরি করতে পারেননি। আসলে এভাবে প্রত্যাখ্যান করাটা সস্তা চমক দেওয়ার চেষ্টার নামান্তর। এক ধরণের কমিউনিস্টসুলভ মানসিকতা। নয়নতারা সেহগলের মত কিছু মানুষ আছেন যাঁরা পুরস্কার ফেরৎ দিয়ে নাম করেছেন। ‘অ্যাওয়ার্ড ওয়াপসি গ্যাং’ নামে ওঁরা পরিচিত। তিনজনের পদ্ম-পুরস্কার প্রত্যাখ্যানে পশ্চিমবঙ্গের কারও কিছু যাবে-আসবে না। 
***

“বিজেপি বাঙালির সংস্কৃতির কোনও খবর রাখে না“

কৌশিক সেন
— নাট্যকার, অভিনেতা

পদ্ম-পুরস্কার নেওয়ার ব্যাপারে বু্দ্ধদেববাবুর অস্বীকৃতির একটা রাজনৈতিক কারণ আছে। সেটা সিপিএম মনে করতেই পারে। পুরস্কারদাতারা আগে থেকে সে ব্যাপারে নিশ্চিত না হয়েই ঘোষণা করে দিলেন? সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এবং অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় কোনওভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। ওঁদের এভাবে শেষ মুহূর্তে দায়সাড়া স্বীকৃতি দিতে কেন্দ্রকে কে বলেছিল? সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মত বর্ষীয়ান, গুনী শিল্পী প্রকাশ্যে এ ব্যাপারে যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, তার ১৬ আনা যুক্তি আছে। এভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা বাস্তবে অস্বীকৃতির নামান্তর। তাঁর এই বোধটা যে কারও কাছেই যুক্তির বলে মনে হবে। পুরস্কার না নিয়ে দু’জনই ঠিক কাজ করেছেন। সব কিছুর একটা ডেকোরাম থাকে। কেন্দ্রের এই আচরণ তো চপেটাঘাতের মত। আসলে বিজেপি বাঙালির সংস্কৃতির কোনও খবর রাখে না। অনুভব করার চেষ্টাও করে না। মুখে বললেও একটা প্রচন্ড ভাষাবিদ্বেষ ওঁদের মধ্যে কাজ করে। যে কারণে ওঁরা এ রাজ্যে কোনওভাবে দাঁত বসাতে পারছেন না। এক লপ্তে তিনজনের পদ্ম-পুরস্কার প্রত্যাখ্যানে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মনোভাব বিজেপি-র আরও বিরুদ্ধে যাবে। 

***
“এই প্রত্যাখ্যান বিতর্কের জন্ম দিতে পারে“

ডঃ পঙ্কজ কুমার রায়
— অধ্যক্ষ, যোগেশচন্দ্র চৌধুরী কলেজ

রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে পদ্মভূষণ সন্মানে ভূষিত করলেন নরেন্দ্র মোদী সরকার। কেন্দ্রীয় সরকার বা রাজ্য সরকার কোন দলের নয়। প্রধানমন্ত্রী সহ সমস্ত মন্ত্রী পরিষদকে সংবিধানের ১৬৯ ধারা অনুসারে এই শপথ গ্রহণ করতে হয় “I will devote my self to the service and wellbeing of the people of India”. আমাদের দেশে অস্পৃশ্যতা একটি সামাজিক ব্যাধি ঠিক , তেমনই রাজনৈতিক অস্পৃশ্যতা সংবিধান বিরোধী একটি ব্যাধি। এই আলোকে পদ্মভূষণ বা পদ্মশ্রী প্রত্যাখ্যান বিতর্কের জন্ম দিতে পারে কিন্তু সৌজন্যের অপ্রতুলতা দেখা যায়। পুরস্কার গ্রহণে এই অস্বীকৃতি আদৌ পশ্চিমবঙ্গে মোদী-র ভাবমূর্তি ম্লান করবে বলে মনে করি না। 
***

“এই কেন্দ্রীয় সরকার নির্লজ্জ নয় তদুপরি বেহায়া’’

কবীর সুমন 
— শিল্পী

গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ভারতরত্ন পাওয়া উচিৎ। যে ভারত সরকার গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে পদ্মশ্রী দেওয়ার ধৃষ্টতা দেখালো আমি কবীর সুমন, তাদের জুতো পেটা করতে চাই। আমার প্রথম প্রতিক্রিয়া এটাই। আমার এ মন্তব্য শোনার পর কেউ গ্রেপ্তার করতে পারেন। মানহানির মামলা করতে পারেন। তাতে আমি বিন্দুমাত্র ভয় পাচ্ছি না। বাংলার সন্তান আমি। নিজেকে বাঙালি বলতে গর্ব বোধ করি। গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় সারা বিশ্বের বাঙালির গর্ব। তাঁকে ছোট করে বাঙালিকে হেয় করলো এই সরকার। রাম শ্যাম যদু মধু পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ। আর গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় স্রেফ পদ্মশ্রী? এই কেন্দ্রীয় সরকার নির্লজ্জ নয় তদুপরি বেহায়া’।

বিদ্বেষ থেকে পদ্মশ্রী দেওয়া হয়েছে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে। শ্বেতাঙ্গরা অন্তত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নোবেল পুরস্কারটা দিয়েছিলেন। সেখানে তাঁরা অন্য কিছু বিচার করেননি। এই কলকাতা শহরে দুই জন বসে আছেন যাঁরা পদ্মভূষণ পেয়েছেন। তাঁদের কেরিয়ারটা দেখুন। আর সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কেরিয়ারটা দেখুন। এই বয়সে এসে ধাক্কা খেলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়।”
***

“এটা নিয়ে আমি চর্চায় যেতে রাজি নই”
–কালীপদ সোরেন,
সাঁওতালি লেখক, এবারের ‘পদ্মশ্রী’

শেষ মুহূর্তে আমন্ত্রণের জন্য প্রত্যাখ্যানের বলে যে অভিযোগ উঠছে, সেটা তো আমার মত অধিকাংশ পদ্ম-প্রাপকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আর যোগ্যতার ব্যাপারটা তো আপেক্ষিক। যাঁরা প্রত্যাখ্যান করেছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই যশস্বী। নিজের ভাবনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমার ভাবনার সঙ্গে তা না-ও মিলতে পারে। আবার যাঁরা স্বীকৃতি দিতে চাইছিলেন, তাঁরা কাউকে অপমান করার জন্য প্রাপকদের কাছে আবেদন করেছেন, তাও নয়। এই যে বিষয়টা নিয়ে এত হইচই, এর পিছনে অন্য কারণ থাকতে পারে। এটা নিয়ে আমি চর্চায় যেতে রাজি নই।
***

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *