এ–ও আরও এক গুজরাটির গপ্প

ড. রাজলক্ষ্মী বসু

আমাদের ভারত, ২৮ ফেব্রুয়ারি: এ মাসেতো ২৯ তারিখ নেই তাই ২৮ তারিখেই জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি রইল ভারতের প্রথম অ-কংগ্রেসী প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইকে। কিন্তু তার আগেও রয়ে গেছে তাঁর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন। তাঁর ছিল সুগভীর প্রসাশনিক দক্ষতা। ১৯৪০ এর পূর্বে দীর্ঘ দশ দশটি বছর তিনি অবিভক্ত গুজরাটের ডেপুটি কালেক্টর পদের দায়িত্ব সামলেছিলেন। কাটিয়েছিলেন বন্দীদশা- ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময়। ১৯৪৬এর বিধানসভা নির্বাচনে তিনি তৎকালীন বোম্বের স্বরাষ্ট্র এবং রাজস্ব মন্ত্রীত্ব অদ্ভুত দক্ষতার সাথে পালন করেন। আমরা অনেকেই হয়তো ভুলে গিয়েছিলাম মোরারজি দেশাই ১৯৫২-৫৬ তৎকালীন বোম্বে স্টেটের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে যখন গুজরাট এবং মহারাষ্ট্র পৃথক রাজ্যের রূপ নেয় তখন তাঁর কর্মক্ষেত্র হয় দিল্লি এবং তিনি নেহেরু ক্যাবিনেটের অর্থমন্ত্রী হন ( ১৯৫৮-৬৩)। মোরারজি দেশাই বরাবরই চেয়েছিলেন অর্থনৈতিক বিষয় পরিচালিত হোক এক স্বয়ংসম্পূর্ণ পদ্ধতিতে যেখানে রাজনীতিকরণ যেন কোনও ভাবেই না হয়। পরবর্তী সময়ে নেহেরুর প্রয়াণের পর যখন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী প্রধানমন্ত্রী হন তখন মোরারজি দিশাই “Syndicate” শব্দটির অনুপ্রবেশ রাজনীতিতে আনেন, বোধহয় সেই শাস্তি হিসেবেই উনাকে তথাকথিত তাবড় পরিবারতন্ত্রপ্রেমী কংগ্রেসী নেতৃত্ব শাস্ত্রীজির ক্যাবিনেটে ঠাঁই দেননি। শাস্ত্রী মহাশয়ের রহস্যজনক মৃত্যু হলে যথারীতি পরিবারতন্ত্রকে হাতিয়ার করে ইন্দিরা গান্ধী হলেন প্রধানমন্ত্রী। অভিজ্ঞতা যোগ্যতা এবং দলের প্রতি আনুগত্যে মোরারজি দেশাই তাঁর প্রাপ্য সব সম্মান না পেলেও তাঁকে ফাইনান্স পোর্টফোলিও পুণরায় দেওয়া হয়।

এর পরেই শুরু হয় অন্তর্দ্বন্ধ। সেই সময় চন্দ্রশেখর গঠন করেছিলেন “জিঞ্জার গ্রুপ” – যারা নানান বিষয়ে ইন্দিরা গান্ধীকে পরামর্শ দিতেন। ব্যাঙ্কের রাষ্ট্রায়ত্তকরণ ছিল ওদের মস্তিষ্কপ্রসূত যা ইন্দিরা গান্ধীর হাতে সিলমোহর পায়। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জোরালো আপত্তি তুলেছিলেন মোরারজি দেশাই। ১৯৬৯ এ তিনি ইন্দিরা ক্যাবিনেট ত্যাগ করেন। তারপরের প্রতিক্রিয়া সবাই জানি। জরুরী অবস্থা, মোরারজি দেশাই এর কারাবাস। জরুরী অবস্থার পর ইন্দিরা কংগ্রেসের শোচনীয় পরাজয় এবং জনতা পার্টির দ্বারা গঠিত সরকার- মোরারজি দেশাই প্রধানমন্ত্রী। যদিও সেবারেও যে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না এমনটা বলা ভুল। জগজীবন রাম খুব চাইলেও, সত্যি এই যে তিনি জরুরী অবস্থার বড্ড শেষের দিকে (২ রা ফেব্রুয়ারি ১৯৭৭) ইন্দিরা কংগ্রেস ত্যাগ করেন। প্রতিযোগিতায় ছিলেন চরণ সিং- ও। মোরারজি দেশাই এর শেষ রক্ষা হয়েছিল আচার্য কৃপালনির ফলে কারণ এই তিনজনের মধ্যে কে হবেন প্রথম অ- কংগ্রেসী প্রধানমন্ত্রী তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তিনিই নেন।

মোরারজি দেশাই সবকিছুর বেসরকারিকরণের বিরোধী ছিলেন। অর্থাৎ সোস্যালিস্ট সোসাইটি যে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত রাষ্ট্রকে উপকৃত করতে পারে না তার আন্দাজ বোধহয় তিনি করেছিলেন। কিন্তু বিদেশি সংস্থা এবং দেশীয় সংস্হার মেল বন্ধনের জোরালো কোনো পলিসি সত্যিই তাঁর আমলে তৈরি হয়নি। এবং আইবিএম, কোকা কোলা কে এদেশ থেকে তখনকার মতো বিদায় করলে বিদেশী বিনিয়োগের পথ বন্ধুর হয়। ওনার প্রধানমন্ত্রীত্বকালে দু’ দুজন ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার ছিলেন। তাঁরা আর কেউই নন- খুব সহজ হিসেবে চরণ সিং এবং জগজীবন রাম। চরণ সিং এর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ রাজ নারায়ণ আবার মনে করতেন মোরারজি দেশাই এর অর্থনীতি নগর কেন্দ্রীক। এই সব টানাপোড়েনের মাঝে জগজীবন রাম চুপটি করে ছিলেন আর বোধহয় প্রহর গুনতেন যদি প্রধানমন্ত্রীত্ব পাওয়া যায়। মোরারজি দেশাই প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি স্বাধীনতা দিবসের দিন লাল কেল্লা থেকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি সমাজ থেকে জাতপাত ভেদাভেদ মুছে দেবেন। সব সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনিই মুক্ত ভাবে বলেছিলেন।

মোরারজি দেশাই এর ক্যাবিনেট ভারতের ইতিহাসে এক বর্ণময় অধ্যায়। যেখানে দুজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী– সর্দার বল্লাভ ভাই প্যাটেল এবং চরণ সিং, জগজীবন রাম প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, ট্রেড ইউনিয়ন প্রেমী জর্জ ফারনানডেজ শিল্প মন্ত্রী অখিল দলের প্রকাশ সিং বাদল ছিলেন কৃষি মন্ত্রী। মধু দন্ডাবতে (বাম আর্দশে বিশ্বাসী) ছিলেন রেল মন্ত্রী এবং পুরনো কংগ্রেস নেতা মোহন ধারিয়া হন পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী। সম্ভবত বেশ কিছু বাম মনোভাবাপন্ন অর্থনীতি বিশারদ মোরারজি দেশাই এর আমলে ওতঃপ্রোত ভাবে জড়িত থাকার কারণেই হয়তো অর্থনীতির তেমন কোনো উল্লেখযোগাযোগ্য পরিবর্তন তিনি ঘটাতে পারেননি। যদিও বেশ উল্লেখযোগ্য উন্নতি এবং পরিবর্তন রেল ব্যবস্থায় আসে। তবে একথা স্বীকার করতেই হবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে মোরারজি দেশাই আদর্শগত ভাবে আপসহীন ছিলেন। তাই প্রথম নোটবন্দি তাঁর আমলেই হয়েছিল। তাতে নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক ভাবে ঋণাত্মক প্রভাব পড়েছিল কিন্তু কিছু শুরুর শুরু সাহস করে তা করাতেইতো ইতিহাস তৈরি হয়। পথপ্রদর্শক যে সবসময় সফল হবেন এমন তো কোথাও লেখা নেই। বরং তাঁরা অসফল হন বলেই পরবর্তী পদক্ষেপে পরবর্তীরা নব আঙ্গিকে পদক্ষেপ করেন।

রাজনীতির চর্চায় আমরা প্রায়ই বলি মন্ডল কমিশন ভি পি সিং গঠন করেছিলেন। কিন্তু পথ প্রস্তুত যে মোরারজি দেশাই করেছিলেন তা আমাদের অনক সময়ই স্মৃতিবিস্মৃত হয়ে যায়। ১ লা জানুয়ারি ১৯৭৯- মোরারজি দেশাই বিপি মন্ডলকে নিয়োগ করেন সমাজের অনগ্রসর শ্রেণির চিহ্নিতকরণের উদ্দেশ্যে এবং তিনিই বলেছিলেন সকল সরকারি ক্ষেত্রে তফশিলি জাতি এবং উপজাতিদের যথাক্রমে ১৫ এবং ৭ শতাংশ সংরক্ষণ যেন হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে জনতা পার্টি পড়ে যায় কিন্তু স্বাধীনতার প্রায় দীর্ঘ ৩৫ বছর পর অনগ্রসর শ্রেণির প্রকৃত উন্নতির দিশা দেখিয়েছেন মোরারজি দেশাই। ইতিহাস মনে রেখেছে শাহ কমিশন। যা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও ঝড় তুলেছিল। হয়তো মোরারজি দেশাই এর জন্যই মনে রাখতে হবে তৎকালীন সিবিআই আধিকারিক লক্ষ্মীনারায়ণের কথা। যিনি ইন্দিরা গান্ধী কে গ্রেফতার করতে তাঁর গৃহে যান। যদিও তা পরবর্তীতে রাজনীতির ক্ষেত্রে উল্টো প্রভাব ফেলেছিল। কিন্তু একথা অস্বীকারের কোনও উপায় নেই যে ইন্দিরা গান্ধী এবং জরুরী অবস্থার পর মোরারজি দেশাই যেন দেশকে দ্বিতীয় স্বাধীনতা উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু শাহ কমিশন গঠনের সময় যে দলীয় কোন্দল হয় তা মোরারজি দেশাই সামলাতে পারেননি। চরণ সিং এবং তাঁর “ম্যান ফ্রাইডে” রাজ নারায়ণ দুজনকেই তিনি বহিষ্কার করেন। তথাপিও তৎকালীন তথ্য সম্প্রচার মন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী এবং লালকৃষ্ণ আদবানির তৎপরতায় পুণরায় চরণ সিং ক্যাবিনেটে ফেরেন। কিন্তু রাজ নারায়ণকে ফেরানো যায় লনি। তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে সঞ্জয় গান্ধীর সাথে যোগাযোগ করেন। ঘটে আরো এক বিপদ- জোটে থাকা জনসঙঘের সদস্যদের রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের সদস্যতা বর্জনের শর্ত দেন পুরনো কংগ্রেসের দীনেশ সিং, যা জনসঙ্ঘ সমর্থন করেনা এবং জনতা পার্টি ত্যাগ করে ভারতীয় জনতা পার্টির জন্ম দেয়।

জনসঙ্ঘের থেকে ভারতীয় জনতা পার্টি সৃষ্টির মূলেও পরোক্ষভাবে জনতা পার্টির ঋণাত্মক প্রভাবটাই কাজ করেছিল। সে জন্য মোরারজি দেশাই এবং জনতা পার্টির পুরনো ইতিহাস একটুতো ধন্যবাদ পাবেই। মোরারজি দেশাই ঠিক ভুলে ভরা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। কিন্তু একথা অস্বীকার করলে চলবে না কাউকে না কাউকে পরিবর্তনের দায়িত্ব নিতেই হয়। জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে যে টোটাল রেভেলিউশনের আহ্বান উঠেছিল সেই ভাবকে রূপে পরিণত করেছিলেন মোরারজি দেশাই। যারা রাজনীতিতে হাতেখড়ি করি তারাও যেন ওনার উক্তিকে প্রণিধান করি।
Life at anytime can become difficult. Life at anytime can become easy. It all depends upon how one adjusts oneself to life.
একথার তাৎপর্য বোঝার মনন যেন আমরা গড়তে পারি। আদর্শগত তফাত থাকতেই পারে কিন্তু এই মন্তব্য শাশ্বত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *