হিজড়াদের ‘জুলুম’ বন্ধ হোক, চায় তাদের কল্যাণ সংস্থা

অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, ৫ এপ্রিল: হিজড়াদের ‘জুলুম’ নিয়ে অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। এই জুলুম বন্ধের ব্যাপারে পুলিশ-প্রশাসনকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আবেদন করল হিজড়াদেরই কল্যাণ সংস্থা।

বিভিন্ন বাড়ি থেকে সদ্যোজাতের পরিবারের কাছ থেকে জোর করে হিজড়াদের অর্থ আদায়ের অভিযোগ আসে মাঝেমাঝেই। ভূক্তভোগীদের বক্তব্য, এ ব্যাপারে পুলিশি সহায়তা চেয়েও পাওয়া যায়না। পুলিশ আপোষে মিটিয়ে নিতে বলে। রবিবার জগদ্দলের পূর্বাশা এলাকায় হিজরাদের দু’দলের মধ্যে মারপিট হয়। এর পর সোমবার শিয়ালদা দক্ষিণ শাখায় ট্রেনে এক যুবক ও তাঁর বোনকে বেধড়ক মারধর করে একদল হিজড়া। এ দুই ঘটনাতেই উত্তেজনা দেখা দেয়।

অ্যাসোসিয়েশন অফ ট্রান্সজেন্ডার/হিজড়া ইন বেঙ্গল’-এর সম্পাদক, ‘গোখেল রোড বন্ধন’-এর প্রকল্প অধিকর্তা রঞ্জিতা সিনহা এই প্রতিবেদককে বলেন, “এটা খুবই দুঃখ ও লজ্জাজনক ঘটনা। এভাবে দিনের পর দিন এদের অত্যাচার বেড়েই চলেছে। আমার মনে হয়, পুলিশ-প্রশাসনের এ ব্যাপারে আরও সক্রিয় হতে হবে। আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া দরকার এদের বিরুদ্ধে। পশ্চিমবঙ্গ ট্রান্সজেন্ডার বোর্ড এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে না। ওই পর্ষদে হিজড়াদের প্রতিনিধি আছেন। কেন সরব হচ্ছেন না? পশ্চিমবঙ্গ সরকারই বা কী ভূমিকা নেয়, সেটা দেখার।“

প্রসঙ্গত, রবিবার জগদ্দলের পূর্বাশা এলাকায় তৃতীয় লিঙ্গের দু’দলের মধ্যে ব্যাপক মারপিট হয়। একটি গোষ্ঠীর অভিযোগ, ওদের পাতাখোড় এসে টাকা চায় আমাদের কাছে। না দিলে মারধর, ভাঙচুর করে।
সোমবার করণজলি থেকে ফেরার পথে শিয়ালদা দক্ষিণ শাখার সুভাষ গ্রাম ও সোনারপুর স্টেশনের মধ্যে ট্রেনে হিজড়াদের হামলায় গুরুতর জখম হয়েছেন সুজন হালদার ও তাঁর দিদি স্নেহলতা হালদার। ট্রেনে একদল বৃহন্নলা ট্রেনে ওঠে। অভিযোগ, অন্যান্য যাত্রীদের মত তাঁদের কাছেও বৃহন্নলাদের দল টাকা চায়। সামান্য কিছু টাকা দিলে তাঁরা তা নিতে অস্বীকার করেন। পাল্টা অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন। এই ঘটনার প্রতিবাদ করলে, ওই যুবককে বেধড়ক মারধর করতে শুরু করে ওই বৃহন্নলাদের দলটি। ভাইকে মার খেতে দেখে দিদি এগিয়ে এলে, তাঁকেও বেধড়ক মারধর করা হয়।

ট্রেনে উঠে হিজড়াদের দুর্ব্যবহারে নাকাল হয়েছেন বিভিন্ন ধরনের মানুষ। আবাল বৃদ্ধ বনিতা কাউকে ছাড়ে না হিজড়ারা। চাঁদা না পেলে শুরু করে জুলুম, অশালীন আচরণ বা কুরুচিপূর্ণ দৈহিক ভঙ্গিমা। বহু আগে থেকেই অভিযোগ ছিল। তাই বারবার আরপিএফ বিভিন্ন রকম তল্লাশি করে হিজড়াদের গ্রেফতার করে। ২০১৯ সালে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রক সূত্রে তথ্য জানার অধিকার (আর টি আই)-এর এক রিপোর্টে জানানো হয়, ২০১৫ সাল থেকে সে বছর জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ৭৩,৮৩৭ জন হিজড়াকে গ্রেফতার করে আর পি এফ। এর মধ্যে ২০১৫ সালে মোট ১৩ হাজার ৫৪৬ জন, ২০১৬ সালে ১৯ হাজার ৮০০ জন, ২০১৭ সালে ১৮ হাজার ৫২৬ এবং ২০১৮ সালে ২০ হাজার ৫৬৬ জন হিজড়াকে গ্রেফতার করেছে রেল দফতর। রিপোর্ট অনুযায়ী সে বছরের জানুয়ারি মাসে ১,৩৯৯ জন হিজড়াকে গ্রেফতার হয়।

এসইউসি-র পরিচালনমন্ডলীর সদস্য তথা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ তরুণ নস্কর একসময় রেলযাত্রীদের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হয়েছিলেন। মঙ্গলবার এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, “এটা একটা নৃশংস ঘটনা। বৃহন্নলারা আগে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে এই অত্যাচার করত। এখন রাস্তায়, ট্রেনে যাত্রীদের উপর তাই করছে। এর বিরুদ্ধে পুলিশী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করছি। এর সাথে সাথে সরকারের কাছে এই বিশেষ গোষ্ঠীর মানুষদের বেঁচে থাকার সুব্যবস্থা করার দাবি করছি। এঁদের জীবিকার ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে। নতুবা বাঁচার তাগিদে এমন কাজই তাঁরা করতে থাকবেন।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *