শান্তনু সিংহ
আমাদের ভারত, কলকাতা, ২৪ অক্টোবর: শুভ বিজয়া। অসুর বধ হয়ে গেছে। মন্ডপে মন্ডপে মহিলারা সিঁদুর খেলায মেতেছেন। মা দুর্গা চলে যাচ্ছেন তাঁর কর্তব্য সমাপ্ত করে। একদিকে আনন্দ, যে অসুর বধ করে সত্যের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন মা দুর্গা, অন্যদিকে হাহাকার, মা দুর্গা চলে যাচ্ছেন। কিছুটা ভয়; মা দুর্গা চলে যাওয়ার পর আবার অসুররা স্বমূর্তি ধারণ করে সভ্যতাকে আক্রমণ করবে না তো?
আমরা মানুষ। অমানুষ হয়ে যাইনি। তাই মনের কোথাও যেন একটু হলেও দুঃখ থাকে, অসুরকে মা দুর্গা এই ভাবে মারলেন! দশ হাতে অস্ত্র নিয়ে! যদি অসুরটা একটু ভালো হতো, যদি মানবিক গুণ থাকতো, যদি অন্যায় না করতো, যদি আসুরিক শক্তি প্রয়োগ না করতো, যদি সভ্যতাকে ধ্বংস করতে না চাইতো, যদি না মনে করতো, অসুররা রাজত্ব করবে, সভ্য মানুষকে মেনে নিতে হবে তাদের আসুরিক চিন্তাভাবনা এবং ক্ষমতার দম্ভ। তাহলে তো আর অসুরকে বধ করতে হোত না। আমরা সুরাসুর মিলে একসাথে আনন্দে মেতে উঠতে পারতাম, নামটা অসুর হোক না কেন। একসাথে জয়ধ্বনি দিতাম – সত্যের জয় হোক। অন্যায় ধ্বংস হোক।

আমরা অমানুষ হয়ে যাইনি, মানুষ আছি এবং হিন্দু মানুষ, তাই গাজায় ফিলিস্তিনি মুসলমানদের ওপর ইসরাইলের এই ধ্বংসযজ্ঞ মেনে নিতে মন চায় না। বুকের ভেতরে কেমন যেন একটা ব্যথা অনুভব করি। মনের দিক থেকে কেমন যেন দুর্বল হয়ে পড়ি। তাই ফিলিস্তিনি মুসলমানদের শান্তনা দেই, তোমরা কেঁদো না, হতাশ হয়ো না, আল্লাহ সবই দেখছেন, অতএব মহান আল্লাহ তোমাদের সাথেও আছেন। আলহামদুলিল্লাহ।

কিন্তু তার পরেই যখন দেখি, ৭ই অক্টোবর ফিলিস্তিনি মুসলমানরা ইসরাইলে ঢুকে হাজার নিরীহ পুরুষ, মহিলা, শিশুকে হত্যা করেছে, যাদের মধ্যে বিদেশীরাও আছে এবং মহিলাদের গনিমতের মাল হিসেবে ধর্ষণ করেছে এবং লুট করে নিয়ে গেছে (যা সোশ্যাল মিডিয়াতে ইতিমধ্যেই ভাইরাল হয়ে গেছে) এবং ফিলিস্তিনি মুসলমানদের এই নারকীয় অত্যাচারকে মুসলমানরা ঊর্ধ্ববাহু হয়ে সমর্থন করেছে, আনন্দে মাতোয়ারা হচ্ছে, তখন যেন মনটা কেমন শক্ত হয়ে ওঠে। কলকাতা, নোয়াখালী, করাচি, কাশ্মীর বাংলাদেশ– সব কেমন যেন চোখের উপর ভেসে ওঠে।

আজকে ফিলিস্তিনে মুসলমানদের জন্য কান্নার অনেক লোক আছে। কিন্তু হিন্দুদের জন্য কান্নার লোক তখনও ছিল না বা এখনো নেই। গত ২০২১– এ শুধুমাত্র দুর্গাপূজা করবার অপরাধে বাংলাদেশে সাতজন হিন্দু বাঙালিকে প্রাণ দিতে হয়েছে, অসংখ্য আহত, মহিলার সম্মানহানি, আর মন্দির ও প্যান্ডেল ভাঙ্গা সীমাহীন। বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্য কান্না করার কোনও মানুষ এই দেশে খুঁজে পাওয়া যায়নি বা যায় না, পৃথিবীতে তো নয়ই।

৭ই অক্টোবর মুসলমান ফিলিস্তিনিদের আক্রমণে ইসরাইলের সাধারণ মানুষের হত্যাযজ্ঞ হওয়ার পর ৮ই অক্টোবর গণশক্তিতে বের হওয়া খবরটাই ভারতবর্ষের কমিউনিস্টদের ভূমিকা সম্পর্কে চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এরপর ইসরাইলের প্রতিশোধ নেওয়া দেখে ৯ এবং ১০ অক্টোবর গণশক্তির খবরগুলো দেখুন।

বাংলাদেশের মুসলমানরা “ভারত- ইসরাইল” নিপাত যাক বলে মিছিল বের করছে ঢাকা শহরে এবং অন্যান্য শহরে। এই মুসলমানরা কিন্তু একবারের জন্য দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেনি, তাদেরই প্রতিবেশী, তাদেরই বন্ধু, তাদেরই ক্লাসমেট, যে হিন্দুরা প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের মুসলমানদের অত্যাচারের শিকার, তাদের সুরক্ষা, তাদের নিরাপত্তা, তাদের সম্মানের জন্য বাংলাদেশের মুসলমানদের ভূমিকা কী?

সোশ্যাল মিডিয়াতে যুদ্ধের প্রচুর ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ভাইরাল হয়েছে বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদের। কোনও জায়গায় শুনেছেন “প্যালেস্টাইন জিন্দাবাদ” বা “ফিলিস্তিনি মানুষ জিন্দাবাদ”? ঘুরে ফিরে এসেছে “আল্লাহু আকবর”, “নারায়ে তাকবীর”। ভারতবর্ষ বা বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা ইংল্যান্ড, কানাডায় বা সিরিয়া – “একই নাড়া, একই চিৎকার : আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার।”
একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, প্রথমে ইসরাইলে গণহত্যা চালানোর জন্য ফিলিস্তিনি মুসলমানদের বাহবা দিচ্ছে আর এক ফিলিস্তিনি মুসলমান– “আল্লাহ আকবার” ধ্বনি দিয়ে। আর তারপরেই যখন ইসরাইলের প্রতিশোধ, তখন তার কান্নার বন্যা।
(নিচের ভিডিও দেখুন।)
ভারতবর্ষের কমিউনিস্টদের ভূমিকা এবং পৃথিবীর মুসলমানদের মানসিকতা নিয়ে সম্পর্কে সচেতন হতে হবে, সচেতন করতে হবে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বাঙালিকে। নতুবা আগামী দিনে দুর্গাপূজা মণ্ডপে রাষ্ট্র থেকে নিরাপত্তা কর্মী ধার নিতে হবে, যেমন বাংলাদেশে হচ্ছে। এখনই মালদহে মুসলমানরা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে ডেপুটেশন দিয়েছে আজানের সময় যেন হিন্দু প্যান্ডেলগুলোতে মন্ত্র উচ্চারণ না করা হয়।

তবুও যদি চোখ না খোলে তবে বাঙালি হিন্দুর অন্ধকার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই।
আমি সচেতন ভাবেই হামাস কথাটা ব্যবহার করলাম না, কারণ হামাস আর মুসলমান একই সত্ত্বা। হামাস একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন, কিন্তু আপামর মুসলমানদের সমর্থন ছাড়া হামাসের অস্তিত্ব থাকতে পারে না এবং হামাস যদি শুধু একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হয়, তাহলে সারা পৃথিবীর মুসলমানরা এবং কমিউনিস্টরা হামাসকে সমর্থন করতে পারে না।

আর বাস্তব কথাটা বলি, যদি দেশভাগের সময় ভারতবর্ষের জনবিনিময় হতো এবং আজকে ভারতবর্ষে একজনও মুসলমান না থাকত, তাহলে ঐক্যবদ্ধ, সঙ্গবদ্ধ মুসলমান ভোটের স্বার্থে কংগ্রেস বা কমিউনিস্টরা এই ইসলামিক সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করত কি না প্রশ্ন, সেটা হামাস হোক বা হিজবুল্লাহ কিংবা হুতি। ঐক্যবদ্ধ সংঘবদ্ধ হিন্দু ভোট নেই বলেই কাশ্মীর থেকে কেরল, পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ; হিন্দুদের জন্য কমিউনিস্ট, কংগ্রেসের চোখের জল পড়ে না।
( লেখক শান্তনু সিংহ একজন আইনজীবী এবং হিন্দু সংহতির সভাপতি। তাঁর এই বক্তব্য একেবারেই তাঁর নিজস্ব, এর সঙ্গে আমাদের ভারতের কোনও সম্পর্ক নেই।)

