স্নেহাশীষ মুখার্জি, আমাদের ভারত, নদিয়া, ৮ মে: তদন্তের নামে গ্রাম শুদ্ধু মানুষকে হেনস্থা করার অভিযোগ উঠল সিবিআই এর বিরুদ্ধে। শান্তিপুর থানায় এই অভিযোগ জানালেন গ্রামের শতাধিক মহিলা। ঘটনাটি নদিয়ার শান্তিপুর ব্লকের নবলা পঞ্চায়েতের প্রমোদ পল্লী এলাকার।
ঘটনা সুত্রে জানা গেছে, এই এলাকার প্রাক্তন তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্য প্রদীপ সরকার গতবছর ২৭ জুলাই খুন হন। প্রদীপ সরকারের বস্তাবন্দি দেহ উদ্ধার হয়েছিল রানাঘাট ব্লকের রামনগর পঞ্চায়েতের দোয়ারপাড় এলাকায়। গত বিধানসভা ভোটের আগে প্রদীপ সরকার তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগদান করেছিলেন। তিনি বিজেপিতে যোগদান করেছিলেন বলেই শাসক দলের হাতে তাকে খুন হতে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছিল। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে তৃণমূল।
এরপর নিহত প্রদীপ সরকারের স্ত্রী গ্রামের ৬ জনের নামে শান্তিপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। ভোট-পরবর্তী হিংসা হিসেবে হাইকোর্টের নির্দেশসানুসারে তার তদন্তে নামে সিবিআই। গত বৃহস্পতিবার সকালে সিবিআইয়ের একটা তদন্তকারী দল ফুলিয়ার প্রমোদপল্লীতে আসে। সেখানে তারা অভিযুক্তের বাড়িতে যায়। বাড়ি তালা বন্ধ থাকায় স্থানীয় পঞ্চায়েতের প্রধান সুদীপ প্রামাণিকের উপস্থিতিতে তালা ভেঙ্গে তল্লাশি চালায় সিবিআই এর তদন্তকারী দল। সেই থেকে এলাকার ছেলেরা ঘর ছাড়া। গতকাল সিবিআই এর বিরুদ্ধে ফুলিয়ার প্রমোদ পল্লীর মহিলারা শান্তিপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করে। সম্প্রতি একটি তদন্তকারী দল এসে ওই গ্রামে প্রায় সকলের বাড়িতে তল্লাশির নামে তছনছ চালায় এমনটাই অভিযোগ গ্রামবাসীর। কিন্তু সিবআই সুত্রে জানাগেছে, তারা শুধু ছয়জন অভিযুক্তের বাড়িতে গিয়ে তাদের খোঁজ করেছিল, কিন্তু প্রসেনজিত দাস ছাড়া কাউকে পায়নি।
মহিলাদের দাবি, অতীতে প্রদীপ সরকার নামে ওই মস্তানের নামের লিখিত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনওদিন পুলিশ তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়নি অথচ আজ তাঁর মৃত্যুর কারণ খুঁজতে নিরীহ মানুষগুলোর ওপর অত্যাচার চলছে। তাদের দাবি, গ্রামে শিক্ষিত লোক না থাকায় বেশ কিছু ছেলেকে তুলে দিতে বলা হচ্ছে সিবিআইয়ের হাতে। পেশায় শাড়ির ব্যবসায়ী ২৫ বছর বয়সী প্রসেনজিৎ দাসকে গতকাল সকালে সিবিআই ধরে নিয়ে গিয়ে বেদম প্রহার করে বলে তাদের অভিযোগ।
প্রসেনজিৎ দাসের দাদা মিঠুন দাস জানান, “সকাল ন’টার সময় বাড়ি থেকে জিজ্ঞাসাবাদ করবার জন্য সিবিআই আমার ভাইকে তুলে নিয়ে যায়। যাওয়ার সময় আমাদের আশ্বস্ত করে যে প্রসেনজিৎকে ঘন্টা দুয়েক জিজ্ঞাসাবাদ করার পরে ছেড়ে দেবে। ওকে রানাঘাট নিয়ে যাবার কথা ছিল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য, কিন্তু রানাঘাট না নিয়ে গিয়ে ওকে হরিণঘাটায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ওকে নিয়ে গিয়ে ওরা প্রচন্ড মেরেছে। নাক, মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে, দাঁত নড়ে গেছে, মাথায় প্রচন্ড ব্যথা। মাথায় সিটি স্ক্যান করতে দিয়েছে ডাক্তার। ওকে আমরা রানাঘাট মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে গেছি। ওখানে ওকে ভর্তি করা হয়েছে। সিবিআই জিজ্ঞাসাবাদ করার পর কোনওরকম গাড়ির ব্যবস্থাও করে দেয়নি। রাত সাড়ে আটটার সময় ওরা আমার ভাইকে ছাড়ে। ওর নামে বিগত দিনে থানায় কোনও অভিযোগ নেই। একজন নির্দোষ মানুষের উপর কি কারনে সিবিআই অত্যাচার করল? যখন ওকে বাড়ি থেকে সিবিআই তুলে নিয়ে যায় তখন আমি অনুরোধ করি যে আমার ভাই হিন্দি বোঝেনা আমাকেও ওর সাথে নিয়ে চলুন। কিন্তু ওরা আমাকে যেতে দিচ্ছিল না। রীতিমতো জোর করেই যাবার জন্য বলাতে ঐ কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা আমাকে বলে তুমি বাইকে আমাদের পেছনে আসো। এরপর ওরা আমার ভাইকে নিয়ে রানাঘাট যাবে বলে সোজা হরিণঘাটায় নিয়ে যায়। আমিও হরিণঘাটা যেতে বাধ্য হই। হরিণঘাটা থানায় ওরা আমার ভাইকে নিয়ে যায়।

ফ্লিপকার্ড অফিসের সামনে একটা হোটেলে আমার ভাইকে নিয়ে যাওয়া হয় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। এরপর আমি গিয়ে দেখি ওকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ওই কেন্দ্রীয় সংস্থা ওকে ভেতরে নিয়ে গেছে। আমি অফিসারকে ফোন করলে শুনতে পাই ফোনের অপরপ্রান্ত কেউ একজন আমার ভাইকে প্রচন্ড পরিমানে ধমকাচ্ছে। আমাকে ওই অফিসার বাইরে বসতে বলে এবং বলে প্রয়োজন হলে তিনি আমাকে ডাকবেন। প্রায় এক-দেড় ঘণ্টা বাইরে বসে থাকার পর সিবিআই অফিসার আমাকে ভেতরে ডাকে। ডাকার পর আমাকে অনেক রকম উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করে। ওনাদের সব প্রশ্নের উত্তর দিলাম। এরপর হরিণঘাটা থানা থেকে আমার ভাইকে হরিণঘাটার ফ্লিপকার্ড অফিসের সামনে একটা হোটেলে নিয়ে যায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। সেখানে আমার ভাইকে উইকেট দিয়ে প্রচন্ড মারে। মাথায় প্রচন্ড ব্যথা, সারা শরীরে প্রচন্ড ব্যথা। এখন রানাঘাট মহকুমা হাসপাতাল আমার ভাইকে ভর্তি করা হয়েছে।”

