জয় লাহা, দুর্গাপুর, ১৯ জুলাই: সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা। তার ওপর দুই কন্যাসন্তান। তবুও মানবিকতা ও মুল্যবোধের খামতি নেই। অন্যের শরীররে বেঁচে থাকুক স্বামী। প্রাণ ফিরে পাক আর পাঁচটা জীবন।দিনমজুর হয়েও অঙ্গদানে নজির গড়ল বুদবুদের বনগ্রামের অসহায় সুফল বাউরীর পরিবার। তবে সংসার সামলাতে পাশে থাকার করুন অর্তি সুফলের পরিবারের। পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে স্থানীয় চাকতেঁতুল পঞ্চায়েত প্রধান।
সুফল বাউরী। পেশায় দিনমজুর। বুদবুদের চাকতেঁতুল পঞ্চায়েতের বনগ্রামের বাসিন্দা। সংসারে অভাব অনটন নিত্যসঙ্গী। গত দুদিন ধরে অঙ্গদানের অন্যন্য নজির সৃষ্টি করেছে। তার পরিবারের আত্মত্যাগে চোখ খুলে দিয়েছে শিক্ষিত সমাজের। মাস চারেক আগে রুজির টানে দিনমজুরের কাজে কলকাতায় পাড়ি দিয়েছিলেন। সেখানে রাজমিস্ত্রির শ্রমিকের কাজ করতেন।
পরিবারে মা, স্ত্রী ও দুই কন্যা সন্তান রয়েছে। এপর্যন্ত সবই ঠিক ঠাকই চলছিল। গত ৭ জুলাই কলকাতায় বাড়ি নির্মাণের কাজ করার সময় হঠাৎই উপর থেকে নিচে পড়ে যান সুফল। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে ভর্তি করা হয় এসএসকেএম হাসপাতালে। সেখানে ভর্তি থাকার পর অবশেষে তার ব্রেনডেথ হয়। তাতে শোকের ছায়া নেমে আসে গোটা পরিবারে। হাসপাতালে পরামর্শ পায় সুফলের অঙ্গদানের।
স্বামীর ব্রেনডেথের খবরে ভেঙে পড়লেও অঙ্গদানের পরামর্শে নতুন করে শক্তি ফিরে পায় স্ত্রী কাকলি বাউরি। এবং সুফলের অঙ্গদানে সম্মতি দেন। পরিবারের সকলের ও সমাজের মতামত নিয়ে সুফলের চোখ,কিডনি ও ত্বক দান করা হয়। তারপর গত শনিবার বুদবুদের রণডিহায় সুফল বাউড়ির শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
এদিকে দিনমজুর হতদ্ররিদ্র সুফলের অঙ্গ দানের খবর চাউর হতেই প্রশংসার ঝড় ওঠে। তাই দেখে গর্বিত সুফলের পরিবার ও গোটা গ্রামের মানুষ। গর্ব বোধ করলেও সংসারের অনটন আর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় পড়ে কাকলিদেবী। দুই কন্যা সন্তান তারওপর অনটন। সুফলের স্ত্রী কাকলিদেবী জানান, “অন্যের শরীরে বেঁচে থাকবে স্বামীর অঙ্গ। সেটা শুনে মনের আবেগকে আঁকড়ে থাকব।” তিনি আরও বলেন, “আমাদের মত গরিব পরিবার এভাবে অঙ্গদানের কাজে বহু মানুষের প্রশংসা আসছে। ভালো কাজ বলছে। তবুও কোথাও যেন সংসারের অনটন মনের ভেতর আর্তনাদ করছে।
স্বামীর রোজগারেই এতদিন সংসার চলত। আগামী দিনে কীভাবে সংসার চলবে তা জানা নেই। তাই মুখ্যমন্ত্রীর কাছে করুন আবেদন, সন্তানদের মানুষ করতে সরকার যেন পাশে থাকে। রোজগারের পথ করে দিক।” অসহায় সুফলের পরিবারের আত্মত্যাগের খবর পেয়েই পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিয়েছে স্থানীয় চাকতেঁতুল পঞ্চায়েত প্রধান অশোক ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, “আমরা গর্বিত। আমার এলাকার এক দিনমজুর পরিবার শিক্ষিত সমাজের চোখ খুলে দিয়েছে। অঙ্গদান মহৎ কাজ। সুফলের অঙ্গ আর পাঁচটা জীবনের বেঁচে থাকবে। সুফলের পরিবারের মত সকলকে অঙ্গদানে এগিয়ে আসা দরকার। ওই অসহায় পরিবারটির পাশে থাকব। তার দুই কন্যসসন্তানের পড়াশোনার দায়ভার পঞ্চায়েত নেবে।”

