এনএসএস শিবিরে খুদে শিক্ষার্থীদের মন জয় করে নিলেন উপাচার্য

অশোক সেনগুপ্ত, আমাদের ভারত, ২৩ ডিসেম্বর: আর পাঁচটা দিনের চেয়ে সৌমশ্রী, কোয়েল, প্রতাপদের কাছে এই শুক্রবার ছিল একটু অন্যরকম। আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের ছেলেমেয়ে ওরা। কাছেই বাড়ি। বাইরে থেকে দেখে উঁচু দেওয়ালঘেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পেল্লাই ভবন। সেই প্রতিষ্ঠানের এক নম্বর মানুষ এত অমায়িক হবেন, ওরা ভাবতেই পারেনি।

১০ বছরের সৌমশ্রী চক্রবর্তী। বেলতলা গার্লস স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। বাবা রঙের কাজ করেন। একই স্কুলের ১২ বছরের কোয়েল দাস। ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। বাবা অটোচালক। ১৩ বছরের প্রতাপ সিং। সেন্ট লরেন্স হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। বাবা সামান্য দোকানদার। ওদের মতই সংলগ্ন পেয়ারাবাগান বস্তির জনা ৫০ ছেলেমেয়ে এক সপ্তাহ ধরে বাবা সাহেব অম্বেদকর এডুকেশন ইউনিভার্সিটিতে এনএসএস-এর একটা কর্মশালায় যোগ দিয়েছিল। আজ ছিল শেষ দিন। সেই কারণে ছিল অনুষ্ঠান।

সৌমশ্রী, কোয়েল, প্রতাপরা হলের চতুর্থ সারির আসনে বসেছিল সেজেগুজে। অনুষ্ঠান শুরুর আগে খোদ উপাচার্য অধ্যাপক ডঃ সোমা বন্দ্যোপাধ্যায় এক ঝলক কথা বললেন কিছু বাচ্চার সঙ্গে। আন্তরিকভাবে জানতে চাইলেন কোন ক্লাসে পড়? বা বা, কী সুন্দর লাগছে! কে সাজিয়ে দিয়েছে? ওরাও জবাব দিল খুশি হয়ে। এভাবেই ওদের মন জয় করে নিলেন প্রতিষ্ঠানের এক নম্বর মানুষটি।

সপ্তাহব্যাপী কর্মশালা ছিল জাতীয় সেবা প্রকল্প (এনএসএস)-র। পরে বক্তৃতায় ডঃ সোমা বন্দ্যোপাধ্যায় খুদে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, কেবল পড়াশোনা, ক্যারিয়রেই কিন্তু জীবনের সাফল্য আসে না। এর বাইরেও সবার কিছু আবশ্যিক করণীয় বিষয় থাকে। তোমরা যা যা শিখলে সেগুলো তোমাদের নিজস্ব পরিমণ্ডলে বিকশিত করতে হবে। যাকে বলে শেয়ারিং অ্যাজ ওয়েল অ্যাজ কেয়ারিং। যারা সমস্যা বা অসুবিধা বোধ করছেন, তোমাদের ছোট ছোট হাত বাড়িয়ে তাঁদের পাশে যদি না দাঁড়াতে পার, এই শিক্ষা সফল হবে না। পাস বই পূরণ, ব্যাঙ্ক-ডাকঘরের কাজগুলো সম্পর্কে তোমরা শিবিরে শিখলে। তোমাদের যেসব প্রতিবেশী এসব বিষয়ে জানেন না, তাঁদের শেখানোর দায়িত্ব তোমাদের।

সামাজিক দায়বদ্ধতার দিকে নবীন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের আরও সচেতন হওয়ার আবেদন করে সোমা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, কবি সুকান্ত বলেছিলেন, “এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি – নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।” আজও সেকথা সমান প্রাসঙ্গিক। এটা আমাদের সামগ্রিক দায়িত্ব। যে বসুন্ধরা সেজে আছে, এটিকে সবাই মিলে আরও সাজিয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু অনেকে এত বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছি যে দায়িত্ব-কর্তব্যের কথা ভুলে যাই। এনএসএস-এর পরিবেশিত প্রতীকি গান সবাইকে সে কথা মনে করিয়ে দিল।

শিবিরের সমাপ্তি অনুষ্ঠানে এনএসএস-এর আঞ্চলিক অধিকর্তা বিনয় কুমার বলেন, “নতুন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্বেও এই বিশ্ববিদ্যালয় অর্থাৎ বিএসএইইউ যেভাবে এনএসএস-এর প্রসারে আত্মনিয়োগ করেছে, তা বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি এই পরিষেবার কাজ দেখেছি। কিন্তু বিএসএইইউয়ের ভূমিকা এদিক থেকে সত্যি অনন্য। দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে এনএসএস-এর ভূমিকা অপরিসীম। সিঙ্গাপুর তার বড় নিদর্শন। যে গ্রামের মাটিতে আমি জন্মেছি, বড় হয়েছি, তাঁকে আমার কিছু ফিরিয়ে দিতে হবে। পরে শহরে এসে সেই গ্রামকে ভুলে গেলে চলবে না। আমরা নিজেদের ছোট ছোট গণ্ডিতে আবদ্ধ করে ফেলছি। কিন্তু ক্যাম্পাস থেকে কমিউনিটি, দিশা, লক্ষ্য— এগুলোকে সর্বদা স্মরণ করা দরকার। এনএসএস সেটাই শেখানোর চেষ্টা করে।

অনুষ্ঠানে বিএসএইইউয়ের নিবন্ধক (রেজিষ্ট্রার) কুণাল কান্তি ঝা বলেন, পড়ুয়ারা কিভাবে সামাজিক কল্যাণের শরিক হতে পারে, এনএসএস-এর শিবিরে সেটাই নানাভাবে শিক্ষার্থীদের বোজানো হয়। এর সার্থকতার অর্থ ‘লাইফ অফ ডিগনিটি’-র সাফল্য। সমাজকর্মী দেবাশিস দত্ত এনএসএস-এর সাফল্যের সঙ্গে সামাজিক বিকাশের সম্পর্কের কথা বলেন।

বিএসএইইউয়ের (পূর্বতন দি ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি অফ টিচার্স ট্রেনিং, এডুকেশন, প্ল্যানিং অ্যান্ড অ্যাডমিনিষ্ট্রেশন) ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজ ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠানের শুরুতে এনএসএস-এর চার স্বেচ্ছাসেবী পরিবেশন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীকি সঙ্গীত ‘বিশ্ব সাথে যোগে যেথায় বিহারো/ সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারও।’

শিবিরের অন্যতম ব্যবস্থাপক অধ্যাপক ডঃ বিশ্বজিৎ বালা জানান, স্বেচ্ছাসেবীদের হাতেকলমে কাজের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভিড হেয়ার ক্যাম্পাস সংলগ্ন পেয়ারাবাগান বস্তিকে চিহ্ণিত করা হয়েছিল।বিশ্ববিদ্যালয়ের এনএসএস-এর প্রোগ্রাম অফিসার ডঃ সুমনা সামম্ত নস্কর জানান, প্রতিদিন স্বাস্থ্য শিবিরের আবশ্যিক নানা পাঠ ছাড়াও ছিল মূল্যবোধ শিক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি সমাজবোধের নানা পাঠ। সাত দিনের এই শিবিরে অংশ নেয় প্রায় ৫০ জন স্বেচ্ছাসেবী।

অনুষ্ঠানে ছিল প্রদীপ প্রজ্বলন, অম্বেদকরের ছবিতে মাল্যদান, পুষ্পস্তবক অর্পন। বিশিষ্টদের বক্তৃতার পর পরিবেশিত হয় এনএসএস-সঙ্গীত, সংক্ষিপ্ত ভিডিও ‘যদি তোর ডাক শুনে’, ‘ভারত হামকো জান সে’ এবং ‘আলো আমার আলো’-র সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নৃত্য, গান ‘বিপদে মোরে রক্ষা কর’, ‘বিশ্ব পিতা তুমি’, ‘লাল নীল সবুজের মেলা’, আবৃত্তি ‘তুমিও বলবে’।
সাংস্কৃতিক এই সব কলার সঙ্গে ছিল বেলুন-চকলেট, স্মারক বিতরণ, ‘এনএসএস ক্ল্যাপ’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *