আমাদের ভারত, ২২ এপ্রিল: ‘অশিক্ষক’ শব্দটি একটি বহুল প্রচলিত শব্দ। বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, মহাবিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে শিক্ষক ব্যতীত সকল কর্মচারীদের বিষয়ে প্রায়শই এই শব্দটির ব্যবহার হয়। কখনও ‘অশিক্ষক কর্মী’ কখনও বা ‘অশিক্ষক কর্মচারী’। চতুর্থ শ্রেণির কর্মী, করণিক, ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট, মেট্রন, পিওন, লাইব্রেরিয়ান ইত্যাদি পদগুলিকে একত্রে ‘অশিক্ষক ‘ নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির মুখপত্রে, পত্রিকায়, বিভিন্ন কাগজপত্রে, সরকারি আদেশনামায়, সরকারি অনুষ্ঠানের প্রদর্শিত ব্যানারে ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রেই দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহার হওয়া এই শব্দটির প্রকৃত অর্থ কী?
এই প্রশ্ন তুলে হাওড়ার আন্দুল – মৌড়ীর ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল স্কুল অ্যান্ড মাদ্রাসা ক্লার্কস্ অ্যাসোসিয়েশন’-এর সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর সিদ্ধান্ত দাবি করেছেন, “কর্মক্ষেত্রে প্রতিটি পদের একটি সম্মান আছে এবং সেই পদের সম্মানের উপর ওই পদে কর্মরত ব্যক্তির সম্মান, মর্যাদা জড়িয়ে থাকে। তাহলে একটি বিরাট অংশের মানুষের পেশার ক্ষেত্রে এইধরনের আপত্তিকর, অসম্মানজনক, মর্যাদাহানিকর শব্দের ব্যবহার যুগের পর যুগ ধরে চলবে কেন? তাই, অবিলম্বে সরকারি নির্দেশিকা জারি করে এই শব্দের ব্যবহার বন্ধ করার জন্য কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। উন্নত থেকে উন্নততর প্রগতিশীল মানবসভ্যতায় অন্য পদের পরিচয় বা অ-পরিচয়ে নয়, প্রতিটি পদ তার আপন মর্যাদায়, আপন পরিচয়ে মহীয়ান হয়ে উঠুক।“
পশ্চিমবঙ্গ কলেজ ক্যাজুয়াল এমপ্লয়িজ সমিতির রাজ্য কমিটির মুখপাত্র তথা পিংলা থানা মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষাকর্মী সব্যসাচী গুছাইত এই প্রতিবেদককে বলেন, “শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষাসহায়ক অফিসিয়াল যাবতীয় কাজ করে শিক্ষাঙ্গনে অশিক্ষক কথাটি প্রকৃতপক্ষে অসম্মানজনক, অশিক্ষক কথাটার মধ্যে মর্যাদা ও যোগ্যতার প্রশ্ন উঠে। অশিক্ষক না বলে শিক্ষাকর্মী বলাটাই প্রাসঙ্গিক।”
‘শিক্ষাবন্ধু ঐক্য মঞ্চ’-র রাজ্য সম্পাদক বিভূতিভূষণ মণ্ডল এই প্রতিবেদককে বলেন, “শিক্ষাক্ষেত্রে দুইজন কর্মী থাকে। এক শিক্ষক এবং আর একজন শিক্ষাকর্মী। এনাদের দ্বারা শিক্ষাক্ষেত্রটা পরিচালিত। সেখানে অশিক্ষক বলে কোনও কথা থাকতে পারে না। অনেক সময় শিক্ষক সংখ্যা কম থাকলে শিক্ষাকর্মীরা ক্লাশ নিয়ে থাকে। তাই অশিক্ষক শব্দটি ব্যবহার অমূলক। এতে মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়।“
দীপঙ্কর সিদ্ধান্তর বক্তব্য, “বাংলা অভিধানে দু’টি শব্দ আছে। এক, ‘অশিক্ষা’ (বিশেষ্য), যার অর্থ শিক্ষার অভাব/কুশিক্ষা, দুই, ‘অশিক্ষিত’ (বিশেষণ), অর্থাৎ বিদ্যাহীন/মূর্খ। কিন্তু ‘অশিক্ষক’ বলে কোনও শব্দের অস্তিত্ব বাংলা অভিধানে নেই। অথচ দিনের পর দিন বিভিন্ন শিক্ষাদপ্তরের আঙিনায় আকছার ব্যবহার হচ্ছে এই শব্দ।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন অফিস সহ সকল কর্মক্ষেত্রেই কর্মরত ব্যক্তির কাজের ধরন অনুসারে পদের নামকরণও করা হয়ে থাকে। যেমন- চেয়ারম্যান, সেক্রেটারি, আধিকারিক, হিসাবরক্ষক, করণিক, স্টেনোগ্রাফার, চতুর্থ শ্রেণির কর্মী ইত্যাদি। পেশার তারতম্য অনুসারে আমরা কাউকে বলি ডাক্তার, কাউকে উকিল, ইঞ্জিনিয়ার, খেলোয়াড়, গায়ক, বা অভিনেতা। আবার এইসকল পেশার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সহযোগী ব্যক্তিদেরও বিভিন্ন নামকরণ করা হয়। ডাক্তারের সহযোগী নার্স, উকিল এর সহযোগী মুহুরি, গায়কের সহযোগী তবলচি ইত্যাদি। অর্থাৎ মূল বিষয়কে সহযোগিতা করার জন্য যাঁরাই থাকুন না কেন, তাঁদের কাজের প্রকৃতি অনুসারে প্রত্যেকটি পদেরই একটি সম্মানজনক নাম আছে। শুধুমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতেই শিক্ষাপ্রদানে নিযুক্তদের ‘শিক্ষক’, আর এই ব্যবস্থার সহযোগীদের ‘অশিক্ষক’ বলে সম্বোধন করা হয়ে থাকে।
শিক্ষাক্ষেত্রে কাজ করেন কিন্তু শিক্ষক নন। তাই তিনি অশিক্ষক। এ জলের মতো পরিষ্কার সত্য যুক্তি দিয়ে অনেকে বলতেই পারন। সেক্ষেত্রে বলব, পেশাগত দিক থেকে আমরা নার্সকে অডাক্তার, মুহুরিকে অউকিল, তবলচিকে অগায়ক বলি কি? অইঞ্জিনিয়ার, অখেলোয়াড় এসব শব্দেরও বাংলায় কোনও ব্যবহার নেই! তাহলে এমন একটি শব্দ যার প্রকৃত কোনও অর্থই নেই, উপরন্তু একটি নেতিবাচক ভাবের পরিচয় বহন করে, উচ্চারণের দিক থেকে যার একদম কাছাকাছি শব্দগুলোর অর্থ অসম্মানজনক, সেই ‘অশিক্ষক’ শব্দটি কেন ব্যবহার করা হবে? একটি পদের নামকরণ অন্য একটি পদের সঙ্গে না-বোধক উপসর্গ জুড়ে (অ+শিক্ষক) করাটা কি কোনওভাবেই যুক্তিযুক্ত? আমরা কি অডাক্তার, অউকিল, অমেথর এরকম শব্দ ব্যবহার করি!! তাছাড়া অন্য পদের পরিচয়ে আর একটি পদকে পরিচিত করার অর্থ সেই পদটির নিজস্বতা নষ্ট করা এবং উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন না করা। চতুর্থ শ্রেণির কর্মী, করণিক, ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট, মেট্রন, পিওন, লাইব্রেরিয়ান ইত্যাদি পদগুলিতে কর্মরত ব্যক্তিরা অন্য পদের (পড়ুন শিক্ষক) পরিচয়ে পরিচিত হবেন কেন?“

