মিলন খামারিয়া
আমাদের ভারত, কল্যাণী, ৫ অগাস্ট:
খনার বচনে আছে, “চাল ভরা কুমড়ো লতা/লক্ষ্মী বলেন, আমি তথা।” এই প্রবাদ আমাদের দেখিয়ে দেয়, ধান্যলক্ষ্মী যেন হয়ে উঠেছেন শাকম্ভরী-লক্ষ্মী। ‘মার্কেণ্ডেয় পুরাণ’-এ আমরা শাকম্ভরী-দুর্গার স্তোত্র পাই, দেবী সেখানে নিজ দেহ থেকে শাকসব্জি ও ফলমূল হয়ে অজন্মার হাত থেকে মর্ত্যলোককে বাঁচাচ্ছেন ও পুষ্টিবর্ধন করছেন। পুষ্টি-বাগান রচনা ভারতবাসীর কাছে কেবল প্রয়োজন নয়, তা সংস্কৃতির অঙ্গ।
কার্তিক পুজোর সময় যে শস্য-সরা রচনা করা হয় তাতে বিবিধ খাদ্যশস্যের পাশাপাশি কচু ও শুসনি শাকের চারাও লাগানো হয়। এইভাবে ‘অ্যাডোনিস গার্ডেন’-এর ধারণা সংস্কৃতির অঙ্গ হিসাবে উদ্যান রচনা করতে শেখায়। সেই ভাবনাকে পাথেয় করেই বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফল গবেষণা কেন্দ্র’-এর উদ্যোগে আজ ‘কলমের মাধ্যমে চারাগাছ ও পুষ্টিবাগান তৈরি’ বিষয়ক এক দিনের একটি বিশেষ কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছিল। এই কার্যক্রমে নদিয়া ও উত্তর-চব্বিশ পরগণা জেলার গাইঘাটা, হরিণঘাটা, চাকদাহ এবং রানাঘাট-১ ব্লকের আগ্রহী তপশিলি সম্প্রদায়ের মোট ৪২ জন কৃষক এতে অংশগ্রহণ করেন। এই কর্মশালাতে অধ্যাপক ড. দিলীপ কুমার মিশ্র, ড. ফটিক কুমার বাউরি ও ড. কল্যাণ চক্রবর্তী চারাগাছ তৈরি ও পুষ্টি বাগান নির্মাণের প্রশিক্ষণ দেন।
ড. মিশ্র কৃষকদের বিভিন্ন প্রকারের ‘কলম’ তৈরি করা হাতে-কলমে শেখান। কাটা-কলম, গুটি-কলম ও জোর-কলম কীভাবে করতে হয়, তা তিনি বুঝিয়ে দেন।আম, পেয়ারা, লিচু, লেবু, কাঁঠাল প্রভৃতি গাছে কীভাবে কলম দিয়ে চারা তৈরি করা হয়, তা জানান ড. কল্যাণ চক্রবর্তী।

আলোচনায় অধ্যাপকরা বলেন, কবি কঙ্কণের ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে নিদয়ার সাধভক্ষণ অংশে নানান শাক রান্নার কথা আছে যেমন আবার তেমনি ‘ভূত চতুর্দশী’তে ( ভূত তাড়াতে) চৌদ্দ শাক খাওয়ার চল আছে।আবার মানভূম অঞ্চলে ‘জীহুড় দিন’-এ (আশ্বিন সংক্রান্তি) ২১ রকমের শাক রান্না করে খাওয়ার বিধি আছে। বাংলার কুমারী মেয়েরা কার্তিক মাস জুড়ে ‘যমপুকুর ব্রত’ উৎযাপন করতো। এই ব্রত কুমারীদের শাক-সবজির বাগান তৈরিতে উৎসাহ যোগাতো।
গ্রাম-বাংলার সমৃদ্ধির সঙ্গে আহার ও পুষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ থাকা উচিত। সমৃদ্ধি তখনই বলবো যখন গ্রামবাসী রোজ দু’বেলা পুষ্টিকর খাবার পাতে পাবেন।
অনেক বাস্তুতেই এক-আধ কাঠা জমি পড়ে থাকে, কখনও তারও বেশি। সেই জমিটুকুকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে ব্যবহার করে ‘কিচেন গার্ডেন বা ঘরোয়া সবজি বাগান’ গড়ে তোলা যায়। কখনও তার লাগোয়া দু’টো একটা ছোটো মাপের ফলগাছ লাগালে, তা এক পরিপূর্ণ পুষ্টি বাগান বা নিউট্রিশনাল গার্ডেন হয়ে দাঁড়াবে।
সবজি বাগানে ছোটো ছোটো প্লট বানিয়ে ফসল চক্র অনুসরণ করে সারাবছর ধরে সবজি লাগালে বাড়ির চাহিদা মিটবে। পটল, মূলো, ঢ্যাঁড়স, উচ্ছে, কাঁচকলা, আলু প্রভৃতি সবজির চাষ করা যেতে পারে। এই বাগানের বেড়াতেও উপযোগী লতানে সবজি তুলে দেওয়া যায়। বাগানে যদি পুরোপুরি বা আংশিকভাবে জৈব পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়, তবে বাংলার মানুষ কৃষির রাসায়নিক দূষণ থেকে রেহাই পাবে। কারণ সবজি আর ফলেই সবচাইতে বেশি সার, কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ব্যবহার করা হয়।

শহরতলীতেও যাদের গৃহ-সন্নিহিত এক চিলতে জমি আছে; অথচ তাতে ভালো আলো-বাতাস খেলে, তারাও রচনা করতে পারবেন পুষ্টি বাগান। বাগানের বর্জ্য, গৃহের তরকারির খোসা, মাছের কাঁটা, মাংসের হাড় ইত্যাদি ব্যবহার করে বাগানেই বানিয়ে নেওয়া যায় কম্পোস্ট সারের ভাণ্ড। গ্রামের মানুষ গোবর ও গোমূত্র ব্যবহার করে গোবর সার, তরল জৈবসার এবং কেঁচো ব্যবহার করে ভার্মি-কম্পোস্ট বা কেঁচোসার বানিয়ে এই পুষ্টিবাগানে প্রয়োগ করতে পারেন। অপুষ্টির অভিশাপ থেকে গ্রাম-বাংলাকে শাপমুক্ত করতে ছড়িয়ে দিন পুষ্টিবাগানের এই প্রস্তুত পাঠ। সবজি উৎপাদনে ভারত দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও এখনো দেশের সমস্ত মানুষ আজও দৈনিক ন্যূনতম মাত্রায় সবজি পায় না। অথচ সামান্য সচেতনতা ও প্রচেষ্টা থাকলে কি এতটা অপুষ্টির পরিমণ্ডল থাকা উচিত? পুষ্টিবাগানের তথ্য ও তার নিবিড় পাঠ বাংলার মানুষকে বাস্তু-বাগান রচনায় মনোনিবেশ করতে সাহায্য করবে। বাড়ির পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রী ও গৃহকর্ত্রীরাই মিলেমিশে রচনা করবেন এই বাগান। ‘নিত্যি নিত্যি ফল খাও, বদ্যি বাড়ি নাহি যাও’-খনা বলে গেছেন।
আজকের কার্যক্রম বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ড. দিলীপ কুমার মিশ্র জানান, “গ্রামবাংলার প্রতিটি বাড়িতে আলাদা করে পুষ্টিবাগান তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য। পাশাপাশি কৃষকভাই’রা নিজেরাই যাতে বিভিন্ন প্রকারের ‘কলম’ তৈরি শিখে উন্নত প্রজাতির ফলচাষ করে নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবেও সফল হতে পারে, সে বিষয়েও আমরা উৎসাহিত করছি। বেকার যুবক-যুবতীরা অল্প জমিতে নার্সারি তৈরি করে অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হতে পারবে এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে।”
উপস্থিত ছিলেন ভারত সেবাশ্রম সংঘ’-এর দেবেশানন্দ মহারাজ। তিনি বলেন, “ভারত কৃষি ও ঋষির দেশ। গাছ হল শিশুর মতো। তাকে উপযুক্ত খাদ্য নির্দিষ্ট সময় অন্তর দিয়ে বেড়ার মধ্যে প্রতিপালন করতে হবে। আজকের প্রশিক্ষণ শেষে আমি নিজেও আশ্রমে গিয়ে পুষ্টিবাগান তৈরি করব।”
আজকের কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন ড.সুধীব্রত মিত্র(ডাইরেক্ট অফ ফার্ম), ড.উমেষ থাপা(ডাইরেক্টর অফ এক্সটেনশন এডুকেশন ) ও ড.শুভেন্দু বিকাশ গোস্বামী(ডিন, ফ্যাকাল্টি অফ এগ্রিকালচার) এবং ড. জনন্ত তরফদার (ডাইরেক্ট অফ রিসার্স)।
প্রশিক্ষণ শেষে আম, পাতিলেবু, মৌসম্বী লেবু, সবেদা, ড্রাগনফল গাছের চারা সব কৃষকদের দেওয়া হয়। তাদের লাগানো গাছ দেখে উৎসাহিত হয়ে প্রতিবেশীরাও বাড়িতে ধীরে ধীরে পুষ্টিবাগান তৈরি করুক, তবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পুষ্টিবাগান’ তৈরির উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা সফল হবে।

