মিলন খামারিয়া
আমাদের ভারত, কল্যাণী, ২৭ অগাস্ট:
‘চল কোদাল চালাই,ভুলে মানের বালাই। ঝেড়ে অলস মেজাজ, হবে শরীর ঝালাই’- এই মন্ত্রে বাংলার আবালবৃদ্ধবনিতা এক সময় মুখর হয়ে উঠেছিলেন গুরুসদয় দত্তের ব্রতচারী আন্দোলনের মাধ্যমে। তাতে বাংলার যুবকরা মাটিকে কর্ষণ করে যেমন ফসল ফলিয়ে খাদ্যের সংকট মিটিয়েছিলেন তেমনি শরীরকেও গড়ে তুলেছিলেন মজবুত করে। করোনা মহামারি দেখিয়ে দিল যে, শরীর মজবুত ও সুস্থ রাখা কতটা জরুরী আর সেই শরীর ঠিক রাখার জন্য বিশুদ্ধ খাবার খাওয়া দরকার। এই রাসায়নিক চাষের যুগে বিশুদ্ধ শাক-সবজি ও ফল শুধু নিজে উৎপাদন করলেই পাওয়া সম্ভব। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের প্রতিদিন কমপক্ষে ১৩০ গ্রাম ফল খাওয়া উচিত।তাই বাংলার গ্রামাঞ্চল তথা শহরের প্রতিটি বাড়িতেই পুষ্টিবাগান থাকা উচিত।
সেই ভাবনাকে পাথেয় করেই বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফল গবেষণা কেন্দ্র’-এর উদ্যোগে বৃহস্পতিবার ‘কলমের মাধ্যমে চারাগাছ তৈরি ও বৃক্ষশিশুর পরিচর্যা’ বিষয়ক এক দিনের একটি বিশেষ কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছিল। এই কার্যক্রমে পশ্চিমবঙ্গের ৮টি জেলার (উত্তর ২৪ পরগণা, দক্ষিণ ২৪ পরগণা, নদিয়া, হাওড়া, হুগলি, মালদা, পূর্ব মেদিনীপুর ও পশ্চিম মেদিনীপুর) মোট ৫২ জন কৃষকভাই অংশগ্রহণ করেন। এই কর্মশালাতে অধ্যাপক ড. দিলীপ কুমার মিশ্র,অধ্যাপক, ড. ফটিক কুমার বাউরি ও অধ্যাপক ড. কল্যাণ চক্রবর্তী চারাগাছ তৈরি ও পুষ্টি বাগান নির্মাণের প্রশিক্ষণ দেন।
ড. চক্রবর্তী কৃষকভাইদের বিভিন্ন প্রকারের ‘কলম’ তৈরি করা হাতে-কলমে শেখান। কাটা-কলম বা ছেদ-কলম, গুটি-কলম ও জোর-কলম কীভাবে করতে হয়, তা তিনি বুঝিয়ে দেন। আঙুর, কিউয়ি, সজিনা প্রভৃতি গাছের কাটা-কলম দেওয়া হয়। আম, পেয়ারা, লিচু, লেবু, কাঁঠাল প্রভৃতি গাছে জোরকলম ও গুটি-কলম দিয়ে চারা তৈরি করা যায় বলে তিনি জানান।

আবার সবজি বাগানে ছোটো ছোটো প্লট বানিয়ে ফসল চক্র অনুসরণ করে সবজি ও ফলের গাছ লাগালে বাড়ির চাহিদা মেটানো যায় অনেকটাই।পটল, মূলো, ঢ্যাঁড়স, উচ্ছে, কাঁচকলা, আলু প্রভৃতি সবজির চাষ করা যেতে পারে।আমলকীর চাহিদার দিকে লক্ষ্য রেখে তার চাষ করা যেতে পারে। তাই বাগানে যদি পুরোপুরি বা আংশিকভাবে জৈব পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়, তবে বাংলার মানুষ কৃষির রাসায়নিক দূষণ থেকে রেহাই পাবে। কারণ সবজি আর ফলেই সবচাইতে বেশি সার, কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ব্যবহার করা হয় বলে জানান ড.বাউরি।
প্রশিক্ষণের ব্যাপারে ড. দিলীপ কুমার মিশ্র জানান, “পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি বাড়িতে পুষ্টিবাগান তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য। পাশাপাশি কৃষকভাই’রা নিজেরাই যাতে বিভিন্ন প্রকারের ‘কলম’ তৈরি শিখে উন্নত প্রজাতির ফলচাষ করে নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পর সংঘবদ্ধভাবে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে তথা বিদেশে রপ্তানি করতে পারে সে বিষয়েও আমরা উৎসাহিত করছি।”
দেশের সমৃদ্ধির সঙ্গে আহার ও পুষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ থাকা উচিত। সমৃদ্ধি তখনই বলা যাবে যখন দেশের মানুষ রোজ দুবেলা পুষ্টিকর খাবার পাতে পাবেন।
অনেক বাস্তুতেই আলগোছে এক-আধ কাঠা জমি পড়ে থাকে, কখনও তারও বেশি। আবাস-সন্নিহিত জমিটুকু বা ছাত’কে বিজ্ঞানসম্মতভাবে ব্যবহার করে ‘কিচেন গার্ডেন বা ঘরোয়া সবজি ও ফলের বাগান’ হিসেবে গড়ে তোলা যায়।আর তা হয়ে উঠতে পারে পরিপূর্ণ পুষ্টি বাগান বা নিউট্রিশনাল গার্ডেন।

কর্মশালার গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে অধ্যাপক ড. জয়ন্ত তরফদার(ডাইরেক্টর অফ্ রিসার্স) জানান, “ভারত খাদ্যশস্য চাষে আত্মনির্ভরশীল হয়েছে। তবে ফল চাষেও তাকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলাই এখন আমাদের মূল লক্ষ্য। আমাদের দেশে প্রতিবছর প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার ফল আমদানি করতে হয়। দেশের যুবক-যুবতীদের ফল চাষ করতে উৎসাহিত করতে হবে আমাদের। তাতে বেকারত্ব নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি ফলের উৎপাদনও বাড়বে।”
কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিকর্তা অধ্যাপক উমেষ থাপা। তিনি এই প্রশিক্ষণের সুফল সকল পরিচিত ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দিতে অনুরোধ করেন।

প্রশিক্ষণ শেষে কৃষকভাইদের আম, ড্রাগন ফল, মৌসম্বী ও লেবুর চারা তুলে দেওয়া হয়। তাদের রোপণ করা ফলের গাছে বাংলার মাঠ-ঘাট ভরে উঠুক। ফল চাষে দেশ আত্মনির্ভরশীল হোক আর নার্সারি তৈরি করে বেকারত্ব নির্মূল করুক যুব-সমাজ। কোদাল দিয়ে কর্ষণ করুক মাটি আর হয়ে উঠুক খাঁটি মানুষ।

