কথা দিয়ে কথা রাখেনি! ঘরের ছেলে ঘরে ফিরল কফিন বন্দি হয়ে, শহিদ সন্তানের শোকে বিহ্বল গোপালনগর এলাকা

সুশান্ত ঘোষ, আমাদের ভারত, উত্তর ২৪ পরগণা, ৩ জুলাই: বাবাকে কথা দিয়েছিল জুলাই মাসে বাড়ি ফিরে নতুন ঘরে উঠবে। অনেক দিন ছেলের সঙ্গে দেখা নেই, দিন গুনছিলেন বাবা মা ও স্ত্রী সেই তারিখটার জন্যে। কিন্তু তার আগেই ঘটে গেল মর্মান্তিক ঘটনা। সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার, বাড়িতে ফিরল ছেলের কফিন বন্দি দেহ। পাড়ার যুবকরা মোটর বাইকে জাতীয় পতাকা লাগিয়ে র‌্যালি করে নিয়ে আসেন কনভয়।

রবিবার তাঁর কফিন বন্দি নিথর দেহ নিয়ে উত্তর ২৪ পরগনার গোপালনগর থানার শ্রীপল্লির ব্যারাকপুরের আনা হয়। গোপাল বন্দ্যোপাধায়ের ছোট সন্তান সন্তু বন্দ্যোপাধ্যায়। দেশ সেবার জন্য ২০০৬ সালে চাকরি নিয়েছিলেন। গর্বে বাবা মায়ের বুক ভরে উঠেছিল। সেনা বাহিনীতে কর্মের সূত্রে যখন তখন ছেলে বাড়িতে আসতে পারত না। ছুটি পেলে সময় সুযোগ করে বাড়ি আসতে হয় সন্তুকে। এবার বাবাকে জানিয়েছিল জুলাই মাসের শেষের দিকে বাড়ি এসে নতুন ঘরে গৃহপ্রবেশ করবে।

বৃহস্পতিবার মণিপুরের টুপুল রেল স্টেশনের কাছে ধস নামে। সেই মর্মান্তিক ঘটনায় পাথর চাপা পড়ে মৃত্যু হয় বীরসেনা সন্তুর। প্রায় ২৪ ঘন্টা পর তাঁর দেহ উদ্ধার হয়। ২০০৬ সালে সন্তু আর্মি জার্সি ১০৭ ব্যাটালিয়নে কাজে যোগ দিয়েছিলেন। মাস ছয় আগে মণিপুরের টুপুলে তার পোস্টিং হয়। এপ্রিল মাসে সন্তু শেষবারের জন্য বাড়িতে এসেছিল। যাওয়ার সময় বাবাকে কথা দিয়েছিল জুলাই মাসের শেষের দিকে বাড়ি ফিরে নতুন ঘরে গৃহপ্রবেশ করবে। সেই জুলাই মাসেই ছেলে বাড়ি ফিরল কিন্তু কফিন বন্দি হয়ে।

গ্রামের বীর পুত্রের কফিন বন্দি নিথর দেহ নিয়ে সেনা আধিকারিকরা এলাকায় ঢুকতেই গ্রামবাসীদের চোখের জলের বাঁধ ভেঙে যায়। মাঝে মধ্যেই ডুকরে ওঠেন তাঁর স্ত্রী জয়া। সন্তুর একরত্তি এক কন্যাসন্তান রয়েছে। এমন অসময়ে যে বাবাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলল, তা টেরও পাচ্ছে না সে। বৃদ্ধা বাবা-মা সন্তান শোকে আকুল হয়ে গিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ঘটনা জানার পর থেকেই পরিবারের সদস্যরা ভুলেই গিয়েছেন খাওয়া দাওয়া করতে। অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন স্ত্রী জয়া। এদিন শহিদ সন্তু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃতদেহ নিয়ে আসতেই বীর সন্তান সন্তু “অমর রহে” শ্লোগান দেয় জনতা।

সেনাবাহিনীর রীতি মেনে ড্রাম, বিউগল বাজিয়ে কনভয় করে জাতীয় পতাকায় ঢেকে দেওয়া কফিনে করে শহিদের মৃতদেহ আনা হয় আধা সামরিক বাহিনীর কর্মীদের কাঁধে করে। বাড়ির সামনে মৃতদেহ রাখা হয়। এরপর বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় লাইবেরির মাঠে মঞ্চ তৈরি করে ফুলের মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় এলাকার মানুষ সহ গোপালনগর শাখার প্রাক্তন সৈনিক সংগঠন। পরে বনগাঁ শ্মশানে গান স্যালুট জানিয়ে শহিদ জওয়ানকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। দূর প্রান্তের বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকের সমাগম ঘটে তাদের বীর সন্তানকে দেখার জন্য। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও স্থানীয় মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সন্তুকে।

এদিন সন্তুকে শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হন, প্রাক্তন সৈনিক সংগঠনের সম্পাদক প্রশান্ত মজুমদার, সভাপতি রমেশ চন্দ্র দত্ত, এছাড়া বনগাঁ লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ শান্তনু ঠাকুর, বনগাঁর বিধায়ক অশোক কীর্তনিয়া, বনগাঁ পৌরসভার চেয়ারম্যান গোপাল শেঠ, সাত নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর দেবদাস মণ্ডল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *