(ছবি— ওপরে, বুধবার ঝাড়গ্রাম সাধু রামচাঁদ মূর্মূ বিশ্ববিদ্যালয়ে কালীপদ সোরেনকে সম্বর্ধনা।)
অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, ২৬ জানুয়ারি: শহুরে আধুনিকতা তাঁর মন টানতে পারেনি। অনেক সুযোগ পেয়েও চাননি কলকাতায় থিতু হতে। বাড়তি সুযোগ ও পরিচিতির আশায় সন্তানদেরও শহরে পাঠাননি। ঝাড়গ্রামই হয়ে উঠেছে তাঁর প্রাণের আরাম, আত্মার আনন্দ, মনের শান্তি।
২৬ জানুয়ারি সকাল থেকেই অভিনন্দনের জোয়ারে ভাসছেন তিনি, মানে কালীপদ সোরেন। বললেন, “২৪ জানুয়ারি পশ্চিম মেদিনীপুরের তথ্য দফতর আমার কাছে কিছু কাগজপত্র চায়। কিন্তু আমাকে ‘পদ্মশ্রী’ দেওয়া হতে পারে, তা ভাবতে পারিনি। উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতির শুরু অবশ্য প্রায় দেড় দশক আগে। এর মধ্যে প্রথমেই মনে পড়ছে ২০০৭-এর সাহিত্য আকাদেমী পুরস্কার, ২০১২-তে সারদাপ্রসাদ কিস্কু স্মৃতি পুরস্কার, ‘১৫-তে সাধু রামচাঁদ মূর্মূ স্মৃতি পুরস্কারের পর ‘১৯-এ অনুবাদ সাহিত্যে কেন্দ্রীয় স্বীকৃতি।“
বাবা তারাচাঁদ সোরেন ঝাড়গ্রামে জমিদারের আমিনের কাজ করতেন। তাঁর জমিতে চাষাবাদ হত। এখনও হয়। কালীবাবুর জন্ম লালগড় থানা এলাকার রঘুনাথপুরে, ১৯৫৭-র ৯ ডিসেম্বর। স্থানীয় গোপালপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় আর চাঁদরা উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের পর কাবগাড়ির সেবাভারতী মহাবিদ্যালয়। এর পর রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ায় কাজ পান ১৯৮৪-তে। ইতিমধ্যে বিয়ে করেন মাকুরানি সোরেনকে। কলকাতায় ১৪ বছরের পাট চুকিয়ে ফিরে যান ঝাড়গ্রামে ব্যাঙ্কের গ্রামীণ শাখায়। দুই ছেলের বড় জন সনৎসিরজন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিওলজিতে এমএসসি করেছে। ছোট ছেলে সুজন আরামবাগ কলেজ থেকে উদ্ভিদবিদ্যায় বিএসসি। আর মেয়ে মুনমুন দশম শ্রেণির ছাত্রী।

ব্যাঙ্কে কাজ করতেন। সহজেই বাড়ি তৈরির ঋণ পেতেন। একটা পরিচিতিও তৈরি হয়েছিল এখানে। একবারও কি ইচ্ছে হয়নি পরবর্তী প্রজন্মকে কলকাতায় থিতু করার? কালীবাবুর জবাব, “না। জঙ্গলমহলই আমার প্রাণ। বরং কলকাতায় আসার পর এখান থেকেই সাঁওতালি ভাষার চর্চা করতাম। নাট্যচর্চার জন্য খুলেছিলাম কলকাতা ‘খেরোয়াল ড্রামাটিক ক্লাব’। ১৯৮৪ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত বালির কয়েক বন্ধু মিলে ‘মার্শাল গাঁওতা’ নামে সাঁওতালি মাসিক পত্রিকা বার করতাম। পুজো সংখ্যাও হত। সব মিলিয়ে ৪৫টা বই লিখেছি। সব অবশ্য প্রকাশিত হয়নি।“
জীবনপঞ্জীতে অতিরিক্ত তথ্য হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ‘এভেন সারওয়া’ এবং ‘খেরোয়াল জাহের’ নামে দুটি পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন কালীবাবু। তাঁর লেখা বইগুলির একটা বড় অংশ নাটকের ওপর। এ ছাড়া রয়েছে সমাজ সংস্কার এবং আর্থ সামাজিক বিষয়ের বই। দিব্যেন্দু পালিতের একটি উপন্যাস বাংলা থেকে সাঁওতালি ভাষায় এবং উপেন্দ্রনাথ মূর্মূর একটি সাঁওতালি বই ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। ১৯৯২-তে সারা ভারত সাঁওতালি লেখক সংগঠনের পুরস্কার, ২০০৪-এ পেয়েছিলেন রঘুনাথ মূর্মূ ফেলোশিপ। ২০১২-তে রাজ্যের অনগ্রসর কল্যাণ বিভাগের স্বীকৃতি, ২০১৫-র ২৫ এপ্রিল সারা ভারত সাঁওতালি চলচ্চিত্র সমিতির আজীবন কীর্তির এবং ২০১৮-র ৮ নভেম্বর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্মাননা।
কালীবাবুর পদ্মশ্রীপ্রাপ্তির পর তাঁর যোগাযোগের নম্বর দিয়ে এই প্রতিবেদককে সহায়তা করেছেন সাঁওতালি ছবির পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী তথা রাজ্যের মন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদা। ভূমিপুত্রর এ হেন সাফল্যে ভীষণ খুশি বীরবাহা। বলেন, আমরা গর্বিত। খুশি সাধু রামচাঁদ মূর্মূ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডঃ অমিয় কুমার পান্ডা। এই প্রতিবেদককে অমিয়বাবু বলেন, “২৬ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠানে সাধারণতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে কালীবাবুকে প্রধান অতিথি করে তাঁকে দিয়ে পতাকা উত্তোলনের সুযোগ পেলাম। উত্তরীয়, ফুলের স্তবক আর মিষ্টি দিয়ে আমরাই প্রথম তাঁকে শ্রদ্ধা আর অভিনন্দন জানালাম। আমার সঙ্গে ছিলেন ঝাড়গ্রাম রাজ কলেজের অধ্যক্ষ ড দেবনারায়ণ রায়, ঝাড়গ্রাম রাজ (গার্লস) কলেজের অধ্যক্ষ সুশীল বর্মণ। তবে কালীবাবুকে আমরা প্রতিষ্ঠানে আগেও পেয়েছি। গত বছর ৩০ জুন হুল দিবসে স্মারক বক্তৃতা দিয়েছিলেন উনি।
কেমন লাগছে পুরস্কারের ঘোষণায়? কালীবাবুর উত্তর, “সকাল থেকে সমানে ফোন বাজছে। বহু মানুষ দেখা করতে চাইছেন। আমি আপ্লুত। পিছিয়ে থাকা সাঁওতালি সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবি শয়নে-স্বপনে। ‘পদ্মশ্রী’ আমাকে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দেবে। জঙ্গলমহলে মাটির ঘ্রাণে বড় হয়েছি। গরু-ছাগলও চড়াতাম। সেরকম একজন যদি গোটা দেশে স্বীকৃতি পায়, কোনও সাধ কি আর অপূর্ণ থাকে?”

