ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী উদগ্রামের পুজো ৫০০ বছরের প্রাচীন, পুজোর দিনগুলিতে কাঁটাতারের ব্যবধান মুছে মানুষ মেতে ওঠে আনন্দে

স্বরূপ দত্ত, আমাদের ভারত, উত্তর দিনাজপুর, ১৯ সেপ্টেম্বর: প্রাচীনত্বের নিরিখে উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জ ব্লকের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী প্রান্তিক গ্রাম রাধিকাপুরের উদগ্রামের পুজো আজও উজ্জ্বল৷ প্রায় ৫০০ বছর আগে কামানের গোলা দেগে এই পুজোর সূচনা করা হত। দেশ ভাগ হলেও আজও নিয়মনিষ্ঠা মেনে এখানে পূজিতা হন দেবী দশভূজা।

সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার দিকে আজও দেশভাগের যন্ত্রণাময় হাজারো স্মৃতি এসে ভিড় করে উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জ ব্লকের রাধিকাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী উদগ্রামের বাসিন্দাদের মনে। বিশেষ করে পুজোর আগে আকাশের গায়ে কালো মেঘেদের হঠিয়ে যখন এসে ভিড় করত শরতের মেঘের দল তখম মায়ের আগমনী সুর এসে ভিজিয়ে দিত গ্রামের বছরভরের প্রতীক্ষারত মনটিকে। পুজোর চারদিন দূর দূরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজনরা ভিড় করত উদগ্রামে। সহজ সরল আন্তরিকতায় গ্রামবাসীদের উপস্থিতিতে জমে উঠত পুজো প্রাঙ্গণ৷ গ্রামবাসীরা তখন শরতের মেঘকে হাতের মুঠোয় পুড়ে মনের আনন্দে ছুটে বেড়াত কাশ ফুলের বনে বনে।

অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার জমিদার জগদীশচন্দ্র রায় বাহাদুর প্রায় ৫০০ বছর আগে এই গ্রামে পুজোর প্রচলন শুরু করেছিলেন। জমিদার বাড়িতে দেবী আবাহনের সময় কামান ফাটানো হত। সেই শব্দ শোনার পরই মাতৃ আবাহনের সুর ছড়িয়ে পড়ত উদগ্রামের আকাশে বাতাসে। সারা বছরের দুঃখ যন্ত্রণা ভুলে আনন্দময়ী মায়ের আরাধনায় মেতে উঠত অল্পেতে খুশি থাকা মানুষগুলো। তখন পুজোর জৌলুশই ছিল আলাদা। হাজার হাজার গ্রামবাসী এই পুজোর আনন্দে সামিল হতেন। কিন্তু হঠাৎই ছন্দপতন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দু’টুকরো হয়ে গেল সোনার বাংলা। ফলে থেমে গিয়েছিল পুজোর সময় গ্রামবাসীদের শরতের মেঘের আর কাশফুলের সঙ্গে লুকোচুরি খেলা। দেশভাগের যন্ত্রণা বুকে নিয়ে প্রতিবছর এই পুজোর আয়োজন করেন গ্রামবাসীরা৷ তবে কাঁটাতারের ওপারের মানুষরা আর এই পুজোতে সামিল হতে পারেন না। জন্মাষ্টমীর দিন পুরনো প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হলেও সেই কাঠামোতেই নতুন করে মাটির প্রলেপ দেন মৃৎশিল্পীরা৷ পুজোর চারদিন অতীত নিয়ম মেনেই মুখোশ নাচ ও চণ্ডীগানে মাতে গ্রামের আপামর মানুষ। উদ্দেশ্য অশুভ শক্তির বিনাশে গ্রামের মঙ্গল কামনা। একাদশীর দিন গ্রামে মেলাও বসে গ্রামে।

উল্লেখ্য, এই মন্দিরেই এই গ্রামের সব বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। এবং যে কোনো শুভ কাজের নিমন্ত্রণ পত্র সবার আগে মন্দিরে এসে পূজিতা দেবীকেই দিতে হয়। মায়ের আশির্বাদ নিয়েই শ্বশুরবাড়ি যাত্রা করে গ্রামের নববধূরা৷ স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, এই পুজো পূর্বপুরুষদের আমল থেকেই চলে আসছে। বাপ ঠাকুরদার কাছে শুনেছি আগে বাংলাদেশের রাজবাড়িতে পুজোর সময় কামান ফাটানো হত। সেই শব্দ শোনার পরই উদগ্রামে পুজো শুরু হত। এখনো বাংলাদেশের বহু মানুষ পাসপোর্টের মাধ্যমে পুজোর সময় এখানে আসেন। মন্দিরের নামে বেশকিছু জমি রয়েছে গ্রামে। জমিতে ফসল উৎপাদন করে তা বিক্রি করে পুজোর আয়োজন করা হয়। প্রয়োজন পড়লে গ্রামবাসীরা সাধ্যমতো দান করেন মন্দিরে৷ পুজোয় কোনো চাঁদা তোলা হয় না। পুজোর সময় আশপাশের বহু মানুষ সমবেত হন এখানে। ছোট ছোট দুঃখ কষ্টকে সরিয়ে মাতৃ চরণে পুষ্পাঞ্জলি দেন সকলে। মুছে যায় কাঁটাতারের বিস্তর ব্যবধান৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *