স্মৃতির বারান্দা

অশোক সেনগুপ্ত

আমাদের ভারত, ৩০ জুন: খুব বৃষ্টি বা গরমের সময়টা বাদ দিলে দিনের একটা বড় সময় লেখাপড়া করি বাড়ির বারান্দায় বসে। ২০ ফুট রাস্তার ধারে সামনে দুটো তিন কাঠার ফাঁকা প্লট। ভীষণরকম নিরিবিলি পরিবেশ। ছোট-বড়-মাঝারি হরেকরকম গাছ। আক্ষরিক অর্থেই ‘শ্যামলে শ্যামল তুমি, নীলিমায় নীল’।

হরেক পাখি, প্রজাপতি, আকাশ দেখতে দেখতে মৃদুমন্দ হাওয়া গায়ে মেখে কাজ বা অকাজ করি। কবির ভাষায় “আমার নিখিল তোমাতে পেয়েছে তার অন্তরের মিল।“ মাঝে মাঝে ফেরিওয়ালার হাঁক।

কলকাতা এবং পশ্চিমবঙ্গের বহু প্রাচীন বাড়িতে এত সুন্দর সুন্দর বারান্দা আছে যা নিয়ে রীতিমত গবেষণা করা যায়। ছেলেবেলায় দেখা মামার বাড়ি, পিসির বাড়ির বারান্দায় ঢালাই লোহার কারুকাজ করা ফেন্সিংগুলো আজও চোখে ভাসে।

ছবি: নাটোরের রাজবাড়ির বারান্দার গ্রিল। ছবি- লেখক।
দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবন ও সুদৃশ্য কিছু প্রাচীন ভবনের বারান্দা ছবি তোলার রীতিমত আকর্ষণীয় জায়গা। কলকাতায় রাজভবনের বারান্দা, বিধানসভা ভবনের বারান্দা— এগুলো যেন এক একটা স্থাপত্যের বিস্ময়। দেশ-বিদেশের নানা শহরে বিভিন্ন রাজবাড়িতে গিয়ে দু’চোখ ভরে দেখেছি বারান্দার বিস্ময় বা বিস্ময়ের বারান্দা। জানিনা বারান্দা নিয়ে বাংলায় যত লেখালেখি হয়েছে, অন্য ভাষায় ততটা হয়েছে কিনা।

ছবি: ঢাকার একটি অনাথশালার বারান্দা। ছবি- লেখক।
কবিতায় যে কত বারান্দা এসেছে, তার হিসেব কে রাখেন? নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ‘অন্ধকার বারান্দা’-তে লিখেছেন, “সেই সত্যসন্ধ নিষ্পাপ প্রেমিক বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন।“ শ্রীজাত কবিতা লিখেছেন ‘বারান্দা’ নামে। সোমা দত্ত ‘মন খারাপ করা বারান্দা’-র শেষ চার লাইনে লিখেছেন, “ও বারান্দা তোমার হলুদ রোদে/আমার ধূসর স্মৃতির ভার/ রইলো পড়ে অপেক্ষাতে/ রেলিং এর ধারটার।“

সুলতানা শিরীন সাজি লিখেছেন,
“এক চিলতে বারান্দার নির্জনতাটুকু!
ফুল নয়, শুধু পাতাবাহার আর বাহারি সব ক্যাকটাস!
মাঝে মাঝে পাখিরা আসে।
কয়েকটা মৌমাছিও রোজ এসে ঘুরে যায় ফুলের খোঁজে।”

‘আমার জীবন’-এ নবীনচন্দ্র সেন জানিয়েছেন, তিনি
সান্ধ্য আড্ডা শেষে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ির উপরের বারান্দায় সবার সঙ্গে খেতে বসেন। কয়েক বছর আগে বঙ্কিমচর্চা কেন্দ্রের তৎকালীন অধিকর্তা ডঃ সঙ্গীতা ত্রিপাঠী মিত্রের আমন্ত্রণে বন্ধু স্নেহাশিস সুরের সঙ্গে নৈহাটিতে বঙ্কিমচন্দ্রের বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল নজর কেড়েছিল বাড়ির সুন্দর বারান্দা।

ছবি: বাংলাদেশে ভাওয়াল সন্ন্যাসীর বাড়ির বারান্দা। ছবি- লেখক।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখায় নানা সময়ে এসেছে বারান্দা প্রসঙ্গ। ’শ্রীকান্ত’ প্রথম পর্বে শ্রীনাথ বহুরূপীর সেই অসাধারণ ঘটনা— “লাও’ত বটে, কিন্তু আনে কে? ডালিম গাছটা যে দরজার কাছেই; এবং তাহারই মধ্যে যে বাঘ বসিয়া!“ “চক্ষের পলকে বারান্দা খালি হইয়া বৈঠকখানা ভরিয়া গেল—”। আবার ‘লালু’-তে মশার উপদ্রবের বর্ণনা দিতে গিয়ে শরৎচন্দ্র লিখেছেন, “কোথাকার ঘড়িতে চারটা বাজল, বললেন, কামড়া ব্যাটারা, যত পারিস্ কামড়া,— আমি আর পারিনে ; বলেই বারান্দার একটা কোণে পিঠের দিকটা যতটা সম্ভৰ বাঁচিয়ে ঠেস দিয়ে বসে পড়লেন।“ পানিত্রাসের সামতাবেড় গ্রামে জীবনের শেষ বারো বছর ছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। অনেকেই গিয়েছেন সেখানে। বাড়িতে কাঠের বারান্দা চোখে পড়ার মত।

ছবি: মার্বেল প্যালেসের ঠিক পাশে মল্লিকদের তৈরি বাড়ির বারান্দা। ছবি- লেখক।
মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘দক্ষিণের বারান্দা’ তো বিখ্যাত লেখা। ‘জোড়াসাঁকো: হারিয়ে যাওয়া দক্ষিণের বারান্দা’-তে জয়ন্তী মণ্ডল লিখেছেন, “পাঁচ নন্বর জোড়সাঁকো ঠাকুরবাড়ির বৈঠকখানার দক্ষিণের বারান্দা। কালো ডোরাকাটা লাল মেঝে। আরামকেদারায় বসে দুই ভাই। গিরীন্দ্রপুত্র গণেন্দ্রনাথ ও গুনেন্দ্রনাথ। গগনেন্দ্রনাথ লেখায় ব্যস্ত। কখনো নাটক, কখনো গান। গুনেন্দ্রনাথ তখন মগ্ন ছবি আঁকায়। দুজনের সাধনায় রচিত হল স্বদেশ প্রীতির প্রথম গান ও কবিতা। সেই সঙ্গে জন্ম নিল নবযুগের শিল্পরূপটি।“

রবীন্দ্রনাথের লেখায় বার বার এসেছে বারান্দার কথা। “…দক্ষিণের বারান্দার এক কোণে আতার বিচি পুঁতিয়া রোজ জল দিতাম’’ (ঘর ও বাহির, জীবনস্মৃতি, পৃঃ ১৯)। মৃণালিনী আর রবীন্দ্রনাথের বিবাহবাসরের বর্ণনা লিখে গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথের ছেলের স্ত্রী হেমলতা ঠাকুর।
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির পশ্চিমের বারান্দা ঘুরে রবীন্দ্রনাথ বিয়ের ঘরে এলেন।

১৯১৯ সাল থেকে রবীন্দ্রনাথ ‘কোনার্ক’-এ বসবাস করতে শুরু করেন। পরে তৈরি হয় লাল আট থামের বারান্দা। রবীন্দ্রনাথ যখন মাতৃহারা হন, বয়স ১৪–ও হয়নি। শুভেন্দু দাশমুন্সি লিখেছেন, “যখন বারান্দায় দেখলেন সুন্দর করে সাজানো খাটের উপর মাকে, তখনও মৃত্যু যে-ভয়ংকর, সেই কথাটার সম্পূর্ণ অর্থও সেই বয়সে বুঝতেই পারেননি তিনি৷ তবে মায়ের ওই নিথর শরীর যখন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সদর দরজা দিয়ে বাইরে নিয়ে যাওয়া হল, ঠিক সেই সময়টাতে বুকের মাঝখানটায় হাহাকার করে উঠল তাঁর৷ মনে হল, এই বাড়ির দরজা দিয়ে চিরজীবনের ঘরকন্নার মধ্যে মা তো আর নিজের আসনটিতে ফিরে এসে বসবেন না৷ সব কাজ সেরে যখন বাড়ি ফিরলেন কিশোর রবীন্দ্রনাথ, বহু দিন পরেও মনে ছিল, তিনি দেখেছিলেন বাবামশায় তখনও ঘরের সামনের বারান্দায় স্তব্ধ হয়ে উপাসনায় বসে আছেন৷“ রবি ঠাকুরের মা (‘এই সময়’, ১০ মে ২০১৫)।

অমিতাভ ভট্টশালীর লেখায় জেনেছি, জোড়াসাঁকোর মহর্ষি ভবনের দোতলায় পাথরের ঘর বলে পরিচিত রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ কক্ষ। ওই ঘরের পুবদিকের বারান্দায় তাঁর অস্ত্রোপচারের জন্য রীতিমতো একটা অপারেশন থিয়েটার বানানো হয়েছিল (আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৮/১০/২০১৬)।

ছবি: দিল্লির একটি ঐতিহ্যবাহী ভবনের বারান্দায়। ছবি- লেখক।
আজ আর পাঁচ নম্বর বৈঠকখানা বাড়ির দক্ষিণের বারান্দার অস্তিত্ব নেই। ছ’নম্বর বাড়ির দক্ষিণের বারান্দা, বারান্দার পুব কোনের ঘর, জানালার খড়খড়ি আজও একই রকম আছে। শুধু দুই বাড়ির দক্ষিণের বারান্দার মানুষজন, উৎসব-আয়োজন, আলাপ-আলোচনা, হাসি-ঠাট্টা, আড্ডা, মজলিশ কেবলই স্মৃতি। আর অনাদিকালের দিকে তাকিয়ে শুধু অপেক্ষা ‘হে নূতন দেখা দিক আরবার…………’      
মনে ভেসে উঠল জনপ্রিয় গানের সেই কলি—
“বারান্দায় রোদ্দুর আমি আরাম কেদারায় বসে
দু’পা নাচাইরে গরম চায় চুমুক দিই
আমি খবরের কাগজ নিয়ে বসে পাতা ওল্টাইরে।”

খবরের কাগজ এখন অনেকটাই অতীত। বারান্দার আমেজ আর স্মৃতিও কি সেই পথের পথিক?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *