পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি সাহসী!

প্রদীপ দাস, আমাদের ভারত, ৩০ সেপ্টেম্বর: রাজ্যের মানুষের ভয় কমে গেছে। আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি সাহসী। মানুষের প্রতিরোধ এবং প্রতিবাদের ক্ষমতা বেড়েছে বহুগুণ। তারা এখন আধাসেনার বিরুদ্ধেও বিক্ষোভ দেখাতে পারে, হাতাহাতি করতে পারে। সর্বোচ্চ গোয়েন্দা সংস্থার গাড়ির চাকার হাওয়া খুলে দিয়ে তদন্তে বাধা দিতে পারে। এমনকি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকেও প্রাণ বাঁচাতে পালাতে বাধ্য করতে পারে।

শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃতের আছে, ঠাকুর ভক্তদের বলছেন, দেশের বাড়িতে (কামারপুকুরে) হালদার পুকুর ছিল। সেই পুকুরের চারপাশে কিছু লোক বাহ্য করে রাখত। নিষেধ করলেও তারা শুনতো না। গ্রামের মানুষ বাধ্য হয়ে সদরে অভিযোগ জানালেন। একদিন সদর থেকে এক চৌকিদার এল। সে পুকুরের পাড়ে একটা নোটিশ টাঙিয়ে দিল। তাতে লেখা, এখানে বাহ্য করা চলিবে না, আদেশানুসারে। এরপর গোঁফে তা দিয়ে পুকুরের পাড়ে নাক ডেকে ঘুমিয়ে পড়লেন চৌকিদার। যারা বাহ্য করে তারা এসে নোটিশের লেখা দেখল। তারপরে দেখল চৌকিদার ঘুমিয়ে আছে। এই দেখে ভয়ে ভয়ে সবাই চলে গেল। আর কেউ পুকুরপাড়ে বাহ্য করেনি। ধর্মীয় প্রসঙ্গে এই ঘটনার উদাহরণ দিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, চাপরাস চাই অর্থাৎ তকমা বা ক্ষমতা চাই, তা হলে সে বলার অধিকারী হয় বা মানুষ তার কথা মানে। চৌকিদার প্রশাসনের অঙ্গ তাই সে ঘুমিয়ে থাক বা জেগে থাক তাতে কিছু আসে যায় না। প্রশাসনের নির্দেশ এবং তকমাধারী চৌকিদারকে দেখেই মানুষ ভয়ে ভয়ে পালিয়ে গেল।

একসময় পুলিশ বা প্রশাসনের লোক দেখলে মানুষ ভয়ে দূরে সরে যেত। কিন্তু রাজ্যের মানুষ এখন আর এই চাপরাসের অর্থাৎ তকমাধারীদের ভয় পায় না৷ এখন তারা অকুতোভয়। এখন কিছু মনের মত না হলে প্রতিবাদ করতে, এমনকি প্রতিরোধ করতে নিজেরাই রাস্তায় নেমে পড়ে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধেও তারা লড়াই করতে পিছপা হয় না। ভবানীপুর বিধানসভা উপনির্বানের প্রচারের শেষ দিনের ঘটনা এখনো টাটকা। কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা রক্ষী পরিবেষ্টিত দিলীপ ঘোষকে আক্রমণ করতে পিছপা হয়নি মানুষ। এমনকি দিলীপ ঘোষের কাছে পৌঁছতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে হাতাহাতি করতেও দেখা গেছে। আর তাদের নিরস্ত্র করতে সেইবনিরাপত্তা রক্ষীদের পিস্তল উঁচিয়ে ধরতেও দেখা গেছে। কিন্তু তাতেও হামলাকারীরা পিছু হটেনি। তারা অকুতোভয়।

শুধু এই ক্ষেত্রেই নয় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ভোট পরবর্তী হিংসা নিয়ে সিবিআই তদন্ত চলছে। সেই তদন্তকারীরাও পড়েছেন বাধার মুখে। নদীয়া চাপড়ায় তাদের ঘিরে ধরে বিক্ষোভ দেখানো হয়েছে। এমনকি গোয়েন্দাদের গাড়ির চাকার হাওয়া খুলে দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রেও হামলাকারীরা অকুতোভয়।

শুধু গ্রাম জেলা নয়, রাজধানী কলকাতার বুকেও সিবিআইয়ের তদন্তকারীরা হামলার মুখে পড়েছেন। যাদবপুরে মানুষের “স্বতঃস্ফূর্ত” বাধার ফলে তারা পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। বঙ্গবাসীর সাহসিকতার আরও প্রমাণ পাওয়া গেছে ভোটের ফলাফল বেরোনোর ঠিক পরেই পূর্ব মেদিনীপুরে। এলাকার পরিস্থিতি দেখতে গিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। কিন্তু সাহসী মানুষজনের বাধায় তিনি সেখানে পৌছতেই পারেননি। রাস্তার মাঝে অকুতোভয় বঙ্গবাসী আগেই জড়ো হয়ে ছিল। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর গাড়ি পৌছতেই লাঠিসোঁটা নিয়ে বেড়িয়ে আসে, ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। প্রতিরোধের মুখে পড়ে প্রাণ বাঁচাতে পালাতে হয়েছিল কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে।

এই সাহসিকতার পরিচয় অনেক আগে থেকেই দেখতে শুরু করেছে বঙ্গবাসী– কলকাতার আলিপুরে। সেখানে সাধারণ মানুষের আক্রমণে পুলিশকে টেবিলের তলায় লুকিয়ে প্রাণ বাঁচাতে দেখা গেছে। এর থেকেই বোঝা যায় পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আগের তুলনায় অনেক সাহসী হয়েছে। সংঘবদ্ধভাবে তারা প্রতিবাদ, প্রতিরোধে নেমে পড়ছে। এর পাশাপাশি সমাজ বিরোধীরাও আগের তুলনায় অনেক সাহসী হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন এলাকায় তাদের দাপাদাপিও মানুষের নজরে পড়ছে। প্রশাসনের নির্দেশ উপেক্ষা করেও নিজেদের কাজ হাসিল করতে শিখে গেছে একশ্রেণির মানুষ। যত দিন যাচ্ছে এই সাহসিকতা পরিচয় বেশি করে পাওয়া যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *