অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, ৩১ জানুয়ারি: বিজেপি-র মরিচঝাঁপি অভিযান নিয়ে দলের মধ্যেই শুরু হয়েছে চাপান উতোর। অভিযোগ উঠেছে দীর্ঘদিনের কর্মীদের স্বীকৃতি না পাওয়ার।
বিজেপি-র তরফে জানানো হয়েছে, ১৯৭৯র ২৪ থেকে ৩১ জানুয়ারি জ্যোতি বসুর সিপিএম সরকার মরিচঝাঁপি দ্বীপে বসবাসকারী কয়েক হাজার উদ্বাস্তুকে পুলিশ ও গুণ্ডা লেলিয়ে উৎখাত করে ও কয়েকশ মানুষকে হত্যা করে। এই নৃশংসতার প্রতিবাদে, পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তু স্বার্থ রক্ষায় ডাক দেওয়া হয়েছে মরিচঝাঁপি উদ্বাস্তু গণহত্যা দিবস-এর।
কলকাতা থেকে সোমবার মরিচঝাঁপি গিয়েছেন দলের অন্যতম রাজ্য সাধারণ সম্পাদক অগ্নিমিত্রা পাল, অন্যতম রাজ্য মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার, দুই বিধায়ক অশোক কীর্তনিয়া ও অম্বিকা রায়, অভিযানের নেতৃত্বে ডাঃ সুদীপ দাস। এদিন কুমিরমারি এবং মরিচঝাঁপি-তে ভাষণ দেন তাঁরা।
বিজেপি-র বিভিন্ন শাখা ভেঙে দেওয়ার পর এখনও রাজ্য সভাপতি সেগুলো পুনর্গঠন করেনি। সূত্রের খবর, দলের খোলনলচে বদলাতে গিয়ে প্রবল ক্ষোভের মধ্যে পড়ে নেতৃত্ব রীতিমত বিভ্রান্ত। তাই শাখা পুনর্গঠনে ‘ধীরে চলো’ নীতি নিতে চাইছেন নেতৃত্ব। ২০১৫-তে সরকারিভাবে তৈরি হয় দলের উদ্বাস্তু শাখা। প্রথম থেকেই এর দায়িত্বে আছেন ডঃ মোহিত রায়। নানাভাবে উদ্বাস্তু আন্দোলন প্রসারে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন।

সোমবারের মরিচঝাঁপি অভিযানে এই উদ্বাস্তু শাখা-কে অন্ধকারে রেখে পরিকল্পনা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ। দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দলের তফশিলি জাতি মোর্চা-কে। এতে ক্ষুব্ধ উদ্বাস্তু শাখা-র কর্মকর্তারা। মোহিতবাবুকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলে এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, “অন্তত আড়াই দশক ধরে উদ্বাস্তুদের নিয়ে কাজ করছি। সিএএ নিয়ে আলোচনার সময়ে অমিত শাহ কলকাতায় এসে বিষয়টি নিয়ে ঘরোয়া এবং প্রকাশ্য আলোচনা করেছিলেন। নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে সেই সভায় তাঁর সামনে আমি বক্তব্য রেখেছিলাম। বেশ কিছুদিন ধরে দেখা যাচ্ছে কখনও মতুয়া, কখনও মরিচঝাঁপির মত সংবেদনশীল বিষয়গুলোকে নিয়ে আলাদা আন্দোলন হচ্ছে। আমরা পরে জানতে পারছি প্রচারমাধ্যম থেকে। এটা খুব দুঃখের এবং হতাশার।”
আপনিকি ক্ষোভের কথা দলীয় নেতৃত্বকে জানিয়েছেন? এই প্রশ্নের জবাবে মোহিত রায় বলেন, “না, কাউকেই জানাইনি। আপনি জোরাজুরি করায় সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া জানালাম। আগে একাধিকবার দলে প্রতিবাদ করেও কোনও জবাব পাইনি। এখন প্রার্থনা করে সুবিচার চাইতে হবে? আমার অতীতের ধারাবাহিকতা, আনুগত্য—এসব তো দলের অভিভাবকদের জানতে হবে!“
তবু ঘরে বসে না থেকে মরিচঝাঁপি দিবস উপলক্ষে সোমবার সন্ধ্যায় যাদবপুর বাস স্ট্যান্ডের সামনে সমাবেশ ও প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের ডাক দিয়েছেন। থাকবেন দলের কলকাতা জেলা সভানেত্রী সংঘমিত্রা চৌধুরী। প্রাক্তন সাংবাদিক তথা চলচ্চিত্র নির্মাতা সংঘমিত্রা তাঁর তথ্যচিত্রে মরিচঝাঁপিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। কিছুকাল আগে তাঁর ছবি গোয়ায় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘ইন্ডিয়ান প্যানেরামা’ বিভাগে প্রশংসিত হয়। দলের পুরনো কর্মী সংঘমিত্রা এই প্রতিবেদককে রবিবার রাতে বলেন, “আমিও এই অভিযানের কথা কিছুই জানি না। আপনার কাছে শুনলাম। দল আমাকে ঠিক যেটুকু কাজ দেয়, সেটাই নিষ্ঠা সহকারে করি।“
সংঘমিত্রার কথায়, “গত ৫০ বছরে গোটা পশ্চিমবঙ্গে যে কয়টি নারকীয় হত্যাকান্ড ঘটেছে আমার ছবি তারই চলচ্চিত্রায়ন। প্রায় এক বছর ধরে গবেষণা করে এই ছবির চিত্রনাট্য তৈরি হয়েছে। চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি ডকু ফিচার আকারে পরিবেশন করা করা হয়। বেশ কিছু দৃশ্যকে আমরা পুনর্নির্মাণ করেছি যেমন সাঁইবাড়ি, মরিচঝাঁপি, নন্দীগ্রাম, সন্দেশখালি, প্রভৃতি জায়গার ঘটনাকে নতুন করে চিত্র রূপ দেওয়া হয়েছে। ছবিটি তৈরি করার সময় অনেক রাজনৈতিক বাধা বিপত্তি এসেছে। করোনার সময় শুটিং করতে পারিনি বেশ কিছু দিন। কিন্তু তা সত্বেও ছবিটা আমরা খুব যত্নসহকারে তৈরি করেছি। সেন্সর করতে গিয়ে আর এক বিপত্তি। অনেক সময় লেগেছে কারণ এটা কলকাতা সেন্সার অফিস দায়িত্ব এড়িয়ে গেছে। আবার আমাকে মুম্বাই সেন্সার অফিসে পাঠিয়ে তারপর সেন্সর করাতে হয়েছে।”
২০১৬-তে বিধানসভা ভোটে বিজেপি যাদবপুর কেন্দ্রের প্রার্থী করেছিল মোহিত রায়কে। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, “মানসিকভাবে আমরা আহত। সাম্প্রতিক অতীতে উদ্বাস্তু প্রসঙ্গে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় অনেক সভা করেছি। অর্থও বরাদ্দ হয় না। সময়, অর্থ, নিষ্ঠার প্রতিদান যদি এ রকম হয়, কিছু বলার নেই। দলের ভালো হোক।“

