“আর যে মুহূর্তে নিজেরা বুঝতে পেরেছেন যে বাঙালি হিন্দুর জন্য তৈরি পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের হাতে আর মার খাওয়ার ভয় নেই, আর মুসলমানদের হাতে স্ত্রী, কন্যা, বোন, মায়ের সম্মানহানির ভয় নেই, তখনই কমিউনিস্ট সুলভ নতুন ন্যারেটিভ একের পর এক হাজির করেছেন- এ লড়াই পেটের লড়াই, এ লড়াই হিন্দু মুসলমানের লড়াই নয়। মানুষকে বুঝিয়েছেন – মুসলমানদের রক্তে বোনা ধানে হিন্দুর বেঁচে থাকা।”
শান্তনু সিংহ, কলকাতা, ১৫ অক্টোবর: পাঁচজন বাঙালি বামপন্থী বুদ্ধিজীবীর নাম বলি – অমর্ত্য সেন, চিদানন্দ দাশগুপ্ত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, সমরেশ বসু।
পাঁচজন বাঙালি বামপন্থী সিনেমা শিল্পীর নাম বলি – রবি ঘোষ, ভানু বন্দোপাধ্যায়, উৎপল দত্ত, শ্রীলেখা মিত্র, অপর্ণা সেন।
পাঁচজন বাঙালি বামপন্থী সংগীত শিল্পীর নাম বলি – হেমাঙ্গ বিশ্বাস, অজয় চক্রবর্তী, নির্মলেন্দু চৌধুরী, জর্জ বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র।
পাঁচজন বাঙালি বামপন্থী রাজনীতিবিদের নাম বলি – জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্ত, প্রশান্ত শূর, সুভাষ চক্রবর্তী, চারু মজুমদার।
এদের কেউই ইসরাইলকে কখনো সমর্থন করেননি। এদের কেউই ফিলিস্তিনিদের উপর থেকে কখনো সমর্থন তুলে নেননি। এদের কেউই কোনওদিন আরএসএস করেননি। এদের কেউই কোনঅদিন বীর সাভারকরের স্তুতি করেননি। এদের কেউই কোনওদিন ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে ভালো বলেননি।
কিন্তু এত “না” করা সত্ত্বেও এরা কেউই কোনওদিন মুসলমানদের ভাব, ভালোবাসা, বিশ্বাস অর্জন করতে পারেননি। এত “না” করা সত্ত্বেও এরা কেউই কোনদিন কাফের থেকে মুমিন হতে পারেননি। এত “না” করা সত্ত্বেও এরা কেউই কোনওদিন পাক (পবিত্র) ভূখন্ড পাকিস্তানে থাকতে পারেননি। এত “না” করা সত্ত্বেও এরা কেউই কোনওদিন পাক (পবিত্র) ভূখন্ড পাকিস্তানে নিজের মা বোনকে ধর্ষণের শিকার না হতে দিয়ে থাকা যায় ভাবতে পারেননি।
তাই ওরা প্রত্যেকে নিজেদের বাপ ঠাকুরদার জমি জায়গা ছেড়ে, মা, বোন, স্ত্রী, কন্যাকে নিয়ে “মুসলমান” এর দেশ পাকিস্তান ত্যাগ করে হিন্দুর দেশ হিন্দুস্তানে আশ্রয় নিয়েছিলন। আরো পরিষ্কার বললে, হিন্দু বাঙালির জন্য তৈরি পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
আর যে মুহূর্তে নিজেরা বুঝতে পেরেছেন যে বাঙালি হিন্দুর জন্য তৈরি পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের হাতে আর মার খাওয়ার ভয় নেই, আর মুসলমানদের হাতে স্ত্রী, কন্যা, বোন, মায়ের সম্মানহানির ভয় নেই, তখনই কমিউনিস্ট সুলভ নতুন ন্যারেটিভ একের পর এক হাজির করেছেন- এ লড়াই পেটের লড়াই, এ লড়াই হিন্দু মুসলমানের লড়াই নয়। মানুষকে বুঝিয়েছেন – মুসলমানদের রক্তে বোনা ধানে হিন্দুর বেঁচে থাকা।
দেশভাগের পর ওপার বাংলা থেকে পালিয়ে আসা উদ্বাস্তু বাঙালি যখন বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত, এক টুকরো জমি পাবার জন্য যখন বিভিন্ন উদ্বাস্ত কলোনি প্রতিষ্ঠা করছে, তখন কমিউনিস্টরা তাদের চিরাচরিত নতুন ন্যারেটিভ নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। বাস্তহারা সহায়তা সমিতি নামে তারা উদ্বাস্তু বাঙালির মন জয় করার জন্য উদ্বাস্ত কলোনিগুলিকে প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু মানুষকে কখনো বুঝতে দেননি, এই দেশভাগ করে হিন্দু বাঙালিকে এভাবে উদ্বাস্ত হয়ে পূর্বপুরুষদের জমি বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসার জন্য সবচেয়ে বড় দায়ী যারা তারাই, এই কমিউনিস্টরা, মুসলিম লীগ নয়। কারণ মুসলিম লীগের দাবি, “পাকিস্তান”কে অমুসলমান একটি দল হিসেবে যারা প্রথম সমর্থন করেছিলেন এবং রাজনৈতিক ও বুদ্ধি প্রেরণা জুগিয়েছিলেন, তাঁরা হচ্ছেন এই কমিউনিস্টরা। পার্টির পলিটব্যুরোয় প্রস্তাব পাস করা হয়েছিল – পাকিস্তানের দাবি একটি ন্যায়সঙ্গত এবং গণতান্ত্রিক দাবি। মুসলমানদের আলাদা দেশ নেবার অধিকার আছে।
কিন্তু মজাটা হচ্ছে কোনও কমিউনিস্ট দেশে “মুসলিম লীগ” নেই, আর কোনও মুসলমান দেশে “কমিউনিস্ট পার্টি” নেই।
তাহলে আর.এস.এস. এর সদস্য না হয়ে হিন্দু মহাসভার সমর্থক না হয়ে, ইসরাইলের সমর্থক না হয়ে, প্যালেস্তাইনের সমর্থক হয়েও, ওই সমস্ত বাঙালি হিন্দু কমিউনিস্টদের পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে হিন্দু বাঙালির জন্য গঠিত পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে আসতে হলো কেন? আর তারপর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হয়ে যাওয়ার পর তারা তাদের ধর্মনিরপেক্ষ সার্টিফিকেট নিয়ে নিজেদের পূর্বপুরুষের ভিটাতে ফিরে যেতে পারলেন না কেন? এই সত্যকে চেপে রাখার জন্যই কমিউনিস্টদের নিত্যনতুন ধর্মনিরপেক্ষ ন্যারেটিভ।
হিন্দু বাঙালি মুসলমানের দেশ পূর্ব পাকিস্তানের থেকে উদ্বাস্তু হল কেন? যে কারণে হিন্দু বাঙালি মুসলমানের দেশ পূর্ব পাকিস্তান থেকে উদ্বাস্ত হয়েছে, ঠিক একই কারণে মুসলমান ফিলিস্তিনিরা ইসরাইলের ইহুদিদের উদ্বাস্তু বানাতে চেয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি মুসলমানদের যা ছিল অনুপ্রেরণা, পাঁচ হাজার কিলোমিটার দূরে ফিলিস্তিনিদের অনুপ্রেরণার আধার একই। দেশ কাল, মানুষ, সভ্যতা হিসেবে ওই অনুপ্রেরণার একটি দাড়ি-কমাও পরিবর্তন করা যাবে না; সেটা পূর্ব পাকিস্তানে হোক, অথবা প্যালেস্টাইনে কিংবা ভারতবর্ষে।
কারণ অমুসলমান অর্থাৎ কাফেরদের বিরুদ্ধে লাগাতার লড়াই করতে হবে, যতক্ষণ না কাফের মুক্ত পৃথিবী তৈরি করা যায়। কারণ কাফের হচ্ছে পাপের (ফেতনা) কারণ। তাই মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে নাযিল করেছেন –
“আর তোমরা তাদের সাথে লড়াই কর, যে পর্যন্ত না ফেতনার অবসান হয় এবং আল্লাহ্র দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হয়| অত:পর যদি তারা নিবৃত হয়ে যায় তাহলে কারো প্রতি কোনও জবরদস্তি নেই, কিন্তু যারা যালেম (তাদের ব্যাপারে আলাদা)| “২-১৯৩
“তোমাদের উপর যুদ্ধ ফরয করা হয়েছে, অথচ তা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয়| পক্ষান্তরে তোমাদের কাছে হয়তো কোনও একটা বিষয় পছন্দসই নয়, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর| আর হয়তোবা কোনও একটি বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয় অথচ তোমাদের জন্যে অকল্যাণকর| বস্তুত: আল্লাহ্ই জানেন, তোমরা জান না|” ২-২১৬

“আর তাদেরকে হত্যাকর যেখানে পাও সেখানেই এবং তাদেরকে বের করে দাও সেখান থেকে যেখান থেকে তারা বের করেছে তোমাদেরকে| বস্তুত: ফেতনা ফ্যাসাদ বা দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করা হত্যার চেয়েও কঠিন অপরাধ| আর তাদের সাথে লড়াই করো না মসজিদুল হারামের নিকটে যতক্ষণ না তারা তোমাদের সাথে সেখানে লড়াই করে| অবশ্য যদি তারা নিজেরাই তোমাদের সাথে লড়াই করে| তাহলে তাদেরকে হত্যা কর| এই হল কাফেরদের শাস্তি| ” ২-১৯১
“অতএব যারা কাফের হয়েছে, তাদেরকে আমি কঠিন শাস্তি দেবো দুনিয়াতে এবং আখেরাতে-তাদের কোনও সাহায্যকারী নেই|” ৩-৫৬
“খুব শীঘ্রই আমি কাফেরদের মনে ভীতির সঞ্চার করবো| কারণ, ওরা আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করে যে সম্পর্কে কোনও সনদ অবতীর্ণ করা হয়নি| আর ওদের ঠিকানা হলো দোযখের আগুন| বস্তুত: জালেমদের ঠিকানা অত্যন্ত নিকৃষ্ট| “৩-১৫১
পবিত্র কোরআনের ছত্রে ছত্রে এই কাফের হত্যা করার আহ্বান করা হয়েছে এবং এই কাফের হত্যার ক্ষেত্রে কাফেরদের নারী, একদিনের পুত্র বা কন্যাকেও হত্যা করার আহবান জানিয়েছেন সালাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাসুল মোহাম্মদ।
কাফিরদের নিহত নারী শিশুদের সম্পর্কে সাহাবীগণ রসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন “মুশরিকদের শিশু সন্তান সম্পর্কে, যখন রাতের অন্ধকারে আকস্মিক হামলা করা হয় তখন তাদের নারী ও শিশুরাও আক্রান্ত হয়।” তখন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ “তারাও তাদের (মুশরিক যোদ্ধাদের) অন্তর্ভুক্ত”। [সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৪৪৪১]।
অর্থাৎ হত্যার অনুমতির ব্যাপারে যুদ্ধরত পুরুষদের উপর যে হুকুম তাদের ক্ষেত্রেও অনুরূপ। রসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর সাহাবীদের এই ধরনের যুদ্ধের অনুমতি প্রদান করেছেন যেখানে পুরো পরিবারই নিহত হচ্ছে। সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেনঃ “আমি নিজে নয়টি পরিবারের সকল লোককে হত্যা করেছি।” [আল তাবারানি]
তাই উপরোক্ত হাদিস থেকে এটা পরিস্কার যে, মুসলমানদের সাথে যুদ্ধরত দেশের জনসাধারণের উপর মুসলমানদের বোমা বিস্ফোরণ, রাইফেল বা বন্দুক কিংবা অন্য কোনো উপায়ে হামলা করা জায়েজ যদিও তা তাদের বেসামরিক লোকদের মৃত্যুর কারণ হোক না কেন।
উপরের হাদিসগুলো থেকে এটা পরিস্কার যে, মুসলমানদের সাথে যুদ্ধরত দেশের জনসাধারণের উপর মুসলমানদের বোমা বিস্ফোরণ, রাইফেল বা বন্দুক কিংবা অন্য কোনো উপায়ে হামলা করা জায়েজ যদিও তা তাদের বেসামরিক লোকদের মৃত্যুর কারণ হোক না কেন।

তাহলে যে প্রেরণায় ইহুদি হত্যা করা যায়, সেই একই প্রেরণায় হিন্দু হত্যা করা যায়। কমিউনিস্টরা ধর্মনিরপেক্ষ হলেও। আর এই প্রেরণাতেই তৈরি হয়েছে :
নাইজেরিয়ায় বোকো হারাম ।
লেবাননে হিজবুল্লাহ।
আফগানিস্তানের তালিবান।
ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসআইএস।
প্যালেস্টাইন ও ইসরাইলে হামাস।
পাকিস্তানে লস্কর-ই-তৈয়বা।
এবং ভারতবর্ষে কংগ্রেস-কমিউনিস্ট।
(লেখক শান্তনু সিংহ একজন আইনজীবী। তাঁর এই মন্তব্য একেবারেই তাঁর নিজস্ব, এর জন্য আমাদের ভারত কোনও ভাবেই দায়ি নয়।)

