শ্রমজীবী নিয়ে বাঙালি মনীষীর অনুভব

কল্যাণ গৌতম
আমাদের ভারত, ১ মে: ঊনিশ শতকে বঙ্গসাহিত্যে ‘শ্রমজীবী’ নিয়ে প্রথম কবিতাটি লিখেছিলেন শিবনাথ শাস্ত্রী। ১৮৭৪ সালে লেখা কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘ভারত শ্রমজীবী’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যায়। পত্রিকাটি সম্পাদনা করতেন শশিপদ বন্দ্যোপাধ্যায়। কবিতাটির কিছু অংশ দেওয়া গেলো — “উঠ জাগো শ্রমজীবী ভাই! উপস্থিত যুগান্তর চলাচল নারীনর ঘুমাবার আর বেলা নাই, উঠো জাগো ডাকিতেছি তাই।”

তার মানে, জাতিকে স্বদেশী মন্ত্র দিতে শিবনাথ শাস্ত্রী যেমন অগ্রণী ছিলেন, একইভাবে শ্রমজীবী মানুষকে তাতে সামিল করার ব্যাপারেও ছিলেন সমান উৎসাহী। সমাজতন্ত্রের আদর্শ ভারতীয় ধারার মধ্যেই লালন করেছিলেন বঙ্কিম, বিবেকানন্দ এবং শিবনাথ শাস্ত্রী। তাঁদের চিন্তাধারার নানান পরতে সমাজতান্ত্রিক ভাবনা। অথচ ভারতীয় বাম ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে উনারা অচ্ছুৎ। প্রতিষ্ঠিত সমাজের মধ্যে থেকেই এই ‘ত্রয়ী’ সাম্যের গান গেয়েছেন, অধিকারের সমতার কথা বলেছেন। কিন্তু শাশ্বত জীবনমূল্যকে অস্বীকার করতে চাননি তাঁরা। শাশ্বত সমাজ ভাবনাকে অস্বীকার করে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা কী করে তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়ে তা বিশ্ববাসী দেখেছে। বেশি বলার দরকার নেই।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ প্রবন্ধে যে রায়তদের দুর্দশার চিত্র দেখান, সেখানে ‘রামা কৈবর্ত’ আর ‘হাসিম শেখ’ আলাদাভাবে হিন্দু কিংবা মুসলমান নন। তারা কৃষকদের একটি শ্রেণি, প্রতীক চরিত্র। তারা অসহায়, অবহেলিত, শোষিত, বঞ্চিত। যারা তাঁকে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে গাল দেন, তারা বরং ভাবুন, ‘ভাবা প্র্যাকটিস করুন’ মার্কসবাদী দীক্ষায় দীক্ষিত না হয়েও বঙ্কিমচন্দ্র কিভাবে বাংলায় সাম্যবাদের বীজ বপন করে গেছেন। মনে রাখবেন, ‘সাম্য’ নামে তাঁর একটি প্রবন্ধও আছে।

জনৈক কলকাতাবাসী প্রথম আন্তর্জাতিকের সভায় (১৫ আগষ্ট, ১৮৭১) চিঠি পাঠিয়ে উল্লেখ করেছিলেন, ভারতবর্ষে শ্রমিক ও অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষ চরম দুর্গতির মধ্যে অবস্থান করছে। অথচ ব্রিটিশ আধিকারিকরা চরম বিলাসবহুল জীবনযাপন করে। এই চিঠি কে লিখেছিলেন? বঙ্কিম না শিবনাথ? না কি অন্য কোনো সংবেদী মানুষ, যিনি সমাজতন্ত্র স্বীকার করতেন ভারতীয় আদর্শের মধ্যে থেকেই, তাই সায় দিতে পারেননি বিশ্বধারার সঙ্গে। হয়তো তিনি বহুদিন ধরেই সমাজতন্ত্রের ভারতীয় সংস্করণের পক্ষপাতী ছিলেন। মনের মিল হলেও সুরের মিল হল না।

পয়লা মে শ্রমিক দিবস পালন ভারতীয় ঘরানা নয়। শ্রমের দেবতার পুজো দিয়েই ভারতবর্ষে শ্রমিক দিবস পালিত হয়ে এসেছে। শ্রমের দেবতা বিশ্বকর্মা, আর শ্রমিক দিবস হচ্ছে ভাদ্র সংক্রান্তিতে বিশ্বকর্মা পুজোর দিন। ‘বিশ্বকর্মা’ নামের মধ্যেই ‘বিশ্ব’ তথা আন্তর্জাতিকতার সুবাস আছে। কাজেই বিশ্বকর্মা পুজোর দিনটা কেবল ভারত কেন বিশ্ব শ্রমিক দিবস হবার উপযুক্ত। ভারতে বিশ্বকর্মা পুজোর দিন সরকারিভাবে শ্রমিক দিবস হোক। যারা (বিশেষ করে বাংলায়) মদ-সংস্কৃতি ও অসভ্যতামি চালু করে এই দিনটিকে কলুষিত করেছেন তাদের ক্লোজ করে, দিনটির মর্যাদা ফিরিয়ে আনুন।

বিশ্বকর্মা পুজোর দিন ভারতের শ্রমিকরা আপন কর্মোন্নতির জন্য তাঁর কাছে প্রার্থনা জানান। তিনি নির্মাতা, তিনি কর্মকার। ভারতীয় শ্রমিক মজুরের বিশ্বাস বিশ্বকর্মা শিল্পের দেবতা, সহস্র শিল্পের আবিষ্কারক। তিনি সহস্র শিল্প বিদ্যার অধিকারী। সনাতনী সংস্কৃতিতে বিশ্বকর্মাকে বিশ্বের যাবতীয় স্থাপনার আশীর্বাদক দেবতা বলে মান্যতা দেওয়া হয়েছে। সকল কর্মের কারিগরী-দেবতা তিনি, সকল যন্ত্রের যন্ত্রী-দেব, সকল প্রযুক্তির প্রকাশ-শক্তি। স্থাপত্যবেদের রচয়িতা, সর্বদর্শী ভগবান। তাঁর চোখ, মুখ, বাহু, পদযুগল সর্বদিক জুড়ে রয়েছে। তাই দিয়েই তিনি ত্রিভুবন নির্মাণ করেছেন। শিল্পকে প্রকাশ করেছেন, অলঙ্কার সৃষ্টি করেছেন, দেবতাদের বিমান, রথ নির্মাণ করেছেন, নির্মাণ করেছেন দেবতাদের সকল অস্ত্র। তিনি দেবতাদের পুষ্পক রথ নির্মাণ করেছেন, করেছেন শ্রীবিষ্ণুর সুদর্শন চক্র, শিবের ত্রিশূল, লক্ষ্মীর কোষাধ্যক্ষ, কুবেরের কুবের পাস, কার্তিক বল, লঙ্কা নগরী, পঞ্চপান্ডবের ইন্দ্রপ্রস্থ তৈরি এবং শ্রীক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ জগন্নাথের বিগ্রহ নির্মাতা। এক জন স্থাপত্য শিল্পী। দ্বারকাপুরী তাঁরই পারদর্শিতায় তৈরি হয়েছে, হয়েছে দ্বারকা-নগরীর বাস্তুবিদ্যার পরিকল্পনা। পৃথিবীর সকল গতির গন্তব্য-সহায়ক দেবতা৷ তাঁকে বিনম্র প্রণাম করে, স্মরণ-মনন করে কাজে নিয়োজিত হন শ্রমিকরা। তাঁর আশিস প্রার্থনা করে দুঃসাহসিক নির্মাণ কর্মে ব্রতী হন। কাজেই তাঁর বাৎসরিক আরাধনার দিনটি অর্থাৎ ভাদ্রের সংক্রান্তিটি শ্রমের পুজো, শ্রমিকের স্বীকৃতি আর শ্রমিক-দেবতার আশীর্বাদ প্রার্থনার দিন।

একটি আপাদমস্তক বামপন্থী-শালুতে মোড়া ১ লা মে ভারতে শ্রমের পরব হতে পারে না। কারা পালন করছেন? না, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। মনে রাখতে হবে নামটি কিন্তু ‘ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি’ নয়। অর্থাৎ এই কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে ভারতীয়ত্ব নেই, ভারতীয় বোধ নেই; দলটি কেবলমাত্র আন্তর্জাতিক পার্টির ভারতীয় শাখা। তার আবার নানান শাখা-প্রশাখা। সবকটি দল-ই ভারতীয়ত্বের বিরোধী। এদের কাছ থেকে ভারতীয় সংস্কৃতি আশা করা যায় না। যদিও এরা নিজেদের ধর্ম নিরপেক্ষ বলে থাকেন, কিন্তু একটি বিশেষ ধর্মের কর্তা-ব্যক্তি দেখলেই ‘ধর্মপ্রাণ’ হয়ে যান। মুসকিল হল, কেউ নিজেকে ‘হিন্দু’ বলে গর্ব বোধ করলে, তাকে ‘সাম্প্রদায়িক’ আখ্যা দেন। এরা একটি বিশেষ ধর্মে নাড়া বেঁধে বসে রয়েছেন। এটা তো ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ হল না।

এদিকে, ভারতবর্ষের মধ্যেই বহু মনীষার চিন্তা চেতনার পরতে পরতে ছিল সমাজতত্ত্ব। শ্রীচৈতন্যদেব থেকে শুরু করে বঙ্কিমচন্দ্র, শিবনাথ শাস্ত্রী, স্বামী বিবেকানন্দ প্রমুখের নাম এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য। তা সত্ত্বেও ভারতীয় মনীষায় সমাজতান্ত্রিক দল গঠিত হয় না; তৈরি হয় না ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (বিবেকানন্দবাদী), ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (চৈতন্যবাদী)-র মত দল। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির শেকড় ভারতে নয়, ভারতের বাইরে — কখনও হেড অফিস রাশিয়া, কখনও চীন, কখনও কিউবা।

আপনারা দেশের সমস্ত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের অনুরোধ করুন, তারা যেন প্রথমে ভারতীয় হন, ভারতের সীমার মাঝেই ভারতীয়ত্ব খোঁজেন, ভারতের প্রাচীন ইতিহাস আর সংস্কৃতিকে মান্যতা দেন। তারপর বরং দুনিয়ার কমিউনিজমের সুলুকসন্ধান করতে বেরোন। তাদের বলুন, “আগামী বিশ্বকর্মা পুজোর দিনটিতে ভারতীয় রীতি মেনে শ্রমের পুজো আর শ্রমিকের পুজো করুন @কমরেড।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *