“বাংলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে আমাকে হারাতে নেমেছে কেন্দ্রীয় সরকার”, ৮ দফা নির্বাচন নিয়ে তীব্র আক্রমণ মমতার

রাজেন রায়, কলকাতা, ২৬ ফেব্রুয়ারি: আমি মহিলা মুখ্যমন্ত্রী বলে আমাকে হারাতে নেমেছে গোটা কেন্দ্রীয় সরকার। তামিলনাড়ুতে ২৪০ আসন হওয়া সত্বেও সেখানে এক দফায় নির্বাচন আর পশ্চিমবঙ্গে হতে চলেছে আট দফায়। পশ্চিমবঙ্গের বিরুদ্ধে কি যুদ্ধ ঘোষণা করেছে কমিশন? নির্বাচনের পরেই প্রশ্ন তুললেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

২০১১ সালে পরিবর্তনের বছর এই রাজ্যে ৬ দফায় নির্বাচন হয়েছিল। পরের বার ২০১৬তে এই নির্বাচন হয়েছিল সাত দফায়। আর এবার অর্থাৎ ২০২১-এ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন নজিরবিহীনভাবে হতে চলেছে ৮ দফায়। তার মধ্যে একটি জেলাকে দুই থেকে তিন দফায় ভাগ করা হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্যই এই ধরনের ঘোষণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ মুখ্যমন্ত্রীর।

যদিও কমিশনের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে বিজেপি, কংগ্রেসের মতো বিরোধী দলগুলি। তবে কমিশনের এই সিদ্ধান্তকে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে শাসক তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায়ের কথায়, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে কমিশন যে বিমাতৃসুলক আচরণ করে তা ফের প্রমাণ হল। কী কারণে এত দফায় এই নির্বাচন করা হচ্ছে, তার কোনও স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।

আট দফার এই ঘোষণা করে রাজ্যকে অপমান করেছে কমিশন বলেই জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাকে আমি খুব ভাল চিনি। আপনাদের সব চক্রান্ত ভেঙে দেব বাংলার মানুষ। কারণ বাংলার মানুষই বাংলা শাসন করবে। এই ঘোষণায় আমি দুঃখিত ও ব্যথিত।’

কালীঘাটে এদিন নিজের বাড়িতে সংক্ষিপ্ত সাংবাদিক সম্মেলনে মমতা কার্যত নিজের ক্ষোভ উগরে দেন। নজীরবিহীন ভাবে যেভাবে বাংলায় ৮ দফায় ভোট ঘোষণা করা হয়েছে তা নিয়েই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে মমতা বলেন, ‘ভোটের দিনক্ষণ কী নরেন্দ্র মোদী আর অমিত শাহ ঠিক করে দিয়েছে? এটা লজ্জার যে কমিশন একটি রাজনৈতিক দলের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। বাংলার সঙ্গে বাকি যে চারটি রাজ্যে ভোট হচ্ছে সেখানেও এত দফায় ভোট করানো হচ্ছে না। তাহলে শুধু বাংলার জন্য কেন ৮ দফায় ভোটগ্রহণ করা হবে? আমাদের শক্ত ঘাঁটি দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৩ দফায় ভোট হবে কেন? কাকে সুবিধা করে দিতে এই সিদ্ধান্ত? এর আগে বাংলায় কোনও দিন জেলাগুলিকে ভেঙে ভেঙে ভোট করানো হয়নি। তবুও কমিশনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাবো। আর যারা বাংলা দখল করার ছক কষছেন তাঁদের বলে রাখছি যত নেতা আছে সব নিয়ে চলে আসুন, কুছ পরোয়া নেহি। ছাত্র রাজনীতি করে উঠে এসেছি। বাংলাকে সবার থেকে ভাল চিনি। ৮ দফায় ভোটও হবে খেলাও হবে।’

এদিন মমতা বেশ ক্ষোভের সঙ্গে জানিয়েছেন, ‘কোথাও কোথাও একটা প্রশ্ন এসে যাচ্ছে। বিহারে ২৪০টি আসনে ৩টি দফায় নির্বাচন হয়েছিল। অসমে ৩ দফায় ভোট হচ্ছে। তামিলনাড়ুতে ২৩৪টি আসনে একদিনেই নির্বাচন। কেরলে সিপিএমের সরকার, সেখানেও এক দফায় ভোট। বাংলার ২৯৪টি আসনে কেন ৮ দফায় ভোট? কাকে সুবিধা করে দেওয়ার জন্য? তারা রাজ্যকে সুবিচার না দিলে কোথায় যাবে জনগণ? আমি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে বলতে বাধ্য হচ্ছি, বিজেপির অনুরোধেই এটা করা হয়েছে। এমনকি গোটা জেলায় একদিনে নির্বাচন হচ্ছে না। ২৭ মার্চ নির্বাচন করছেন পুরুলিয়ায়। বাঁকুড়াটা ভাগ করেছে। পূর্ব মেদিনীপুরের পার্ট ওয়ান পার্ট টু শেখাচ্ছে। ৩০ দিনের খেলা খেলবেন? আমাদের যায় আসে না। হারিয়ে ভূত করে দেব।’

একই সঙ্গে এদিন মোদী শাহকে রীতিমত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে মমতা বলেছেন, ‘আপনারা জেলাকে ভাঙছেন। ভাইকে ভাইকে ভাঙছেন। হিন্দু-মুসলিমকে ভাঙছেন। আপনারা বাঙালি-রাজবংশী ভাঙছেন। আপনারা টোটাল দেশটাকে ভাঙছেন। আমি বাংলার নিজের মেয়ে। আমি বাংলাকে ভালো করে চিনি। জেলা থেকে বিধানসভা কেন্দ্র সব চিনি। বাংলাকে অশান্ত করার চেষ্টার জবাব বাংলার মানুষই দেবে। বহিরাগত গুন্ডারা বাংলা শাসন করবে না। বিজেপির চোখ দিয়ে বাংলাকে দেখবেন না, অনুরোধ করছি নির্বাচন কমিশনকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেন ক্ষমতার অপব্যবহার না করেন। প্রধানমন্ত্রীকেও তাই বলছি। বিজেপির সবাই মিলে মনে করে, বাংলাকে নিগৃহীত করব। বাংলাকে বঞ্চনা করব। যত নেতা আছে নিয়ে আসুন। ন্যাতা ও নেতা। আমরা নেতা নই, ন্যাতা। আমরা ধানক্ষেতের লোক। ঘরে কাজ করার লোক। এর জন্যে জবাব দিতে হবে। এত ভয় আমাকে? পুরো কেন্দ্রীয় সরকারের সমস্ত সংস্থাকে নিয়ে এই পরিকল্পনা তৈরি করেছে। নির্বাচনের পর পুরস্কার দিতে হবে।’

পাশাপাশি, ২ জন বিশেষ পর্যবেক্ষক ও পুলিশ পর্যবেক্ষক নিয়েও মুখ্যমন্ত্রী কমিশনকে একহাত নিয়েছেন এদিন। ২০১৯ সালে বিবেক দুবে পর্যবেক্ষক ছিলেন। তিনিই ফের এবারেও পুলিশ পর্যবেক্ষক হলেন। একইসঙ্গে মৃণাল কুমার দাস নামে আরও একজন পুলিশ পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে।

যদিও নির্বাচনের নির্ঘণ্ট প্রকাশের পর দেশের নির্বাচন কমিশনার সুনীল অরোরা সাংবাদিকদের স্পষ্টই জানান, ২০১১তে ৬ দফা এবং ২০১৬তে ৭ দফার পর চলতি বছর ৮ দফা খুব একটা বড় ব্যাপার নয়। তবে এই দফা করা হয়েছে, ওই রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি, নিরাপত্তাবাহিনী মোতায়েন, রাজনৈতিক দলগুলির মতামত ও অভিযোগ সবকিছুর কথা মাথায় রেখেই। এই নিয়ে আলাদা করে কিছুই মন্তব্য করার নেই।’ তিনি এদিন আরও বলেন, ‘সব দিক খতিয়ে দেখেই এই রাজ্যে ২ পুলিশ পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে। ঠিক যেভাবে তামিলনাড়ুতে ২ জন আয়-ব্যয়ের পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে। সেই কারণেই সবদিক দেখেই এই ৮ দফার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *