সোনালী সাহা নন্দী, আমাদের ভারত, ৮ ডিসেম্বর: দেশ তখন পরাধীনতার অন্ধকারে আচ্ছন্ন, গভীর শোষণের শিকার। সময়টা স্বাধীনতার প্রাক্কাল, ইংরেজদের দখলে তখন ভারত বর্ষ তথা এশিয়া মহাদেশের অধিকাংশ সাম্রাজ্য। গোটা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য অস্ত যাবার জো নেই। কারণ এত বড় সাম্রাজ্যে ভারতে যদি অন্ধকারে ঢেকে গেছে তো ইংল্যান্ড তখন সূর্য প্রখরভাবে কিরণ দিচ্ছে, আবার কখনো ভারতে যদি সূর্য উদয় হয় ইংল্যান্ড তখন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে। এইরকমই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশদের লক্ষ্য ছিলো পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যের সম্পদকে স্থানান্তরিত করে নিজের দেশের সাম্রাজ্যকে স্ফীত করা।
ঠিক একইভাবে ইংল্যান্ডে পার্লামেন্ট তথা হাউস অফ কমন্স তৈরির জন্য চলছিল তোড়জোড়। আর তাই এই তোড়জোড়কে বাস্তব রূপ দেওয়ার জন্য ভারতবর্ষের ভালো মানে ইটের সন্ধান চলছিল। ইটের সন্ধান চালাতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের স্বনামধন্য বনেদিয়ানা পরিবার হিসেবে হাটখোলার দত্ত পরিবারের নাম উঠে আসে।
স্বাধীনতার প্রাক্কাল থেকে আজও পর্যন্ত প্রভাব, চাকচিক্য এবং জৌলুস ইত্যাদির সংমিশ্রণে হাটখোলার দত্ত পরিবারের সুনামের অন্ত নেই। বনেদিয়ানা রাজবাড়ী হিসেবে এবং সংস্কার আচার-বিচারের নিরিখে হাটখোলার দত্ত পরিবারের নাম কলকাতার ইতিহাসে উজ্বল।
কলকাতার আদি নাম যেগুলো আমরা সুতানুটি, গোবিন্দপুর এবং কলকাতা থেকে গোবিন্দপুর এর নাম পাই তা আসলে এই হাটখোলার দত্ত পরিবারের পূর্বপুরুষ গোবিন্দ শরণ দত্তের নামানুসারে হয়।
আমরা সকলেই জানি হুগলি নদীর তীরে পলি জমা মাটি দিয়ে যে ইট তৈরি হয় তা যথার্থই ভালো মানের। আর এই ইটের ব্যবসা করত হাটখোলার দত্ত পরিবার। তাই ব্রিটিশ সরকারের সাথে চুক্তি হয় ইংল্যান্ডের হাউজ অফ কমন্স তৈরীর জন্য যত ইট লাগবে তা পুরোটাই হাটখোলার দত্ত পরিবার রফতানি করবে। এই ইটটির গায়ে ডি.ডি লেখাটি ছিল– এটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য। দত্তরা ব্যবসাটিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বর্তমানে দমদম মতিঝিল সায়েন্স এন্ড আর্টস কলেজের উল্টোদিকে একটি পুরনো বাড়ি যা দমকলকেন্দ্র ছিল তার কাছে তাদের বাসস্থান স্থানান্তরিত করে। দমদমের আর.এন গুহ রোড ইট তৈরির কাজ শুরু হয়। ইট তৈরির জন্য কুমোরটুলি থেকে অসংখ্য কুমোরের আগমন ঘটে এবং এই ইট তৈরির জন্য যারা তদারকি করতেন তাঁরা ছিল গোরা সৈন্য।
রানী ভিক্টোরিয়া তখন দত্ত পরিবারের সঙ্গে চুক্তি করে ইটগুলি প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরকে ইংল্যান্ডে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব দেন। দ্বারকানাথ ঠাকুরের সঙ্গে রানী ভিক্টোরিয়ার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত মধুর। রানী ভিক্টোরিয়া দ্বারকানাথ ঠাকুরকে ভারতীয় সুদর্শন এবং ভালো ইংরেজি বলতে পারা পুরুষ হিসেবে বেশ পছন্দ করতেন। অন্যদিকে দ্বারকানাথ ঠাকুরের আন্তর্জাতিক ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য বেশ খ্যাতিও ছিল। রেশম, চিনি, লবন, আফিম, নীল ইত্যাদি ছিল তাঁর বাণিজ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। দ্বারকানাথ ঠাকুর বাণিজ্যিক প্রশংসার জন্য এই দায়িত্ব পান।
সাতটি জাহাজে ইট ভর্তি করে দ্বারকানাথ ঠাকুর একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে ইংল্যান্ডে পাড়ি দেওয়ার দায়িত্ব দেন এবং তিনি আরও বলেছিলেন যে জাহাজ ভর্তি ইট ইংল্যান্ডের মাটিতে নামানোর পর এমন কিছু নিয়ে ভারতের ফিরতে হবে যার ব্যবসা কলকাতা তথা সারা ভারতে রমরমিয়ে চলবে। সেই কথা মত ঐ ব্যক্তি ইংল্যান্ডে যাওয়ার জন্য যাতায়াতের ভাড়া, ওখানে থাকা খাওয়ার ভাড়া মকুব করতে বলেন। দ্বারকা নাথ ঠাকুর রাজি হলে ঐ ব্যক্তি ইংল্যান্ডে গিয়ে কথানুযায়ী জাহাজ ভর্তি ওষ্ঠরঞ্জনী এবং ব্লাউজ নিয়ে দেশে ফেরেন। পরে সত্যিই এর ব্যবসা কলকাতা তথা ভারতবর্ষজুড়ে রমরমিয়ে চলে।
এর আগে ভারতবর্ষের ইতিহাস ওষ্ঠরঞ্জনী এবং ব্লাউজ এর ব্যবহার চলত না। ব্লাউজ সাধারণত ব্রিটিশ মেয়েরা স্কাটের ওপর পরত। ভারতবর্ষে ব্লাউজের আমদানি হলে ঠাকুর পরিবারের মহিলা সদস্যরা প্রথম প্রচলন করেন।
ইংল্যান্ডে হাউজ অফ কমন্স তৈরির পর ভারত থেকে আমদানি ইট কিছুটা বেঁচে গেলে সেটা ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম থানা কামারডাঙ্গা থানা তৈরি হয়, যা দমদম নাগেরবাজার এর মোড় থেকে বাঁদিকে কামারডাঙ্গা ফাড়ির কাছে অবস্থিত। বর্তমানে অবশিষ্ট কিছু না থাকলেও থানার পিছনে যে দেয়ালটি আছে যার প্রতিটা ইট ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টের প্রতিটি ইটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

