অশোক সেনগুপ্ত, আমাদের ভারত, ১২ সেপ্টেম্বর: জেইই অ্যাডভান্সড-এর ফল প্রকাশিত হয়েছে।
দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ সহ পূর্ব ভারতের ফল যথেষ্ঠ হতাশার। ইঞ্জিনিয়ারিং পঠনপাঠনে এ রাজ্যের একটা বিশেষ স্বীকৃতি ছিল। প্রশ্ন উঠছে, সেই কৌলিন্য কি মার খাচ্ছে? সর্বভারতীয় এই পরীক্ষায় সাফল্যের নিরিখে মেয়েদের অবস্থানও যথেষ্ঠ নেতিবাচক।
ভারতে আইআইটি-র সংখ্যা ২৩। এতে আসনসংখ্যা প্রায় ১৬,২৩৪। দেশে-বিদেশে আইআইটি-র সফলদের আকাশছোঁয়া চাহিদায় প্রতিযোগিতা বাড়ছে। কিন্তু এতে পূর্বাঞ্চল পিছিয়ে। দেশের সাত আইআইটি জোনের মধ্যে মাদ্রাজ, বোম্বে ও দিল্লি— এই তিন জোন বেশ কবছর ধরেই এগিয়ে। প্রথম ১০-এ এবার এই জোনের সফলদের সংখ্যা যথাক্রমে ৫, ৩ ও ১। প্রথম ১০০-তে ২৯, ২৯ ও ২২। প্রথম ৫০০-তে ১৩২, ১২৬ ও ১৩৩।

ডঃ বাসব চৌধুরী।
এ রাজ্যের কেন এই হাল? ১৪ বছর পশ্চিমবঙ্গের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য-সহ দায়িত্বের নানা পদে ছিলেন ডঃ বাসব চৌধুরী। এই প্রতিবেদককে তিনি জানান, “এটা বিশ্লেষণ করতে গেলে গত তিন চার বছরের ফল বিচার করতে হবে। এটা কি ট্রেন্ড, না এটা এ বছর খারাপ হল? এই পরীক্ষাটা কঠিন হয়। সর্ব ভারতীয় স্তরে ভাল করতে গেলে ধারাবাহিকভাবে গড় ফলের থেকে ভাল করতে হবে। মোটামুটিভাবে দেখা যায়, আই আই টি থেকে পাস করা ইঞ্জিনিয়ারের ছেলেমেয়েদের মধ্যে আইআইটি’তে পড়বার উচ্চাকাঙ্খা থাকে। আইআইটি থেকে পাস করা ইঞ্জিনিয়াররা এলিট ইঞ্জিনিয়ার। তাঁরা ভাল কোম্পানিতে চাকরি করেন। এমন কোম্পানি দেশের পূর্বাঞ্চলে কটি আছে? এর থেকে একটা ধারণা পাওয়া যায়। উচ্চাকাঙ্খা তৈরি হয় বাড়িতে, তার বৃদ্ধিও হয় বাড়িতে। এর ভিত্তিতে একটা সমীক্ষা করে দেখুন। দেশের পূর্বাঞ্চল ও অন্যান্য জায়গার প্রভেদ পাবেন।”
এই পরীক্ষায় দেশের সফল তিনটি জোনের তুলনায় এর পরের চারটি জোন খড়্গপুর, রুরকি, কানপুর ও গুয়াহাটির সাফল্যের হার যথেষ্ঠ নেতিবাচক। এ বছর প্রথম ১০-এ খড়্গপুর একজনকে পেলেও বাকি তিনটি জোন কাউকে পায়নি। জেইই অ্যাডভান্সড-এর ফলাফলে প্রথম ১০০ জনের মধ্যে এই চার প্রতিষ্ঠানের ঝুলিতে পড়েছে যথাক্রমে ৬, ১১,১ ও ২। প্রথম ৫০০-তে ৩১, ৪৫, ২৩ ও ১০।
উপাচার্য তথা সি ভি রমনের স্মৃতিজড়িত বাঙালুরুর ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমী অফ সায়েন্সের ফেলো, বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ডঃ আশুতোষ ঘোষ এই প্রতিবেদককে বলেন, “আইআইটি-র প্রবেশিকা পরীক্ষায় পূর্বাঞ্চল অনেকটা পিছিয়ে। তবে, তার মানে মোটেই এটা নয়, মেধার নিরিখে পূর্বাঞ্চলের বিজ্ঞান-পড়ুয়ারা পিছিয়ে। এর একটা কারণ, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির পাঠ্যক্রমের সঙ্গে আইআইটি-র প্রবেশিকা পরীক্ষার সম্পর্কটা ভীষণ কম।”
এই সঙ্গে বাসব চৌধুরীর বক্তব্য, “শিক্ষিত লোক অপেক্ষাকৃত ভাল সুযোগের জন্য পূর্বাঞ্চল ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছেন। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। বাবা মা পূর্বাঞ্চল ছেড়ে গেলে ছেলে মেয়ে পূর্বাঞ্চল ছেড়ে যাবে। যেখানে এমন লোকের ভিড় হবে, সাফল্যের তরী সেখানেই ভিড়বে।
কলকাতা এখন ভুলভাল কারণে বিখ্যাত। ইতিহাস দিয়ে ভবিষ্যৎ রচনা করা যায় না। বর্তমানকে যত শানিত করা হবে, ভবিষ্যৎ ততই ধারালো হবে। যাঁরা উচ্চপদে আসীন আছেন, তাঁরা তো বলেন, পূর্বাঞ্চল দেশের মধ্যে সবচেয়ে ভাল। তাঁদের কাছে নিশ্চয় তথ্য থাকবে।”
জেইই অ্যাডভান্সড-এর ফলাফলে দেখা যাচ্ছে মেয়েদের সাফল্যের হার যথেষ্ঠ কম। মেয়েদের মধ্যে গোটা দেশে প্রথম হয়েছে তানিষ্কা কাবড়া— ১৬ তম স্থান। পেয়েছেন ৩৬০-এ ২৭৭ নম্বর। তিনি আইআইটি দিল্লি জোনের শীর্ষে। ২৪ নম্বরে পল্লী জলাযক্ষী, ৩২ নম্বরে জলধী যোশী। ওঁরা যথাক্রমে আইআইটি চেন্নাই এবং আইআইটি মুম্বাই জোনের শীর্ষে। এর পর জাহ্নবী শ, কলকাতার সাউথ পয়েন্টের ছাত্রী, কিন্তু ওড়িশা জোনে। উনি আছেন ২৫৮-তম স্থানে। এ বছর এই পরীক্ষায় পাশ করেছেন ৪০ হাজার ৭১২ জন। তার মধ্যে মেয়ে ৬ হাজার ৫১৬।
কেন এই অবস্থা? ডঃ বাসব চৌধুরীর উত্তর, “মেয়েরা ভাল করেননি, এটার ব্যাখ্যা দিতে পারব না। মেয়েরা কি বিশ্লেষণ ভিত্তিক লেখাপড়া থেকে দূরে চলে যাচ্ছেন? ভেবে দেখতে হবে।”

ছবি: আশুতোষ ঘোষ।
সর্বভারতীয় এই পরীক্ষায় পশ্চিমবঙ্গের এগিয়ে যাওয়ার দাওয়াইটা তাহলে কী? উপাচার্য ডঃ আশুতোষ ঘোষের মতে, “আইআইটি প্রবেশিকার উঁচু মানের প্রশিক্ষণকেন্দ্র তৈরি করতে হবে। কিছু রাজ্যে অনেক পড়ুয়া স্কুলের নিয়মিত পড়া বা পর্ষদের পরীক্ষার চেয়েও এই সব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পঠনপাঠনে জোর দেন। তার সুফলও মেলে। পূর্ব ভারতে এই ঘরানা একদম দেখা যায় না। এ ছাড়াও এই পরীক্ষায় জীবনপন করে সংগ্রাম করার প্রবণতার যথেষ্ঠ অভাব রয়েছে এ রাজ্যে। অনেকটা ইউপিএসসি-র পরীক্ষার মতই। এই বাস্তব বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে।”
আশুতোষবাবুর মন্তব্যের কিছুটা সত্যতা দেখা যায় ফল প্রকাশের পর বিভিন্ন সমগোত্রীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের দাবিতে। কলকাতার ‘ফিটজি’-র দাবি, এগারো জন ছাত্র এই পরীক্ষার প্রথম ৫০০-র মধ্যে স্কোর করেছে। এবছর আসানসোলের হর্ষিত সিং ১১২-তম স্থানে। উত্তরবঙ্গের হিমাংশু শেখর ১৯৩ তম স্থানে রয়েছে। কলকাতার মেয়ে জাহ্নবী শ’র জাতীয় র্যাঙ্কিং ২৫৮ তম। হর্ষিত সিং-এর জেইই মেইনস নম্বর ছিল ৬৫৬। তিনি জেইই অ্যাডভান্সড-এ এদিক থেকে উন্নতি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, “কঠোর পরিশ্রমই সাফল্যের একমাত্র চাবিকাঠি এবং ভাল নম্বর পাওয়ার জন্য সঠিক নির্দেশনা খুব বেশি প্রয়োজন।”
হর্ষিত ‘ফিটজি’ দুর্গাপুরের ছাত্র। জাহ্নবী শ এবং হিমাংশু শেখরের মতো পশ্চিমবঙ্গ থেকে অপেক্ষাকৃত ভাল ফল যাঁরা করেছেন, তাঁরাও এই কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং পশ্চিমবঙ্গের জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষার শীর্ষ দশে ছিলেন। কিন্তু লক্ষ্য ঠিক করেছে দেশের অন্যতম সেরা আইআইটি-তে ভর্তির। জাহ্ণবী আইআইটি-বোম্বে বা আইআইটি-দিল্লিতে পড়াশোনা করতে চান। তিনি বলেন, “গণিতের প্রশ্ন খুব কঠিন ছিল কিন্তু যে র্যাঙ্কই আসুক না কেন আমি খুব খুশি কারণ এটা আমার প্রত্যাশার বাইরে ছিল। আমি ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য উন্মুখ।” হিমাংশু শেখর এখন আইআইটি-দিল্লি বা আইআইটি-কানপুরে গণিত এবং কম্পিউটিং পড়ার পরিকল্পনা করছেন৷ তিনি বলেন, “কোভিডের কারণে ক্লাসগুলি অনলাইন মোডে বদলে যায়। এটা আমাকে স্ব-অধ্যয়নের জন্য আরও সময় পেতে সাহায্য করে।” জাহ্নবীর দাবি, “নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা, আত্মশক্তিতে বিশ্বাস এবং পারিবারিক সমর্থন আমার সাফল্যের স্তম্ভ।” ডিপিএস রুবি পার্ক স্কুল জানিয়েছে যে স্কুলের ৪১ জন ছাত্র জেইই অ্যাডভান্সড-এ যোগ্যতা অর্জন করেছে।

ছবি: সিদ্ধার্থ দত্ত।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন সহ উপাচার্য সিদ্ধার্থ দত্ত এই প্রতিবেদককে জানান, “আই আই টি প্রবেশিকা পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। খবরে প্রকাশ, পশ্চিমবঙ্গ সহ সারা পূর্বাঞ্চল রাজ্যগুলোর ফলাফল হতাশাজনক। এর কারণ খুঁজতে গেলে বিশদে আলোচনা প্রয়োজন। সে অবকাশ না থাকাতে অল্প পরিসরে কিছু আলোচনা করা যেতেই পারে, এবং তার প্রয়োজন ও হয়ে পড়েছে।
বেশ কয়েক বছর ধরে শিক্ষাক্ষেত্রে আমরা লক্ষ্য করছি অতি কেন্দ্রীকরণের ঝোঁক। যদিও সংবিধানে শিক্ষা বিষয়টি যুগ্ম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। শিক্ষা সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম নির্ধারিত হচ্ছে কেন্দ্রীয়ভাবে। বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার জন্য প্রবেশিকা পরীক্ষা, সিলেবাস, পঠনপাঠন এমন কি গবেষণার বিষয় ও নির্ধারিত হচ্ছে কেন্দ্রীয় স্তরে। ফলে কেন্দ্রীয় বোর্ডের ছাত্র ছাত্রীদের কাছে একটা সুবিধাজনক অবস্থায় পরীক্ষায় বসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এইসব স্কুলে পড়াশোনা করার খরচ প্রচুর। তাছাড়া সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থা এখন কোচিং ক্লাস নির্ভর। শিক্ষা এখন অনেকটাই জ্ঞান নির্ভর থেকে সরে গিয়ে বাজার নির্ভর হয়ে পড়েছে। ফলে তুলনামূলক ভাবে যার ক্রয়ক্ষমতা বেশি, সাফল্য তার দিকে চলে আসবে। এটাই তো অবশ্যম্ভাবী। ফলে হচ্ছে ও তাই। অবশ্য এতে মেধার কোন ভূমিকা নেই একথা বলাটা ঠিক হবে না। মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের এই সাফল্য তারিফযোগ্য। যোগ্যতা অর্জন করেছে বলেই তারা এই সুযোগ পেয়েছে। তবু এটা তো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, সেখানে মোটামুটি ভাবে সবাই যদি একইরকম সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত না হতো, তাহলে ভালো হতো। সংবিধানে ছয় থেকে চোদ্দ বছর পর্যন্ত শিক্ষার অধিকার তো স্বীকৃত। নতুন শিক্ষা নীতিতে তা বাড়িয়ে করা হয়েছে তিন থেকে আঠারো বছর। এসব কি শুধুই খাতায় কলমে রয়ে যাবে?”
সিদ্ধার্থ দত্তর কথায়, “এ রাজ্যের কথায়। খবরে প্রকাশ, দশ/ বারো বছর আগে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে আমাদের রাজ্যে তিন লক্ষ ছাত্রছাত্রী বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করতো, পাঁচ/সাত বছর আগে সংখ্যাটি কমে দাঁড়ায় পচানব্বই হাজারে। এখন নাকি আর ও কম সংখ্যক ছেলেমেয়ে বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে। এ সংক্রান্ত তথ্য এখন পাওয়াও যায় না। অধিকাংশ স্কুলে পরিকাঠামোর অভাব। বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক সংখ্যা প্রয়োজন এর তুলনায় অত্যন্ত কম। অথচ এ রাজ্যে বিরাশি থেকে চুরাশি শতাংশ ছাত্রছাত্রী স্কুল স্তরে সরকারি অথবা সরকারি পোষিত স্কুলে পড়াশোনা করে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, মেধার দিক থেকে এরা যথেষ্ট ভালো। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এরা সর্বভারতীয় পরীক্ষায় পিছিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দায়িত্ব কার? সংবিধান জানান দিচ্ছে যৌথ দায়িত্বের কথা। কেন্দ্র এবং দেশের বিভিন্ন রাজ্য সরকারকে এসব ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে সুষ্ঠ সমাধানের জন্য। না হলে দেশের বিভিন্ন ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যে বিভাজনের সংস্কৃতি এখন বিদ্যমান, তা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। এ সব কিন্তু একেবারেই কাম্য নয়।”
ডঃ বাসব চৌধুরী এই প্রতিবেদককে জানান, “পূর্বাঞ্চল কি দক্ষ মানুষকে শিক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে আনছে? ভেবে দেখতে হবে। আমার মনে হয়, নীতিনির্ধারকরা এই সব বিষয়ে ভাববেন। পিছিয়ে পড়ছি বললে যদি সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা হয়, তবে পিছিয়ে পড়ার ধারা অব্যাহত থাকবে। নির্মোহ বিশ্লেষণ জরুরি। শিক্ষা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা যতদিন জি-হুজুরানি/ হুজুর মানসিকতা নিয়ে চলবেন ততদিন এমনই চলবে। ইতিহাস দিয়ে বেশি দিন চলে না, কবে বুঝব আমরা? বড্ড দেরি হয়ে গেল যে।”

